সুস্থতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ। ইসলাম মুমিনদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন থাকার প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। সঠিকভাবে ইবাদত করার জন্যও শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা অত্যন্ত জরুরি। কেননা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকলেই কেবল একাগ্রতার সঙ্গে ইবাদত করা যায়। এ বিষয়ে মুসলিম শরিফের হাদিসে বর্ণিত- রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, 'দুর্বল মুমিনের তুলনায় সবল মুমিন অধিক কল্যাণকর ও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।
ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ পাঁচটি। তন্মধ্যে তিনটিই শারীরিক। যথা- নামাজ, রোজা ও হজ। এ ছাড়া কোরআন তেলাওয়াত করা, ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করা এবং দৈহিক শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করে উপার্জন করা বা কারও উপকার সাধন করা, এসবই শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ শারীরিক সুস্থতা নিয়ে অনেকের মাঝে যথেষ্ট উদাসীনতা রয়েছে। মহানবী (সা.) এই উদাসীনতার বিষয়টি উলেল্গখ করে এরশাদ করেন, দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই উদাসীন। তা হলো, সুস্থতা আর অবসর। এ ব্যাপারে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পাঁচটি নেয়ামতের মূল্যায়ন কর পাঁচটি বিপদ আসার আগে; যৌবনের মূল্যায়ন কর বার্ধক্য আসার আগে; সুস্থতার মূল্যায়ন কর অসুস্থতা আসার আগে; সম্পদের মূল্যায়ন কর দারিদ্র্য আসার আগে; অবসরের মূল্যায়ন কর ব্যস্ততা আসার আগে; জীবনের মূল্যায়ন কর মৃত্যু আসার আগে (মুস্তাদরাকে হাকিম)।
মানুষ সাধারণত রোগাক্রান্ত হয় খাদ্য ও পানীয়ের দ্বারা। সে হিসেবে সব রোগের মূল কেন্দ্রস্থল মানুষের পেট। তাই খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমিত মাত্রায় খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। ইসলাম এ বিষয়ে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছে এবং অতিভোজন করতে নিরুৎসাহিত করেছে। কারণ মাত্রাতিরিক্ত ভোজন ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ। এ রোগের ফলেই মানুষের হার্ট, কিডনি, চোখ, দাঁত, নার্ভ সিস্টেমসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হতে থাকে। সুতরাং ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকতে হলে বিশ্বনবীর ফর্মুলাই আরোগ্য থাকার অন্যতম উপায়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন- 'পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য দিয়ে, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখবে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক মুমিন বান্দা খেয়াল রাখবে যে, সে যেন শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে না পড়ে। তবে কোনো কারণে অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে কোনো প্রকার অলসতা করা করা যাবে না। কেননা মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামদেরকে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন এবং তিনি নিজে অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত- মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, 'হে আলল্গাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা মহান আলল্গাহ এমন কোনো রোগ দেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। তবে একটি রোগ আছে যার কোনো প্রতিষেধক নেই, সেটি হলো বার্ধক্য।
এ হাদিসের আলোকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করা মুমিনের জন্য ইবাদত। চিকিৎসা সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা হলো, রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা করা। হাদিসে বর্ণিত- মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, 'রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা হলেই আলল্গাহর হুকুমে আরোগ্য হয়।' মুসলিম।
চলমান যে করোনা মহামারি চলছে, তা থেকে সুরক্ষার জন্যও স্বাস্থ্য সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বারবার হাত ধুয়ে ভাইরাস থেকে হেফাজত থাকার কথা বলা হয়েছে। একজন মুসলিম যখন পাঁচবার নামাজের জন্য অজু করে, সেখানে হাত ধৌত করা অন্যতম অবশ্য পালনীয়। ইসলাম সবসময় অজু অবস্থায় থাকাকে বিশেষ উৎসাহ প্রদান করেছে। বস্তুত সর্বাবস্থায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার মাধ্যমে আমরা অন্যান্য রোগব্যাধি থেকেও সুরক্ষিত থাকতে পারি।
আলল্গাহতায়ালা আমাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার ও ইসলামী অনুশাসন মেনে সুস্থ থাকার তওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর : চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি