ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় আমরা কী রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডের নতুন সংস্করণ দেখছি? প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঞ্জাবে নরেন্দ্র মোদির নিরাপত্তা বিঘ্নের ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ করছে এবং এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভারতের প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ এ ঘটনায় তার উদ্বেগ জানিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট এ ঘটনায় ক্রোধান্বিত হয়েছেন। নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিপরিষদ কমিটিও এ ঘটনা গুরুতর হিসেবে নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক পুলিশ অফিসারসহ প্রায় সবাই এ ঘটনায় আগের ভয়ংকর উদাহরণ টেনেছেন। সরকার এবং বিজেপি উভয়ই পাঞ্জাব পুলিশ ও রাজ্য সরকারের দুর্বলতার কথা বলেছে এবং এর মধ্যে নোংরা রাজনৈতিক খেলার অভিযোগ আসছে। এ ঘটনার অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ হিসেবে আমরা দেখেছি, কেন্দ্র এসপিজি অ্যাক্ট অনুসারে পাঞ্জাব পুলিশ অফিসারদের বিচারের কথা বলছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং বিজেপির নীতিনির্ধারকরা ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবে দেখে এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ পাচ্ছে এবং রক্তের বদলার বিষয়ও আসছে। সংবাদমাধ্যমও যদি এ দলে যোগ দেয় তাতেও বিস্ময়ের কিছু নেই।
সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? নরেন্দ্র মোদি পাঞ্জাবে এক সমাবেশে যাচ্ছিলেন। তখন প্রায় ২০ মিনিট উলাপুলের জ্যামে আটকে ছিল প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। হিন্দুস্তান টাইমসের খবর অনুসারে, ৫ জানুয়ারি পিরোজপুরে একটি র‌্যালিতে বক্তব্য দেওয়া ছাড়াও কিছু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ভঙ্গের কথা বলে এগুলো বাতিল করা হয়। পরে নরেন্দ্র মোদি বাথিন্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করে ঐতিহাসিক হোসাইনিওয়ালা যাওয়ার পথে কিছু প্রতিবাদকারী ওই সড়ক ব্লক করে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ফ্লাইওভারের ওপর ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষায় থাকে।
হিন্দি সংবাদমাধ্যম এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করে এই বলে, ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী পাঞ্জাব পুলিশকে বলছেন, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) জীবিত ফিরে আসার জন্য তাদের মুখ্যমন্ত্রীকে যেন ধন্যবাদ দেন। রাজনীতির বাইরে গিয়ে যদি বলি, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে কোনোভাবেই ছাড় নয়। প্রধানমন্ত্রী যখন কোথাও যাবেন, তার প্রটোকল মানতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী মোটের ওপর প্রধানমন্ত্রীই।
তবে নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, সেখানে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ওই দিন কি তার ওপর কোনো আক্রমণ করা হয়েছিল? এমনকি সেদিন কি ক্রোধান্বিত জনতার কেউ প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের বহরের নিকটবর্তী হতে পেরেছিল? উত্তর হলো- না। সেখানে কৃষকরা আন্দোলন করছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী আন্দোলন করার গণতান্ত্রিক অধিকার তাদের রয়েছে। তাদের আন্দোলনের কারণে কি প্রধানমন্ত্রীর জীবন শঙ্কাগ্রস্ত হয়েছিল?
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন, নিরাপত্তা হুমকির মতো কোনো অবস্থা ছিল না। তার দাবিমতে, প্রধানমন্ত্রীর জন্য সড়ক প্রতিবন্ধকহীন করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে সমাবেশে কম জনসংখ্যা হতে পারে- এ তথ্য পেয়ে প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ট্রিবিউনের প্রতিবেদন বলছে, বিজেপি দাবি করেছিল, পাঁচ লাখ মানুষের জমায়েত হবে, সেখানে পাঁচ হাজারের মতো মানুষ অংশ নেয়।
বস্তুত কৃষকরা তখন প্রতিবাদ করছিলেন। তাদের দাবির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার কারণে তারা আন্দোলন করেন। প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী যেখানে আসবেন সেখানে কি কোনো প্রতিবাদ হতে পারবে না? প্রধানমন্ত্রী কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরের কেউ? বলা বাহুল্য, আন্দোলনকারীরাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অংশীজন। তাহলে কেন তারা আন্দোলন করতে পারবেন না?
