শিশুর খাবার নিয়ে মা-বাবা কিংবা অভিভাবকের অভিযোগের অন্ত নেই। শিশু খেতে চায় না- এটা যেমন সত্য; তেমনি এটাও সত্য, সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে শিশুকে আমরা নানা ধরনের খাবারের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলি; যা পুষ্টিকর তো নয়ই, বরং অনেক ক্ষেত্রে শিশুর স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। খাবার হিসেবে শিশুর পছন্দ কী? বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে চিপস, চকলেট, চানাচুর, বিস্কুটসহ ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের বাইরে অন্য কিছু আছে কী? বলা বাহুল্য, শিশু এসব খাবার এমনিতেই পাচ্ছে না, বরং তাদের অনেক ক্ষেত্রে আমরাই এসবের অভ্যাস করিয়েছি। ভালোবেসে নিয়মিত এসব খাবার দেওয়ার মাধ্যমে শিশুর রুচিই নষ্ট হয় না, বরং অনেকের অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এটা স্পষ্ট, শিশুর খাবারের ক্ষেত্রে মা-বাবা কিংবা অভিভাবকের সচেতনতা সবার আগে। অস্বীকার করার উপায় নেই, চটকদার এসব খাবার বাজারে কিংবা দোকানগুলোর সামনেই সুসজ্জিত করে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, নানাভাবে সেসব খাদ্যের বিজ্ঞাপনও প্রচার করা হয়। এসব কারণে অনেক শিশু হয়তো নিজেই তার জন্য সেটি কিনতে বায়না ধরে। তা ছাড়া বলা চলে, আমরাও সেসবের বিকল্প খুঁজে পাই না। শিশুর বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেও বলছি, শিশুকে বাইরে নিয়ে অনেকে তার হাতে একটা চিপস ধরিয়ে দেন। আবার আমরাও অনেকে দীর্ঘ সময় পর বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে শিশুর জন্য চকলেট বা এ জাতীয় খাবার নিয়ে আসি। এমনকি আত্মীয়স্বজনও শিশুর জন্য বিস্কুট, চানাচুর, চকলেট, আইসক্রিম ইত্যাদি আনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাতে শিশু মহাখুশি হয় বটে, কিন্তু আদতে যে আমরা তার ক্ষতি করছি, তা বলা বাহুল্য।
চিকিৎসকরা ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে কেবল মায়ের বুকের দুধ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপরও শিশুকে সুস্থ রাখার জন্য এবং তার পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করার জন্য কী খাওয়াবে, তার পরামর্শও চিকিৎসকরা অভিভাবকদের দিয়ে থাকেন। উন্নত বিশ্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শিশুর যথাযথ খাবারের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। কানাডায় থাকা এক বোনের সুবাদে সেখানকার একটি প্রদেশে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের জন্য করা 'পেডিয়াট্রিক নিউট্রিশন গাইডলাইনস' বা শিশুদের পুষ্টি নির্দেশনা আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। সেটি ওয়েবসাইটে সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুর খাবার কী হবে, তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে। সেখানে ৬ থেকে ৯ মাস, ৯ থেকে ১২ মাস, ১২ থেকে ২৪ মাস এবং দুই থেকে ছয় বছরের শিশুদের খাবারের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় শিশুদের খাবারের জন্য বয়স অনুযায়ী সবজি, ফল, মুরগি, গরু, ডিম এবং বিভিন্ন জাতের মাছের প্রাধান্য স্পষ্ট। আমাদের মায়েরাও শিশুদের জন্য চাল, ডাল, সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেন, যা খুবই উপকারী। দুই বছরের ওপরের শিশুরা ডাল-ভাতসহ সাধারণ যে কোনো তরিতরকারি কিংবা মাছ-মাংস খেতে পারে। কিন্তু নিয়মিত এসব ভারী খাবারের পাশাপাশি চিপস, চকলেটসহ অন্য যেসব ক্ষতিকর খাবারে শিশু অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, উদ্বেগটা আসলে সেখানেই। তার ওপর বাইরের এসব খাবারে ভেজালের বিষয়টি তো রয়েছেই।
অনেক সময় দেখা যায়, শিশু মূল খাবার বাদ দিয়ে ওই সব খাবারই বেশি খাচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন তার বর্ধন বাধাগ্রস্ত হয় এবং একই সঙ্গে পুষ্টিহীনতাসহ নানা ব্যাধিতে শিশু আক্রান্ত হয়। শিশুকে আমরা যে চিপস খাওয়াই, তাতে লবণের ছড়াছড়ি। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) ওয়েবসাইটে শিশুকে যে কয়েকটি বিষয় না খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে লবণ অন্যতম। এনএইচএস বলছে, লবণের ফলে শিশুর কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে জন্য চিপসসহ লবণজাত অন্যান্য খাবার, যেমন- সস, ক্রেকারস, ক্রিসপসও শিশুর জন্য ক্ষতিকর। শিশুরা যেসব চকলেট খায়, তার অধিকাংশেই চিনির প্রাধান্য। বিস্কুট, কেকসহ বাজারে প্রচলিত বাচ্চাদের উল্লেখযোগ্য প্যাকেটজাত ও টিনজাত খাবারেও অনেক মিষ্টি থাকে। ফলের রসসহ অন্যান্য চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারে তাই নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাতে শিশুর দাঁত কিংবা মাড়ির ক্ষয়ের পাশাপাশি অত্যধিক মোটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আমাদের উল্লেখযোগ্য শিশুর পছন্দের খাবারের মধ্যে ফাস্টফুড অন্যতম। বলা বাহুল্য, বার্গার, স্যান্ডউইচ, পেস্ট্রি, কেক, বিস্কুট, শিঙাড়া, সমুচাসহ মুখরোচক এসব খাবার ছোট-বড় সবার জন্যই ক্ষতিকর। ফাস্টফুডে উচ্চমাত্রার লবণ যেমন থাকে, তেমনি টেস্টিং সল্ট, কৃত্রিম রং থাকায় উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে। অতিরিক্ত মাত্রায় প্যাকেটজাত খাবার ও ফাস্টফুড খাওয়ার ফলে শিশুর বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। আমরা শিশুদের যেসব খাবার দিই, তার উল্লেখযোগ্যই বলা চলে প্যাকেটজাত।
বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত, শিশুর জন্য নিরাপদ খাবার হলো ঘরে রান্না করা খাবার। ডাল-ভাত, শাকসবজি, মাছ, মুরগি শিশু খেতে পারবে। বাড়তি খাবার হিসেবে যতটা সম্ভব তাজা ফল ও ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এসব খাবার অতিরিক্ত খেতে না চাইলে চাপ প্রয়োগ করতেও বারণ আছে। আমরা দেখছি, একবারে না খেয়ে শিশু বারে বারে খাবার পছন্দ করে।
শিশুর খাবারের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলার জন্য মাঠ যেমন কমে যাচ্ছে, একই সঙ্গে খোলা জায়গাও সেভাবে মিলছে না। শিশুর স্বাভাবিক সুস্থতার জন্যই কায়িক শ্রম ও খেলাধুলার প্রতি তাদের আগ্রহী করে তোলা জরুরি। তা না হলে একাধিক বিপদ। এমনিতেই কেউ চিপস, চকলেটসহ ফাস্টফুড জাতীয় খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে তার স্থূলতা বাড়া কিংবা মুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে শিশু নিয়মিত খেলাধুলা কিংবা কায়িক শ্রম না করলে তার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যেতে পারে। তাতে অপরিণত বয়সেই যে শিশুর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বলা বাহুল্য, শিশু বয়স থেকেই আমাদের খাবারের বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। শিশুর জন্য যেসব খাবার ক্ষতিকর, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বড়দের খাওয়াও ঠিক নয়। অনেক সময় দেখা গেছে, অভিভাবক চিপস, চকলেট, ফাস্টফুডে অভ্যস্ত বলে শিশুও তা নিয়মিত খাচ্ছে। যেসব পরিবারে শিশু রয়েছে, সেখানে মা-বাবা কিংবা শিশুযত্নকারী ছাড়াও অন্যরা তাদের সামনে আমরা কী খাচ্ছি, তাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের খাদ্যাভ্যাস যেন কোনোভাবেই শিশুকে ক্ষতিকর খাবারে অভ্যস্ত না করে। শিশু অনুকরণপ্রিয় বলে পারিবারিক সচেতনতা এ ক্ষেত্রে জরুরি। শিশুর ভালো খাদ্যাভ্যাস গঠনে পরিবারের বাইরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং প্রশাসনও ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারিভাবে একটি সাধারণ নির্দেশিকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিশুর ক্ষতিকর খাবারের অধিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণেও প্রশাসনের ভূমিকা রাখা চাই। শিশুর জন্য বাইরের অধিকাংশ খাবারই অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ। তারপরও অনন্যোপায় হয়ে বাইরে যখন শিশুকে কিছু খাওয়াতে হয়, তখন অভিভাবকরা যেন ভালো বিকল্প হাতের কাছে পান, সেটিও নিশ্চিত করা চাই।
মাহফুজুর রহমান মানিক: সাংবাদিক ও গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com