ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কোনোভাবেই বিভ্রান্তির পথে না গিয়ে পাঠে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তোমাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে এখন থেকেই নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

বুধবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ছাত্রলীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সভায় যুক্ত হন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা উন্নয়নশীল দেশ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আসবে, প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের কর্মদক্ষতারও পরিবর্তন ঘটবে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের এখন থেকে তৈরি হতে হবে।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্র রাজনীতি থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। খেয়াল রাখবে, লোভের বশবর্তী হয়ে পা পিছলে পড়ে যেও না।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাও, তাদের আদর্শ নিয়ে সততার সঙ্গে প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে সেভাবেই কাজ করতে হবে। তোমরা সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলবে আদর্শবান কর্মী হিসেবে। নিজেকে শক্ত করে সততার পথে থেকে এগিয়ে যাবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করবে। জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কাজ করবে। সেভাবেই নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।

প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগকে সবসময় আমি এটাই বলব- আদর্শ নিয়েই গড়ে তুলতে হবে। ক্ষমতার লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের আদর্শবান কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জাতির পিতার আদর্শটা যদি একবার ধারণ করা যায় তবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া কঠিন কাজ নয়।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনের কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় ছাত্রলীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও '৭৫-এর ১৫ আগস্টের সব শহীদসহ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মাতৃভূমি নামে একটি পাঠাগারও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবক আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের জন্য কাজ করাই ছাত্রলীগের মূল দায়িত্ব। এটাই রাজনৈতিক নেতাদের কাজ এবং তা ছাত্রলীগকেও মনে রাখতে হবে। জাতির পিতা বলে গেছেন- মহান অর্জনের জন্য মহান আত্মত্যাগ দরকার। কাজেই ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে মনে রাখতে হবে, তারা কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়। নিজেদের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রেখে দেশ যেন শান্তি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে- সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে মানুষকে, জীবনে ধন-সম্পদ কোনো কিছুই কাজে লাগে না। কাজেই অহেতুক অর্থের পেছনে না ছুটে মানুষের জন্য কাজ করা একজন রাজনৈতিক নেতার কাজ। সেটাই মাথায় রাখতে হবে। উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একটা জাতিকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। জাতির পিতা বলেছিলেন শিক্ষায় যে অর্থ ব্যয় সেটা হচ্ছে বিনিয়োগ। সেই অর্থটা কাজে লাগে। শিক্ষিত জাতি ছাড়া কখনও একটা উন্নত জাতি হওয়া সম্ভব নয়।

অশিক্ষিত নেতৃত্ব একটি দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় বলে মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আমি কারও নাম বলব না। এটুকু বলতে চাই শুধু, অল্প শিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত বা অশিক্ষিত নেতৃত্ব একটা দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। আজ সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করেছি।

তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া যায় তখনই, যখন আমি মনে করব যে- হ্যাঁ, আমি আমার দেশের মানুষের জন্য কাজ করার শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় যেতে পারছি। তার আগে যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা কখনও করিনি, করবও না। আমার লক্ষ্যই ছিল- ক্ষমতায় গিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করব। সেভাবেই ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়েছি এবং কাজও করেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি মহল দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তারা তো দেশের মানুষের ভাগ্যের কথা চিন্তা করে না। কাজেই তারা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকে। কিন্তু নীতি ও আদর্শ নিয়ে আর সৎ পথে চললে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা যায়। সেটা প্রমাণ করেছি আমরা।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের কিছু মানুষ, সেই দেশ সৃষ্টির পর থেকেই আমি দেখি- তারা সব সময় কোনো একটা প্রভু খুঁজে নিয়ে তাদের পদলেহন করতে ব্যস্ত থাকে। তাদের কোনো আত্মমর্যাদাবোধ নেই, নিজের প্রতি কোনো আত্মবিশ্বাস নেই। এদের দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণ হয় না।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, যে জাতি এক নেতার ডাকে সাড়া দিয়ে অস্ত্র তুলে দেশ স্বাধীন করেছে আর সেই নেতাকে যখন নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হলো, তখন সবাই কেন থমকে গেল? সে একটা বিরাট প্রশ্ন। সে প্রশ্নের জবাব এখনও খুঁজে পাইনি। তবে হয়তো পাবো।

দলের তৃণমূল কখনও ভুল করে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমি অনেককে দেখেছি হয়তো কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত হন। কিন্তু দলের তৃণমূলের নেতারা কখনও ভুল করেন না। হয়তো কেউ ক্ষমতার লোভে পড়ে যান। বারবার আঘাত এসেছে, পার্টিও ভেঙেছে, আবার দলকে গড়তে হয়েছে।

দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তার সরকারের পঞ্চবার্ষিকী এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৪১ সাল নাগাদ এই বাংলাদেশ বিশ্বে একটা উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। সেই উন্নত সমৃদ্ধ দেশের সৈনিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার প্রস্তুতি ছাত্রলীগকে এখন থেকেই নিতে হবে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নীতি এবং আদর্শ নিয়ে চললে সব বাধা অতিক্রম করা যায়। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের একটি ঘোষণা সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই অর্জনকে ধরে রাখতে হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। অধিকার হারা মানুষের কথা বলার জন্যই এই সংগঠন তৈরি হয়েছে। এই গর্বটা থাকতে হবে। কিন্তু সেটা যেন আবার অহমিকায় পরিণত না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। নেতাকর্মীদের বিনয়ী হতে হবে। আর দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে।

সরকারপ্রধান বলেন- বুলেট, বোমা অনেক কিছুই তো মোকাবিলা করেছি। কাজেই সেই ভয় করি না, কিন্তু দেশটাকে যেখানে নিয়ে এলাম, সেই গতিটা যেন অব্যাহত থাকে। আবার যেন আমাদের পিছিয়ে যেতে না হয়। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সবাইকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। যাতে আবার কোনো হায়েনার দল এসে এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া যাবে না।

কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন প্রান্তে ছাত্রলীগের সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়ের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।