দেশবাসীর দৃষ্টি যে এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিকে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১৬ জানুয়ারি রোববার এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বলা যায়, শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচনী প্রচারণা চলছিল। মেয়র পদে প্রধান দুই প্রার্থী নিজেদের প্রচার চালাচ্ছেন নির্বাচনী আইন মেনে এবং পরস্পরের সমালোচনা করছেন শালীনতার সীমার মধ্যেই। কেউ কারও বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন না; অশালীন ভাষায় আক্রমণও করছেন না। ফলে নির্বাচনী প্রচারে উচ্ছ্বাস থাকলেও কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতার খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। 

আওয়ামী লীগের প্রার্থী তিনবারের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী কিছুটা বিপাকে আছেন দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানকে নিয়ে। তাদের দু'জনের বৈরিতার কথা সর্বজনবিদিত। ডা. আইভী শামীম ওসমানকে 'গডফাদার' বলে অভিহিত করে আবহাওয়া কিছুটা গরম করে তুলেছিলেন। তিনি এটাও বলেছিলেন, তৈমূর আলম খন্দকার ওসমান পরিবারের প্রার্থী। তিনি তার উক্তির পক্ষে এই বলে যুক্তি দিয়েছেন, শামীম ওসমান ৩০ বছর ধরে গডফাদার হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ তাকে গডফাদার বলে আইভী কোনো দোষ করেননি। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতির এ দুই দিকপালের বিরোধ মেটাতে সক্রিয় হয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। তারই আলোকে গত ১০ জানুয়ারি শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছেন, নৌকার পক্ষে তিনি আছেন এবং থাকবেন। তার এ ঘোষণা দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের 'নৌকার বিরোধিতাকারীরা ভবিষ্যতে আর নৌকা পাবেন না'- হুঁশিয়ারির কারণে কিনা, তা নিয়ে সচেতন মহলে বিস্তর আলোচনা আছে। অবশ্য তার আগেই সেলিনা হায়াৎ আইভী বলে দিয়েছেন, শামীম ওসমানের সমর্থন তার প্রয়োজন নেই। তবে আইভীর ই মন্তব্যকে নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ সঠিক মনে করছেন না। কেননা, নির্বাচনে যেখানে প্রধান ফ্যাক্টর জনসমর্থন ও ভোট, সেখানে কোনো প্রার্থীর মুখে বিশেষ কারও সমর্থনের প্রয়োজন নেই- এ ধরনের অপরিণামদর্শী বক্তব্য মোটেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। তাই অনেকেই মনে করছেন, শামীম ওসমান মুখে তার সমর্থনের কথা ব্যক্ত করলেও আন্তরিকভাবে তা কতটুকু করবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে। 

আমাদের দেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী বা দলের নেতারা পরস্পরকে আক্রমণ করে নানা ধরনের বাক্যগোলা নিক্ষেপ করে থাকেন। নারায়ণগঞ্জেও তার ব্যতিক্রম নয়। যেমন স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার বলেছেন, তিনি হাতি দিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেবেন। উল্লেখ্য, নির্বাচনে তৈমূর আলম খন্দকার হাতি মার্কা নিয়ে লড়ছেন। এর জবাবে সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান বলেছেন, হাতি নৌকায় ওঠার আগেই সেটাকে কাঁধে করে নিয়ে ফেলে দেবেন। এ ধরনের বাগ্‌যুদ্ধ কোনো কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিলেও সাধারণ মানুষ এসব বেশ উপভোগ করে। তবে নেতাদের কথাবার্তায় যখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হুমকি থাকে, তখনই কথা ওঠে। নারায়ণগঞ্জেও উঠেছে। 

সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন তদারকির দায়িত্ব পালন করছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। গত ৯ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জে এক নির্বাচনী সভায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, 'আপনি ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।' জাহাঙ্গীর কবির নানকের এ বক্তব্য নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা ভালোভাবে নেয়নি। একজন সিনিয়র রাজনীতিকের এভাবে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে প্রকারান্তরে হুমকি দেওয়া আইনের লঙ্ঘন কিনা- সে প্রশ্নও উঠেছে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো শব্দ করেনি। 

এদিকে, জাহাঙ্গীর কবির নানক তৈমূর আলমকে ঘুঘুর ফাঁদ দেখানোর হুমকি দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই তিনি তা দেখতে শুরু করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১২ জানুয়ারি সমকাল 'ঘুঘু এবং ফাঁদ দুই-ই দেখছেন তৈমূর' শীর্ষক প্রতিবেদনে লিখেছে, তৈমূর আলম খন্দকারকে ফাঁদ দেখার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় গুনতে হয়নি। ঘুঘুর সঙ্গে তিনি ফাঁদও দেখতে শুরু করেছেন। ১০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তৈমূর আলমের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার প্রধান সমন্বয়ক ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুরোনো মামলায় রবি এখন বন্দি। খবরে বলা হয়েছে, রবি গ্রেপ্তারের পর নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসী হওয়ার ভয়ে অনেকেই এখন ঘরছাড়া। এদিকে তৈমূর আলম খন্দকার দাবি করেছেন, নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় তার ১৭ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়াও অন্তত ৪০ জনের বাড়িতে পুলিশ হানা দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন তাকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।  

তৈমূরকে ঘুঘুর ফাঁদ দেখানোর হুমকির পরপরই তার কর্মীদের ওপর পুলিশের এই গ্রেপ্তার অভিযান স্থানীয় সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নারায়ণগঞ্জ শাখার সম্পাদক ধীমান সাহা সমকালকে বলেছেন, 'হঠাৎ করে যাদের ধরা হচ্ছে, তাদের নির্বাচনের আরও আগে বা পরে গ্রেপ্তার করা যেত। খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, রবির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। কিন্তু তিনি তৈমূর আলমের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী। তাকে গ্রেপ্তার করে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে তৈমূর যে দাবি করেছেন, সেটাকে ভিত্তি দেওয়া হয়েছে।' সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেছেন, 'নির্বাচনে নানা অঙ্ক থাকে। এই অঙ্কের একটা এসব গ্রেপ্তার। তবে আইভীর নির্বাচনে বিরোধীদের গ্রেপ্তার গণিত অপ্রয়োজনীয়। খুব বেশি লোক এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। তবে প্রশাসনের এসব হঠকারী পদক্ষেপ আইভীর ক্ষতি করবে।' অন্যদিক নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম বলেছেন, যারা নির্বাচনে সহিংসতা করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালানো হচ্ছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতেই আমাদের অভিযান।' (সমকাল, ১২ জানুয়ারি)।

পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম যা-ই বলুন, 'আকেলমান্দ কা লিয়ে ইশারাই কাফি হ্যায়' প্রবাদ অনুযায়ী এসব গ্রেপ্তারের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কারও কাছেই আর অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। তবে মূল্যবান কথা বলেছেন রফিউর রাব্বি। প্রশাসনের আগ বাড়িয়ে এসব নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ সেলিনা হায়াৎ আইভীর জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কারণ এ ঘটনা জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারে এবং তার ফলাফল আইভীর জন্য শুভ নাও হতে পারে। সুতরাং ঘুঘুর ফাঁদ শেষ পর্যন্ত কে দেখেন- সেটাই দেখার বিষয়।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক