গত শতাব্দীর আশির দশকের কাঠামোগত সমন্বয়, নব্বইয়ের দশকের ওয়াশিংটন কনসেনশাস, এই শতাব্দীর ২০০৮-০৯ অর্থনৈতিক মন্দা ও নব্য অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধানের অনুশাসন মোতাবেক পরিকল্পিত অর্থনীতি ও মানব পুঁজি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। এটি নয়া জাতীয় পরিকল্পনার (২০১০-২০২১) নতুন প্রেক্ষাপট।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ফিরে আসে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার দিনবদলের সনদ রূপকল্প-২০২১ নামে পরিচিতি লাভ করে। রূপকল্প-২০২১ বাস্তবে রূপ দিতে প্রণয়ন করা হয় বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১। দীর্ঘমেয়াদি এ পরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ঘটে 'প্যারাডাইম শিফট'। কীভাবে, সেটাই ব্যাখ্যা করছি।

প্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০২১ এর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা। দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে এই রূপকল্পের অভীষ্ট অর্জন সহায়ক হয়েছে। অন্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল- ২০১০ সালের পরে যত দ্রুত সম্ভব প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করে ২০১৪ সালের পর নিরক্ষরতা দূরীকরণ; ২০১৩ সালের পর যত দ্রুত সম্ভব স্নাতক পর্যায়ে বিনা বেতনে শিক্ষা সুবিধাদান এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত দক্ষতাসহ শিক্ষিত মানুষের দেশে পরিণত করা। ২০২১-এর মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনে দারিদ্র্য বহুলাংশে নিরসন করা।

প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা দুটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়- ষষ্ঠ (২০১১-২০১৫) ও সপ্তম (২০১৬-২০২০) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এ দুটি পরিকল্পনাই ছিল লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কৌশলগত পরিকল্পনা। এ দুটি পরিকল্পনাই বাজেট ও বার্ষিক কর্মসূচির সঙ্গে সুন্দর সমন্বয় ঘটানো হয়। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হয়। এর কারণ হলো- পরিকল্পনা একটি ভবিষ্যৎমুখী প্রক্ষেপণ। আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন হবে, তার একটি কৌশল চিত্র ও কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। এই সময়ের মধ্যে সব খাতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন স্থির করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। সে কারণে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মতামত একত্র করে তা সমন্বয় করা হয়। এটি বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ। এর ফলে পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে, যা আগে পরিলক্ষিত হয়নি।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ থেকে অর্থ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করা হয়। কোনো প্রকল্প নিতে হলে সে প্রকল্পটির সঙ্গে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সরাসরি যোগসূত্র আছে কিনা, তা যাচাই করা হয় এবং কোন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করবে প্রকল্প প্রণয়নে তা উল্লেখ করতে হয়। রূপকল্প-২০২১ এর অধিকাংশ লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নের পথে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০২১ সালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এখন তা ২৫ হাজার মেগাওয়াট। প্রত্যাশিত গড় আয়ুর লক্ষ্যমাত্রা ৭০-এর বিপরীতে ৭২ দশমিক ৮ এবং ২০১৫ আর্থিক বছরে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন।


এই দশকের আগে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে আটকে ছিল। এটাকে কেউ কেউ ৬ শতাংশের ফাঁদ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এক সময় মনে হয়েছিল, এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া বেশ কঠিন। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষ সময়ে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় এবং ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়। তার মানে, বাংলাদেশ ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫ সালেই অর্জন করতে সমর্থ হয়।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব যোগ্যতা বাংলাদেশ প্রথমবার ২০১৮ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০২১ সালে জাতিসংঘের সব মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম হয়। ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে পারত; কিন্তু করোনার আকস্মিক অভিঘাতের কারণে সম্মিলিতভাবে আরও দুই বছর উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাব রাখা হয়।
পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার একটি অনন্য দিক হলো, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্যবর্তী ও সমাপ্তি মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ভুলত্রুটি শোধরানোর সুযোগ ছিল, যা পরবর্তী পরিকল্পনায় শিক্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলাফল সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পরিকল্পনা দলিলের ওপর ধারাবাহিকভাবে মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সংস্থার কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে, যা পূর্বের পরিকল্পনাগুলোতে দেখা যায়নি। এর মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হয়।
এমডিজিতে (২০০১-২০১৫) ও এসডিজির সাফল্য অর্জন বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করেছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করেন। কারণ বাংলাদেশের মতো এত অল্প সময়ে অনন্য অর্জন বিশ্বের খুব কম দেশেরই আছে। এরই ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী সময়ে বাংলাদেশের ৮ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে।

জিডিপির আকার ২০০৯ সাল থেকে এক দশকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তিন গুণ বা তার বেশি হয়েছে। অতীতে আর কোনো দশকেই মাথাপিছু আয় এত বাড়েনি, যা সর্বশেষ দশকে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি (২ দশমিক ৪৬ গুণ)। এটি ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হবে। স্বাধীনতার সময় মাথাপিছু জিডিপির বিচারে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি ধনী ছিল। এখন বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি ধনী। আর পরপর দুই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি এখন ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে। বিগত দশকে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল বাংলাদেশের জন্য স্মরণকালের সর্বোচ্চ (৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ)।

বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো প্রতি দশকে গড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মাথাপিছু আয়ও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। তবে গত দশকে মাথাপিছু আয় গড়ে আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে (১৪২৩.৬ ইউএস ডলার গড়ে), যা বিগত কোনো দশকে সম্ভব হয়নি। গত দশকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে তুলনীয় দেশগুলোর বিবেচনায় একমাত্র চীনই (৭ দশমিক ৭ শতাংশ) বাংলাদেশ (৬ দশমিক ৮ শতাংশ) থেকে গড় প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে এগিয়ে ছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়। তৈরি পোশাকশিল্প রপ্তানিতে বিশ্বে চীনের পরই বাংলাদেশের স্থান। প্রবাসী আয় ২০১০ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে সর্বশেষ বছরে ১৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, তা বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়। হংকং-সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রক্ষেপণ- বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ২৬ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। আর সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিইবিআর) হিসাবমতে, ২০৩৫ সালেই বাংলাদেশ ২৫ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের মতে, বাংলাদেশ ২০৫০ সালে ১২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে একক মূল্যের সমতায় জিডিপির আকার বাংলাদেশ ৩০তম এবং চলতি ডলার মূল্যে অবস্থান ৩৯তম হবে।

আমরা জানি, বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে চতুর্থ, স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়। আজ আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা চাল স্বাধীনতার পর থেকে সাড়ে তিন গুণের বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি।

বাংলাদেশ এখন এশিয়ার একটি সফলতার গল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকে বাংলাদেশকে 'এশিয়ান টাইগার' নামেও অভিহিত করছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে আরও আকর্ষণীয় অধ্যায়। এর মূলে রয়েছে স্বল্প আলোচিত কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেই 'প্যারাডাইম শিফট', যা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রক্রিয়াকেই আমূল পাল্টে দিয়েছে।

ড. শামসুল আলম: প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার