ফের বাড়ছে করোনা সংক্রমণের হার। শনিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দু'দিনে করোনায় আক্রান্ত শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশে। আমরা জানি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের বেশি নূ্যনতম ১৪ দিন অব্যাহত থাকলে তখন তা মহামারি হিসেবে গণ্য হবে। এখন পর্যন্ত দেশে ২০ জনের শরীরে ওমিক্রনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে- সমকালকে এ তথ্য জানিয়েছেন আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। নতুন ধরন 'ওমিক্রন' বিশ্বকে আবার শঙ্কিত করে তুলেছে। উল্লেখ্য, নতুন ধরনে আক্রান্ত প্রায় প্রতিটি দেশেই কমবেশি বাংলাদেশি রয়েছেন। আমাদের স্মরণে আছে, গত বছর জুন থেকে দেশে 'ডেলটা' ধরনে শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে শনাক্তের হার নেমে এসেছিল দেড় শতাংশের নিচে।
গত নভেম্বরের শেষদিকে আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায় করোনার নতুন ধরন 'ওমিক্রন' শনাক্ত হওয়ার পর আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম, নতুন ধরনের সংক্রমণ রোধে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সংক্রমিত কোনো দেশ থেকে কেউ এলে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি-ব্যবস্থায় তাকে রাখতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, 'ওমিক্রন' শনাক্তের পর যারা দেশে আসেন তাদের অনেককেই পর্যবেক্ষণ ও নিয়মকানুনের মধ্যে রাখা যায়নি। দেশে প্রথম দফায় করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছিল ইতালি প্রত্যাগতদের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ও নিয়মকানুন মানায় ব্যত্যয় ঘটার কারণে। এখন পর্যন্ত স্বল্প পরিসরে 'ওমিক্রন'-এর সামাজিক সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেলেও সচেতনতা-সতর্কতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অসংগতি-ঘাটতি দূর করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার বিকল্প নেই। নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই অন্যের ঝুঁকির পথ রুদ্ধ করতে হবে। এমতাবস্থায় প্রাথমিক রক্ষাকবচ স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ অনুসরণ ও সামাজিকভাবে কোনো ক্ষেত্রেই যাতে প্রতিরোধী নিয়মগুলোর ব্যত্যয় না ঘটে তা নিশ্চিত করা। হাটবাজার, গণপরিবহনসহ সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির অনুসরণ জরুরি।
সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে, টিকাদানে গতি কম। আমরা জানি, গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি করোনার গণটিকাদান শুরু করেছিল দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ। জানা গেছে, এ পর্যন্ত দেশের ৪৪ শতাংশ এক ডোজ এবং ৩১ শতাংশ মানুষ পূর্ণ ডোজ করোনার টিকা পেয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা। এর মধ্যে শুরু হয়েছে বুস্টার ডোজ। টিকার মজুদ নিয়ে আপাতত দুর্ভাবনা নেই। আগামী মার্চের মধ্যে আরও ৯-১০ কোটি ডোজ টিকা আসার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ব্যবস্থাপনাগত সংকট এখনও জিইয়ে আছে। পর্যাপ্ত টিকা মজুদ নিশ্চিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১ জানুয়ারি থেকে সারাদেশের ইপিআই কেন্দ্রে টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য বিভাগ পরিকল্পনা নিয়েছিল, বস্তুত সেই লক্ষ্যে গত এক সপ্তাহে তারা পৌঁছাতে পারেনি। আমরা মনে করি, প্রক্রিয়াগত জটিলতা নিরসন করার পাশপাশি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সর্বস্তরে ব্যাপক প্রচার যেমন দরকার, তেমনি সমন্বয়, জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সচেতন জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় করোনা আক্রান্তের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। এমতাবস্থায় গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার বিকল্প নেই। জাতীয় কারিগরি পরামর্শ কমিটির সুপারিশ আমলে রেখে সেই নিরিখে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া ও বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজলভ্য এবং স্বচ্ছ করাও জরুরি। করোনার গত ঢেউগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, ঔদাসীন্যের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও দুর্যোগকে পুুঁজি করে অসাধুদের অপতৎপরতা বিস্তৃত হয়েছিল। এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা 'ওমিক্রন' অত্যন্ত শক্তিশালী এবং টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও 'ডেলটা' ধরনের চেয়ে বেশি হারে আক্রমণ করতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা সর্বাগ্রে জোরদার করা।