বাজার ফের অস্থির হয়ে উঠেছে। বাজারে অস্থিরতা মানেই সাধারণ মানুষের জন্য বিড়ম্বনা। যে কোনো অজুহাতে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। আমরা জানি, অর্থনীতির সূত্র কিংবা যৌক্তিক নিয়ম হচ্ছে, সাধারণত চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যবধান থাকলে পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু সরকারের সংশ্নিষ্ট মহলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যের মজুদ ও সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে প্রশ্ন- এই তুঘলকি কাণ্ডের হোতা কারা, যারা অযৌক্তিকভাবে ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের পকেট স্ম্ফীত করছে?

আমাদের দেশে বাজারের ক্ষেত্রে 'সিন্ডিকেট' শব্দটি বহুল উচ্চারিত। এর আগে অনেকবার সরকারের দায়িত্বশীল অনেকেও এই সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেছেন। তারপরও কেন তাদের চিহ্নিত করে কেশাগ্র স্পর্শ করা যায়নি? সিন্ডিকেটের বলবানদের হাত কি এতই লম্বা? ৭ জানুয়ারি সমকালসহ কয়েকটি দৈনিকে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও গত মাসের মূল্যস্ম্ফীতির যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে প্রতীয়মান, বাজারে যেন অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ম্ফীতির তথ্য উঠে এসেছে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ম্ফীতি দুই-ই বেড়েছে। শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ম্ফীতি ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। শহরাঞ্চলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

একই দিন অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে আরেকটি দৈনিকের প্রতিবেদনে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটা চালের দাম, যার ওপর নির্ভরতা বেশি বড় অংশের মানুষের। চাল-ডালের ঊর্ধ্বগতি গত কয়েক মাস ধরেই চলছে। নতুন করে এর দাম আরও বাড়ায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির দায়িত্বশীলদের ভাষ্য- সরু, মাঝারি, মোটা দানার মসুর ডালের দাম গত বছরের তুলনায় এখন ১০ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি। তবে তাদের কাছ থেকে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। তাছাড়া ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দাসহ আরও অনেক নিত্যপণ্যের দামই মানুষের ক্রয়সাধ্যের বাইরে। অধিকাংশ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ নেই এমন কয়েকটি পণ্যের দামও স্থানীয় বাজারে ঊর্ধ্বমুখী। আমাদের দেশে বাজারে অর্থনীতির ধ্রুপদি নিয়ম অচল!

এই ভর মৌসুমেও বাজারে সবজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়সাধ্যের মধ্যে নেই। কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদন খরচের টাকাই তাদের তোলা দায় হয়ে পড়ে- এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে এ পর্যন্ত কম উঠে আসেনি। অথচ স্থানীয় উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ঢাকা বা বিভাগীয়, জেলা শহরের বিভিন্ন বাজারে এর দামের মধ্যে ব্যবধান দেখা যায় অনেক। মধ্যস্বত্বভোগীদের জাল কতটা বিস্তৃত, তাও অনেকের অজানা নয়। তা ছাড়া ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজিসহ নেতিবাচক আরও অনেক কিছুই বাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

টিসিবির কার্যক্রম ও পরিসর বাড়ানোর তাগিদ নানা মহল থেকে বারবার দেওয়া হলেও সংস্থাটির শক্তি বিদ্যমান পরিস্থিতির বিপরীতে অনেক ক্ষীণ। টিসিবির 'ট্রাকসেল' ও ডিলারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম যেন সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো। সংবাদমাধ্যমেই দেখা গেছে, ঢাকার কোনো এলাকায় টিসিবির পণ্য বিক্রির ট্রাক দাঁড়ানোমাত্র অনেক মানুষকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে। চাহিদার নিরিখে নিতান্ত অল্প পণ্য নিয়ে দাঁড়ানো এই ট্রাক পণ্য বিক্রি না করে সটকে পড়ার খবরও জানা গেছে সংবাদমাধ্যমে। বাজারে নাটাই থাকে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র অর্থাৎ 'সিন্ডিকেট'-এর হাতে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়সাধ্যের মধ্যে রাখতে সরকারের নানা রকম অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি অহরহ শোনা গেলেও কার্যত তা যেন 'বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া'র মতো।

করোনা দুর্যোগ দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষের জীবনযাপনে চরম বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই হয়ে পড়েছেন কর্মহীন, আবার অনেকের রোজগার কমে গেছে। অনেকেই জীবনযাপনের ব্যয়ে রাশ টানতে বাধ্য হয়েছেন। পুষ্টি তো দূরের কথা, অনেকের পক্ষে ডাল-ভাতের সংস্থানই হয়ে পড়েছে কঠিন। বারবার ধরন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে করোনার কয়েকটি ঢেউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এর মধ্যে অতিক্রম করে এলেও ফের করোনার নতুন ধরন 'ওমিক্রন' দুর্যোগের ছায়া দেশে দেশে ক্রমেই বিস্তৃত করছে। আমরাও এই বিপদাশঙ্কার বাইরে নই। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, যে কোনো দুর্যোগে বলবান-অসাধু চক্র নিজেদের আখের গোছাতে নির্লজ্জভাবে তৎপর হয়ে ওঠে। অথচ বিস্ময়কর হলো, এরপরও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় উদাসীনতা। দায়িত্বশীলদের এই ব্যর্থতায় বিস্তৃত হয় কদর্যের খতিয়ান।

এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন আয় কিংবা হতদরিদ্রদের অবস্থা কী হতে পারে, তাও সহজে অনুমেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি যেন 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। করোনা দুর্যোগে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোসহ নানা রকম সহযোগিতামূলক কর্মসূচি চালু করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্র এখনও তা চলমান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী ও দুর্নীতিবাজদের থাবা পড়েছে। বাজারে দাপট তাদেরই। অসাধুদের অতি মুনাফার লোভের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। পণ্য মজুদ ও সরবরাহ লাইনে কোনো সমস্যা নেই। অথচ বাজারে উত্তাপ বাড়ে বই কমে না! ৮ জানুয়ারি একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা! তাতে সহজেই প্রতীয়মান, স্বেচ্ছাচারীদের শক্তি কত প্রবল এবং কারসাজির নাটাই কার হাতে।

সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার তাগিদ নতুন নয়। অর্থনীতিবিদ, বাজার বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা অধিকার রক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা এই তাগিদ বারবার দিলেও এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ তেমন কিছুই দৃশ্যমান নয়। সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো যদি মনে করে, বাজারে মূল্যতালিকা টাঙিয়ে দিয়েই তাদের সব দায় শেষ, তাহলে তুঘলকি কাণ্ড বন্ধ হবে কীভাবে? সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভাব্য আর্থসামাজিক সংকট মোকাবিলা করার পথ নির্ণয়ে উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ছাড়া কাজের কাজ হয় না কিছুই। বাজারে যে অসাধুরা নিজেদের লাভালাভের হিসাব কষে অশুভ তৎপরতা চালাচ্ছে দিনের পর দিন, তাদের চিহ্নিত করে নির্মোহ ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না কেন- এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসন এড়াতে পারে না। বাজার নিয়ন্ত্রণের নাটাই যদি সরকারের হাতে থাকে, তাহলে ফিরে ফিরে অযৌক্তিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়সাধ্যের বাইরে যায় কী করে?

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু: সাংবাদিক ও লেখক
deba_bishnu@yahoo.com