আমাদের জন্ম হয়েছে গ্রামে। তখন গ্রামের দাইমার সাহায্যে সন্তানের জন্ম হতো, কোনো রকম সমস্যা ছাড়া। অথচ বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে বা গ্রামে সন্তান প্রসব করা অনেকের কাছে বিস্ময়কর স্বপ্ন। তা সত্ত্বেও নানা ধরনের জটিলতার কথা যখন শুনি, তখন গা শিউরে ওঠে। ঘটনার শেষ এখানেই নয় বরং সবে শুরু। আমার বাবা-মা বাংলাদেশের পরিকাঠামো যেমন শিক্ষা, প্রশিক্ষণের ধরন এবং চাকরির নিশ্চয়তা ইত্যাদি বিচার-বিবেচনা করে পাঁচ-সাত বছর সঠিক বয়সের থেকে কমিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে জন্মতারিখ রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। কারণ, সরকারি চাকরিতে ঢোকার একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা রয়েছে। যদি লেখাপড়া সঠিক সময় শেষ করতে না পারি, ভালো চাকরি পেতে ঝামেলা হবে। তারা একজন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিপ্রেক্ষিত বিচার-বিবেচনা করে এমনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা তখন জানতেন না একদিন আমি উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ পাড়ি দেব এবং বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করব। আমি সুইডেনে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করে ট্যাক্স পে করছি। যেহেতু এখানকার বাসিন্দা, সে ক্ষেত্রে এখানকার নিয়মানুযায়ী বয়স ৬৫ না হওয়া পর্যন্ত রিটায়ারমেন্টে যাওয়া এবং পেনশন পাওয়া যাবে না। এখন যেহেতু বয়সসীমা ৬৫, তাই আমার ক্ষেত্রে ৭০ প্লাস না হওয়া পর্যন্ত পেনশন পাওয়া সম্ভব নয়। সুইডেন উন্নত দেশ, এখানকার জনগণ ছোটবেলা থেকে ভালো সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে বড় হয়। অবসর জীবনে দেশ-বিদেশ ঘুরে মজা করবে সুস্থ শরীরে। অন্যদিকে, আমাকেও কাগজে-কলমে ৬৫ বছর কাজ করতে হবে যার সঠিক অর্থ ৭০-৭২ বছর। তারপর যদি বেঁচে থাকি তবে হবে আমার পেনশন। ৭০ প্লাস বছর বয়সে পারব কি সঠিকভাবে চলাফেরা করতে বা দেশ-বিদেশ ঘুরতে, তা জানি না।
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে আজীবন চাকরি বলে একটি প্রথা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদটি আজীবন দখল করে বসে আছেন- এমন অভিযোগ আছে। বিনিময়ে যে অর্থ দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছেন, সেই অর্থ বাকি জীবন ধরে ওঠাতে হবে, যার কারণে দুর্নীতি চলছে দেদার। যতদিন যোগ্যতার মূল্যায়ন ছাড়া এসব উচ্চপদস্থ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, অর্থাৎ যতদিন স্বচ্ছভাবে নিয়োগ দেওয়া না হবে, ততদিন হাজার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না, আসতে পারে না। দুর্নীতির মূল উৎস ঘুষ ও উৎকোচ গ্রহণ করে দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের অর্থসম্পদ আত্মসাৎ, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে থাকে। ফলে সমাজের হতদরিদ্র অসহায় লোকেরা শোষিত, বঞ্চিত, নিগৃহীত ও নিষ্পেষিত হয়। দুর্নীতির প্রভাবে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গঠিত ও বিকশিত হতে পারে না। লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করে নিজেকে ম্যানেজ করেছি, পরে লেখাপড়া শেষে সেই ১৯৯০ সাল থেকে চাকরি করছি। ছোট থেকে শুরু করে অনেক বড় পর্যায়ে কাজ করেছি। একে তো বিদেশি, তারপর অন্য দেশ, আত্মীয়স্বজন কাছে নেই এবং ঘুষ, দুর্নীতি ছাড়াই জীবনের এতগুলো ধাপ অন্য দেশে পার করলাম। কিন্তু কেউ কোনো দিন যোগ্যতা ছাড়া অন্যকিছু তো জিজ্ঞেস করল না! তাহলে বাংলাদেশে এমনটি কেন? আমিত্বের রাজত্ব চারদিকে। এটাই কি তাহলে অনেকেরই ব্যক্তিগত যোগ্যতা? যখন শুনি মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিয়েও কেউ দুর্নীতি করে, তখন খুব অনুতাপ হয়। বর্তমান বিশ্বে কোথাও আজীবন চাকরি বলে কোনো পদ নেই। চাকরি আছে ততদিন ডিমান্ড আছে যতদিন। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে আশানুরূপ ফলাফল না থাকা সত্ত্বেও দিব্যি চাকরি জুটে যায়। অনেকেই জেনেশুনেও এ ধরনের অন্যায় কাজে সহায়তা করছেন।
সমাজজীবনে যোগ্য ও নীতিবান মানুষ সীমাহীন দুর্নীতির শিকার হয়ে নীরবতা পালনে বাধ্য হয়। এভাবে ঘুষ-দুর্নীতির সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, কলহ-বিবাদ তথা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষের নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ডেকে আনে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের প্রায় ক্ষেত্রে দুর্নীতিবিষয়ক সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে দুর্নীতি থেকে বিরত রেখে অন্যকে দুর্নীতি প্রতিরোধে উৎসাহিত করার মানসিকতা নিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা অসম্ভব নয়। যোগ্যতার মানদণ্ড হোক জ্ঞান।rahman.mridha@gmail.com