আমার ছাত্রজীবনের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম, ইন্দিরা গান্ধীকে কালো পতাকা প্রদর্শন করব। ওই সময় তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী। পাটনায় তিনি একটি সমাবেশে বক্তব্য দেবেন। তখন নিরাপত্তা ছিল বেশ কঠোর। আমরা কালো পতাকা নিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে পারছিলাম না। তাই আমরা কিছু গ্যাস বেলুন নিয়েছিলাম। সেগুলো পকেটে রেখে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলাম। মিটিংয়ে আমরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে আমরা বেলুনের পাশাপাশি ভেতর থেকে কালো পতাকাও বের করলাম। অবশেষে দুই ডজন বেলুন কালো পতাকাসহ দর্শকদের মাথার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। যদিও সে সংখ্যাটা ছিল নগণ্য, কিন্তু সতর্ক পুলিশ সেটা দেখে ফেলে। তখন পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে এবং কিছু উত্তম-মধ্যম দিয়ে জনসভার বাইরে বের করে দেয়।
ওই সময় আমরা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হৈচৈ দেখিনি। তখন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার জন্য কোনো ধরনের 'সমাজতন্ত্রী ষড়যন্ত্র' তত্ত্বও আওড়ানো হয়নি। এমনকি আমরা কোনো ধরনের মামলারও সম্মুখীন হইনি। কিন্তু এখন আমরা ভিন্ন সময়ে বাস করছি। যখন প্রধানমন্ত্রীকে সব ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরে স্থান দেওয়া হয়। এটা কি সংগত প্রশ্ন নয় যে, প্রধানমন্ত্রী দলীয় সমাবেশে গিয়েছিলেন কিনা? তিনি কি সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন, নাকি তার দলের একজন 'প্রচারক' দলীয় উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন?
সংগত কারণেই আমাদের তাদের অতীতের গণকর্মসূচির দিকে তাকানো উচিত। তিনি বস্তুত সেগুলো জাতিকে বিভেদের ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি এমনকি স্বাধীনতা দিবসেও এমন কর্মকাণ্ড করে মানুষের অর্থ অপব্যয় করেছেন। এমনকি কেবল বিরোধীরাই তার নিশানা নন বরং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে টার্গেট করেছেন। কাশি, মিরাট ও কুচের বক্তব্যগুলোতে সেটাই আমরা দেখেছি। এমনকি তার বক্তব্যের মাধ্যমে ভারতে মুসলমানদের জীবন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। তিনি তাদের অসম্মান করেছেন। অথচ তারা কর দেয় এবং রাষ্ট্রের আইন মেনে চলে। আমরা তো কখনোই তাকে জিজ্ঞেস করিনি- তিনি রষ্ট্রের আয়োজন কেন এভাবে তার আদর্শ প্রচারে ব্যবহার করছেন?
তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমাদের বিষয়টি কৃষকদের আন্দোলনের চোখে দেখতে হবে। কারণ এই প্রধানমন্ত্রীকে কৃষকরা নতুন কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য করেছেন। তবে প্রীতম সিং আমাদের সতর্ক করেছেন, পাঞ্জাবে যা ঘটেছে, বিজেপি তা এমনিতেই ছেড়ে দেবে না। ফলে এটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতির দিক থেকে বিবেচনা করলে হবে না। তার মতে, বিজেপির উদ্দেশ্য হলো, পাঞ্জাবে বিজেপির পক্ষের সরকার গঠন করা। সেখানে বিজেপি হবে ক্ষমতাশালী দল। এর মাধ্যমে সেখানে কৃষকদের আন্দোলন পঙ্গু করে দেওয়াই উদ্দেশ্য।
সেখানে এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা সংকটের বিষয়টি দেখতে হবে। বস্তুত বিজেপি আবারও গোটা দেশে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তার হিন্দু রং দিয়ে রাঙাতে চায়। এটি নিঃসন্দেহে এই ডুবন্ত দেশের জন্য বিপজ্জনক মুহূর্ত এবং এটি জীবনের ঝুঁকির কারণও হতে পারে।
অপূর্বানন্দ :দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; ডেকান হেরাল্ড থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক