পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্র, সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আইনকানুন ও নিয়মনীতি প্রণীত হয় সাধারণত পুরুষদের পছন্দমতো বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। পরবর্তী সময়ে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টিতে অনেকটা সহায়কের ভূমিকা পালন করে। এমনই একটি বিভাজনমূলক নিয়ম- বিয়ের পর ছাত্রীরা আবাসিক হলে থাকার অযোগ্য বিবেচিত হবে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল। বাস্তবে দেখা যায়, অনুরূপ কোনো নিয়ম কখনও ছাত্র হলগুলোতে প্রচলিত ছিল না- বিবাহিত ও অবিবাহিত প্রত্যেক ছাত্র আবাসিক হলে সিট পাওয়ার ক্ষেত্রে সমভাবে বিবেচিত হবে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রতিবাদের কারণে গত ২২ ডিসেম্বর সেই ঘুণে-ধরা বৈষম্যমূলক নিয়মটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাতিল করতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য কৃতিত্বের দাবিদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা, যারা এই বৈষম্যমূলক নিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। অধিকার এভাবে প্রতিবাদ করেই আদায় করে নিতে হয়। ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সেটি আমরা দেখেছি।

একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো নারীবান্ধব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই বলব, বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসিক হলে বিবাহিত ছাত্রীদের শুধু থাকার ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। অধিকন্তু আবাসিক হলে থাকা অবস্থায় কোনো বিবাহিত অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও দিতে হবে। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেই বিখ্যাত উক্তি এখন মনে করার সময়- 'আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব'। উচ্চশিক্ষা গ্রহণকালে যদি কোনো মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে তবে তার জন্য নমনীয় পাঠ্যক্রম করতে হবে, যাতে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়েও শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করতে পারে। বিবাহিত জীবনে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া কোনো মেয়ের দোষের কারণ নয়। বরং বলতে গেলে এটা একটা অধিকার। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের করের টাকায় চলে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে অবশ্যই নিয়মকানুন থাকবে, যা সবাইকে মেনে চলতে হবে এবং নিয়মকানুনের ফলেই একটা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন কোনো নিয়মকানুন থাকা উচিত নয়, যা লিঙ্গবৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।

ফিনল্যান্ডসহ উন্নত দেশগুলোতে নারী শিক্ষার হার যত বাড়ছে, শিক্ষিত মেয়েদের সন্তান জন্মদানের হার তত কমছে। ফলস্বরূপ ঋণাত্মক হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। একে ধনাত্মক করতে উদার মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশু সুবিধা, প্রসূতি সুবিধা, বাসস্থান সুবিধা, বিনামূল্যে সন্তান জন্মের সুবিধাসহ অনেক কিছু দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। অবশেষে উন্নত দেশগুলো বিভিন্ন পন্থায় উন্নয়নশীল দেশ থেকে কর্মক্ষম মানুষকে তাদের দেশে টানছে। এভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো ব্রেইন ড্রেইনের শিকার হচ্ছে। উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এই ব্রেইন ড্রেইনের শিকার। বাংলাদেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয় হোক নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে পথপ্রদর্শক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়; বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার পালা।

ড. কাজী ছাইদুল হালিম: শিক্ষক ও গবেষক