নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির চলমান সংলাপ নিয়ে যেসব হতাশাজনক কথা ইতোমধ্যে উঠেছে, তা অযৌক্তিক নয়। এ বিষয়ে অতীতে অনুষ্ঠিত সংলাপ আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিছু ছিল না। এবারও তা-ই হতে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এ সংলাপে অংশ নিচ্ছে না; তা আগেই জানা গিয়েছিল। পরে আরও কয়েকটি দলের এ ব্যাপারে অনীহা দেখা গেল। ইতোমধ্যে যে ক'টি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে বসেছে, এসব দলের কয়টির দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে? কিংবা জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার ভিতইবা কতটা মজবুত- এমন প্রশ্ন উপেক্ষার অবকাশ খুব একটা নেই। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই সংলাপে নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়নের কথা জোর দিয়ে বলেছে এবং এ ক্ষেত্রে সময় কোনো বাধা নয়, বরং সদিচ্ছার ঘাটতির কথাও তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়ে একটি খসড়া ইতোপূর্বে পেশ করা হয়েছে। এই খসড়ায় সংবিধানের আলোকে সুজনের নিজস্ব পর্যবেক্ষণও তুলে ধরা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গেল। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ছাড়া বাকি সব জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কমবেশি প্রশ্ন উঠেছে। কোনো কোনোটিতে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা-অস্বচ্ছতাসহ এমন কিছু নেতিবাচক বিষয় প্রকটভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে, যা একটি স্বাধীন দেশ ও জাতির জন্য চরম লজ্জার। নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে, এর সুষ্ঠু প্রয়োগে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা যে সম্ভব- এ দৃষ্টান্তও তো আমাদের সামনে আছে। কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে কেন এই কমিশনই ক্ষত সৃষ্টি করেছে- এর উত্তর সচেতন মানুষমাত্রেই জানা।

আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির হাতে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, এই ক্ষমতাবলে তিনি কতটুকু কী করতে পারেন, তাও সচেতন মানুষের অজানা নয়। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির স্থান সবার ঊর্ধ্বে। অতীত ও বর্তমানে নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে রাষ্ট্রপতির সক্রিয় হওয়ার প্রেক্ষাপটে তার ক্ষমতা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে কিংবা হচ্ছে। কিন্তু সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতিকে চলতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। কাজেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রত্যাশার তেমন কিছু নেই। তিনি চাইলেই এ ব্যাপারে তার ইচ্ছামাফিক কিছু করতে পারেন না। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপ যতই দেখতে ভালো লাগুক কিংবা কারও মনে যদি কিছু আশারও সঞ্চার করে, প্রকৃতপক্ষে তাতে কাজের কাজ কিছু হওয়ার আশা নেই। আমাদের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় সংবিধান অনুযায়ী সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান। রাষ্ট্রপতির সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে।

তবে এও আমলে রাখা দরকার, নির্বাচনে সংসদে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সেই দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে হয় বলে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বলা যায় আলংকারিক মাত্র। তবে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী না হলে একাধিক দল বা জোট থেকে কার সরকারপ্রধান হওয়ার সুযোগ পাওয়া উচিত, তখন রাষ্ট্রপতিই তা নির্ধারণ করেন। দেশে অতীতে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিতে পারেন মাত্র; একক ক্ষমতাবলে কমিশন গঠন করতে পারেন না। তাই চলমান সংলাপ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল বের হয়ে আশা দুরাশা মাত্র।


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুযায়ী, 'প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশে একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দান করিবেন।' সংবিধানে এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গত ৫০ বছরে কোনো রাজনৈতিক সরকারকেই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এমনটি আইনের শাসনের পরিপন্থি ও সংবিধানের প্রতি অবজ্ঞার শামিল।

যদি সংবিধান মেনে আইনের বিধানাবলি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত হতো, তাহলে জনস্বার্থ সমুন্নত রাখা সহজ হতো। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির রূপও দৃশ্যমান হতো অনেকটা প্রত্যাশিতভাবে। তবে এও অসত্য নয়; যদি ক্ষমতাসীনদের সৎ উদ্দেশ্য কিংবা দায়বদ্ধতা না থাকে, তাহলে আইন প্রণীত হলেও নির্বাচন কমিশনে উপযুক্ত কিংবা যোগ্যরা নিয়োগ না পাওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে। ভুলে যাওয়া অনুচিত, সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়ন না করে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের কোনো বিধান নেই।

আমরা দেখেছি, অতীতে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে গঠিত দুই কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে নির্বাচন প্রক্রিয়া ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রকিব ও হুদা কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থায় যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা শুধু গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথই কণ্টকাকীর্ণ করেনি; সমাজে যে বিশৃঙ্খলার বীজ রোপণ করেছে, এরও মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় সরকারের নিম্নস্তর চলমান ইউপি নির্বাচন এরই সর্বশেষ খণ্ডিত দৃষ্টান্ত।

যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সময় কোনো বড় বিষয় বলে মনে করি না। এখনও হাতে যথেষ্ট সময় আছে। এ ক্ষেত্রে সুজনের খসড়া সহায়ক হতে পারে। দেশের সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সংলাপের নামে সময়ক্ষেপণ না করে কাজের কাজটি করাই সংগত বলে মনে করি। এ দেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান দুরূহ- তা ইতোমধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রমাণিত। সংবিধানের ৪৮(৩) ধারা অনুযায়ী, শুধু প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ কিংবা পছন্দ অনুযায়ী যেহেতু নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, সে ক্ষেত্রে এমন সংলাপ অনুষ্ঠান নিছক 'লোক দেখানো' আয়োজন ছাড়া আর কী হতে পারে! এমন প্রক্রিয়ায় গঠিত নির্বাচন কমিশন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবে- এই অনিশ্চয়তা ও প্রশ্ন থেকেই যায়।

সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এটুকু যেন শুধু সংবিধানেই লিপিবদ্ধ! কার্যক্ষেত্রে আমরা কি এর অনুকূলে কিছু দেখছি? গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের কথা আমরা যেভাবে শুনি, প্রকৃতপক্ষে সে রকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেন পরিলক্ষিত হচ্ছে না- এ প্রশ্নের উত্তরও জটিল নয়। আমরা যেন ভুলে না যাই, স্বাধীনতার ঘোষণায় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের অন্তিমেও কি আমরা সেই অধিকার অর্জন করতে পেরেছি? জনঅধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন কতটা পরিপূর্ণতা পেল? নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়ন ও এর যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার বিকল্প নেই।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংলাপ হতেই পারে। কিন্তু যে বিষয়ে সংলাপ হবে কিংবা আলোচনার টেবিলে বসে বিদ্যমান সংকট নিরসনের পথ বের করা যেতে পারে; দেখতে হবে সেই বিষয়ে সাংবিধানিক সুযোগ কতটা রয়েছে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু যে বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, সেই বিষয়টি নিয়ে এমন সংলাপ কতটা অর্থবহ হতে পারে?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা