অনেকেরই স্বপ্ন থাকে বড় হয়ে চাকরি করবে, কেউবা ব্যবসা। মোটকথা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া চাই, তারপর বিয়ে-সন্তান-সাংসারিক বা সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং নতুন করে আবার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই। স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতা অনেক সময় মেলে, আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেলে না। প্রাইমারি স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী বন্ধুটি যখন মাধ্যমিক পাস করার আগেই ঝরে পড়ে, অন্য বন্ধুরা তখন পড়ালেখায় অনেকাংশে নিরুৎসাহিত হয়। অনেকে আবার আবেগের বশবর্তী হয়ে মূল লক্ষ্য থেকে পথভ্রষ্ট হয়। বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত টাকা ভুল জায়গায় খরচ করে বিপথে যায়। পরিশেষে চরম বিপদেও পড়ে। অনেকে আবার পড়ালেখা শেষ করার মাঝখানে এসে অপ্রত্যাশিত ভুল করে। অনেক ক্ষেত্রেই তীরে এসে তরী ডোবানোর মতো এই দুঃখ মোচন হয় না; ভুলগুলো আর কখনোই শোধরানো সম্ভব হয় না। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষমেশ যখন অধ্যয়ন সমাপ্তির সার্টিফিকেট হাতে আসে, চোখ থেকে তখন রঙিন চশমাটিও খসে পড়ে। অনেকেরই শুরু হয় কঠিন বাস্তবতায় টিকে থাকার সংগ্রাম। পথে পথে, দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন অনেকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না; হতাশায় তখন কেউ কেউ ডুবে যায় অন্ধকার জগতে।

অনেক সৌভাগ্যবান যারা বিপথে না গিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে, তারাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াইয়ে অনেক বেশি কালক্ষেপণ করে। প্রকৃতির নিয়মে বেড়ে ওঠে সন্তান। ভরণপোষণের সমুদয় দায়িত্ব যার কাঁধে, মাঝে মাঝে তাদের কেউ কেউ বড্ড বেশি অপরিচিত হয়ে যান সন্তানের কাছে! ফুটফুটে সন্তান মায়ের কাছে শেখা বুলিতে বাবা ডাকে মাত্র! কিন্তু বাস্তবে বাবা নামক পবিত্র শব্দটির গুরুত্ব বা ব্যবহার সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই যেন অপরিচিত সে। বাবার চলা-বলা-নৈতিক আদর্শ কোনোটাই আয়ত্ত ও অনুসরণ করার সুযোগ বা অনুকূল পরিবেশ পায় না বলে সন্তান যেন ডিজিটাল জগৎকেই নতুন আবির্ভাব হিসেবে ভাবতে শুরু করে। নিবেদিতপ্রাণ মানুষটির ইচ্ছা-উপদেশ-নির্দেশ স্ত্রী-সন্তান যখন উপহাস কিংবা তাচ্ছিল্য করে, বুকফাটা আর্তনাদে কান্না ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না তখন। জীবনসায়াহ্নে অবচেতন মনেই অর্থ উপার্জনকারী মানুষটি উপলব্ধি করতে শেখে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। কেননা, বেলা যে অস্তমিত প্রায়! অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে শেষমেশ মানুষ যেন জীবনের প্রকৃত অর্থ ভুলতে বসে। যথার্থ স্বামী বা আদর্শ বাবা হওয়া তত সহজ নয়। তাই বাবা হওয়ার আগে প্রকৃত মানুষ হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

মেডিকেল সায়েন্সের গবেষণামতে, প্রতিটি মানবসন্তানের জন্মের পর থেকে তিন বছর বয়স পর্যন্ত নিউরন সেল অনেক বেশি সুগঠিত হয়। আর তাই এই বয়সে সন্তানকে সঠিকভাবে লালনপালন করতে, এমনকি তার উন্নত ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে মা-বাবা উভয়কেই অনেক বেশি যত্নশীল হওয়া জরুরি। শুধু ডিভাইস বা যন্ত্রনির্ভর সন্তানরা একদিকে যেমন মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে, অন্যদিকে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনেও তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। এ ছাড়া আমরা জানি, শিশুরা দেখে দেখেই অনেক কিছু শেখে। শিশুদের জন্য পরিবারই হলো সবচেয়ে বড় 'শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান'। অনুকরণপ্রিয় হওয়ার ফলেই বড়দের চালচলন, আচার-আচরণ, ভালোমন্দ সবকিছু খুব সহজেই শিখে ফেলে। তাই সন্তান তো বটেই, যে কোনো শিশুর সামনে কোনো অবস্থাতেই মন্দ কিছু বলা, অপ্রত্যাশিত আচরণ করা উচিত নয়।

'এইজিং পপুলেশন ইন পাবলিক হেলথ'-এর গবেষণামতে, কোনো একটি দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে আনুপাতিক হারে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যত বেশি হবে সেই দেশ তত বেশি সমৃদ্ধিশালী হবে। অতএব জনসংখ্যা অধিক হলেও কর্মক্ষম হলে তা আশীর্বাদ! মানবিক মূল্যবোধহীন জনগোষ্ঠী সমাজের জন্য বড় উপসর্গ। সুতরাং বাবাদের অন্তত সৎ, নীতিবান, কর্তব্যপরায়ণ, নিরপেক্ষ; সর্বোপরি আদর্শ মানুষ হওয়া খুব দরকার, যাতে সন্তানও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকাও খাটো করে দেখা যাবে না। তবে, বাস্তবতা বিবেচনায় বাবাদের সর্বাগ্রে আদর্শ পুরুষ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সন্তানের চোখে বাবা প্রিয় মানুষ, সেরা আদর্শ।

তানজিমুল ইসলাম: সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকারকর্মী