এই নিবন্ধ যখন লিখছি, ততক্ষণে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে 'ব্রেকিং নিউজ' শুরু হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের হিসাবে আগের দুইবারের মতোই তিনি ৭০-৮০ হাজার ভোটে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে আছেন। চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফলে ভোটের অঙ্ক যা-ই হোক না কেন, এটা স্পষ্ট- ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী তৃতীয়বারের মতো শীতলক্ষ্যা তীরের নগরটির মেয়র পদে বসতে যাচ্ছেন। কিন্তু শুধু ভোটের হিসাব কষেই এ নির্বাচনের সরল অঙ্ক সম্পন্ন হতে পারে না। মানে ও মনোযোগে জাতীয় হয়ে ওঠা 'স্থানীয়' সরকারের এই নির্বাচনের বিশ্নেষণ শুধু ব্যক্তি সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয় এবং তৈমূর আলম খন্দকারের পরাজয়েও সীমিত থাকা উচিত হবে না।

কাঠামোগত দিক থেকে এ দেশের যে কোনো নির্বাচনেই সাধারণত তিনটি মাত্রা থাকে- প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল তথা বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ এবং ভোটারের উৎসাহ-উদ্দীপনা। তিন পক্ষেরই নানা মাত্রার অবদানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনের এই 'ধ্রুপদি' তিন মাত্রা যেন ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। জাতীয় নির্বাচন তো বটেই, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও ভোট প্রদান ও গ্রহণ যেন হয়ে উঠছিল নিয়ম রক্ষার অনুষঙ্গ মাত্র। এ দেশের জনসাধারণের কাছে নির্বাচন যে 'উৎসব' ছাড়া কিছু নয়, তা যেন সবাই ভুলতে বসেছিল।
প্রথম মাত্রা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা যদি বলি, নির্বাচন কমিশন তপশিল ঘোষণা করেই খালাস। সবার জন্য যাতে সমতল মাঠ প্রস্তুত থাকে এবং ভোটাররা অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারে- এসব ব্যাপারে গত দুই নির্বাচন কমিশন মহাকাব্যিক নিরুৎসাহ প্রদর্শন করে এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অপর দুই অংশ জনপ্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থানও তথৈবচ। বরং পুলিশ ও প্রশাসনের কোনো কোনো অংশের অতি উৎসাহ পরিস্থিতি জটিলই করে তুলেছে।

একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ বা বহুপক্ষীয় প্রার্থিতা হচ্ছে দ্বিতীয় মাত্রা। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে যতটা উৎসাহী, প্রধান বিরোধী দল যেন ততটাই নিরুৎসাহী ছিল। এটা ঠিক, নির্বাচনী ব্যবস্থা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, তাতে নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষে উৎসাহ ধরে রাখাও কঠিন। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব নিশ্চয় সবচেয়ে বেশি; কিন্তু কম হলেও বিরোধী দলের যে দায়-দায়িত্ব থাকে, তাও ছিল অনুপস্থিত। বলা বাহুল্য, এ দুই মাত্রার দুরবস্থা দেখে নির্বাচনী ব্যবস্থার তৃতীয় মাত্রা ভোটাররাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছিল। কারও কারও যদিও উৎসাহ খানিকটা ছিলও, তাদের অনেকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেননি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেন তিন মাত্রাই তার ধ্রুপদি রূপ ফিরে পেয়েছিল। নির্বাচন কমিশন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সক্রিয় ও আন্তরিক থেকেছে। বর্তমান কমিশনের মেয়াদকালে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সমালোচনামুখর ছিলেন। তিনিও পর্যন্ত এ নির্বাচনকে 'সর্বোত্তম' আখ্যা দিয়েছেন (সমকাল অনলাইন, ১৬ জানুয়ারি ২০২২)। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা জনপ্রশাসনও যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। আগের মতো কোথাও পোলিং অফিসার বা প্রিসাইডিং অফিসারদের নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল বা সাংবাদিকদেরও বাধা দেওয়া হয়নি কোথাও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ত্রুটি করেনি। নির্বাচনের দিন কোথাও ধর্তব্য সংঘাত ও সংঘর্ষ দেখা যায়নি। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ।

রাজনৈতিক দলগুলোর কথা যদি বলি- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। সাত ধাপে চলমান ইউপি নির্বাচনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়েই উঠেছে এন্তার প্রশ্ন। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে সেলিনা হায়াৎ আইভীর মনোনয়ন-যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। নারায়ণগঞ্জের 'প্রভাবশালী' একটি পরিবারের পক্ষে নানা অসহযোগিতার অভিযোগ থাকলেও সেটাকে দলের অভ্যন্তরীণ 'গণতন্ত্রচর্চা' হিসেবে পাসমার্ক দেওয়াই যায়। ওই পরিবারের প্রধান মুখ 'হৃদয়ে রক্তক্ষরণ' নিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত নৌকায় ভোট দিয়েছেন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরও প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া দলটির কেন্দ্রীয় নেতা তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে 'সম্পর্কচ্ছেদ' করার যে প্রতিযোগিতা দেখিয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলার ইতিহাসে তা মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে পরিচিতরা যেভাবে মর্জিমাফিক আইভী কিংবা তৈমূরকে সমর্থন করেছেন, তা কি 'অরাজনৈতিক' স্থানীয় সরকার নির্বাচনের 'বেস্ট প্র্যাকটিস' হয়ে থাকবে না?

প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার তিন মাত্রায় নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি দৈর্ঘ্য হয়, রাজনৈতিক দল হচ্ছে এর প্রস্থ। অপর মাত্রা ভোটারের উৎসাহ-উদ্দীপনাকে বলা যেতে পারে উচ্চতা বা গভীরতা। ভোটার উপস্থিতির হারের ওপরেই একটি নির্বাচনের 'উচ্চতা' নির্ধারিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যখন ভোটাররা ক্রমেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলছিল, তখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দীর্ঘদিন পর দেখা গেল ভোটারদের দীর্ঘতর সারি। কোথাও কোথাও ইভিএম পরিচালনায় সামান্য কারিগরি ত্রুটি ছাড়া ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ও অভিযোগ ছিল না।

সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের মতো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেরও চতুর্থ মাত্রা হচ্ছে 'সময়'। এই নির্বাচন এমন সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছেন রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপও ক্রমবর্ধমান। নির্বাচন কমিশনে যারাই থাকুন; জনপ্রশাসন ও পুলিশের মাঠ পর্যায়ে যারাই কাজ করুন; ক্ষমতাসীন দল যদি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেকবার প্রমাণ হলো। বিরোধী দলও সম্ভবত এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বুঝতে পারছে যে, সুষ্ঠু নির্বাচনের চাবিকাঠি ঠিক কোথায় রাখা। নির্বাচনের চতুর্থ মাত্রা সময়ে এই 'স্মারক' ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল কীভাবে গ্রহণ করে- সামনের দিনগুলোতে সেটাই দ্রষ্টব্য।

লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com