অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য। দেশের অন্যতম শীর্ষ এ ভাইরোলজিস্ট ২০০৮-০৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য ছিলেন। বিএসএমএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি সেন্ট টমার্স হসপিটাল থেকে হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাস  বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন তিনি। তার জন্ম ১৯৪৩ সালে দিনাজপুর জেলার হাকিমপুরে।

সমকাল: গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের দেশে মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিকে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যায়। এবার জানুয়ারিতে এসে বেড়ে যাওয়ার কারণ কী?

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম: ২০২০-২১ সালে আমরা দেখেছি, মার্চের শেষে করোনা সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এবার জানুয়ারিতে এসে এটা বেড়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করতে হবে। এখন পর্যন্ত শহর এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। সংক্রমণের হার ১৫-এর কাছাকাছি চলে গেছে। তবে গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার তথ্য এখনও পাইনি।

সমকাল: আপনারা কারিগরি কমিটি থেকে যেসব সুপারিশ দিয়েছেন, তার মধ্যে সংবাদমাধ্যমে আসা বেশ কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। সম্প্রতি ঘোষণা করা ১১ দফা বিধিনিষেধে কতটুকু সুফল পাবেন বলে আপনি আশা করছেন?

নজরুল ইসলাম: করোনার শুরুতেই (২০২০ সালের প্রথমদিকে) আমরা সবাইকে মাস্ক পরতে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু সেটা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে আমরা জোরালোভাবে নামিনি। মাঝেমধ্যে দু-একজন কর্মকর্তা নেমেছেন। এটা পুরোপুরি বাস্তবায়নে যেভাবে নামা দরকার ছিল, সেভাবে নামা হয়নি। এখন এই যে বিধিনিষেধ জারি করা হলো, এটা কেমন হবে জানেন? পুলিশ বিভাগ বলে- আপনারা চুরি করবেন না, ডাকাতি করবেন না, রাহাজানি করবেন না, খুন-ছিনতাই করবেন না। এসব বলে যদি তারা ঘরে বসে থাকে তাহলে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি বন্ধ হবে? সংবাদমাধ্যমে বিধিনিষেধ ঘোষণা করে ঘরে বসে থাকলে সেই চোর-পুলিশ খেলার মতোই অবস্থা হবে।

সমকাল: গণপরিবহনে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী চলার ব্যাপারে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এটাকে হোঁচট মনে করছেন কি?

নজরুল ইসলাম: বেসরকারি গণপরিবহন কোনো সময়ই নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এর আগে সড়ক দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে দেখেছি। রাষ্ট্র সত্যিকারার্থে বেসরকারি গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অপারগ। কয়েকদিন আগে দেখলাম, চট্টগ্রামে মালিক সমিতির নেতারা বলেছেন- এসব নির্দেশনা তারা মানবেন না। এভাবে ঘোষণা দেওয়ার পর আর কিছু বলার অপেক্ষা থাকে না।

সমকাল: গণপরিবহনে এভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা কি বিরূপ প্রভাব ডেকে আনতে পারে?

নজরুল ইসলাম: নেতিবাচক প্রভাব তো আনবেই- এতে কোনো সন্দেহ নেই। টেলিভিশনে দেখলাম, বাসে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী তো নয়ই, শতভাগ যাত্রী তোলার পরও দাঁড় করিয়ে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনেকের মুখেই মাস্ক ছিল না। এটা অবশ্যই ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনবে।

সমকাল: গণপরিবহনের মধ্যে ট্রেন অর্ধেক সংখ্যক আসনে যাত্রী পরিবহন শুরু করেছে। পাবলিক বাসে এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। লঞ্চে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে?

নজরুল ইসলাম: লঞ্চের কেবিনে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। কিন্তু ডেকে তো বিশাল খোলা স্থান। এখানে যাত্রী পরিবহন মানে হলো বিশাল সমাগম। যেখানে আমরা জনসমাগমকে নিরুৎসাহিত করছি, সেখানে দীর্ঘ সময় লঞ্চে থেকে যাতায়াতের মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে লঞ্চে যদি লাল রং দিয়ে দাগ কেটে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে শয্যা এঁকে দেওয়া যায়, তাহলে এটা বাস্তবায়ন সম্ভব। অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে এভাবে লঞ্চ চলতে পারে।

সমকাল: আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সুপারিশের চিন্তা আছে কি?

নজরুল ইসলাম: শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, দুই ডোজ টিকা না নিলে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে প্রবেশ করতে পারবে না। এদেশে ১২-১৮ বছর বয়সের শিক্ষার্থী ১ কোটি ১৫ লাখ। ৪০-৪৫ লাখ টিকার প্রথম ডোজ ও ৫-৬ লাখ শিক্ষার্থী এরই মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছে। দু'দিন আগেও আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সভা করেছি। তারা ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনার কথা বলেছে। এটা তারা পারবে না। প্রথমে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা বলছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথা ছিল, ১৪ তারিখ থেকেই বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করা হবে। সেটা সম্ভব হয়নি। এখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। সমন্বয় থাকা দরকার। না হলে স্কুল খোলা বা বন্ধ যা-ই হোক, অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। তারা তখন এমনিতেই আর স্কুলে যেতে পারবে না। তখন আরও খারাপ পরিস্থিতি হবে।

সমকাল: শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। গণপরিবহনের চালক, সহকারী তথা স্টাফদের টিকা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সব পেশাজীবীকে এত দ্রুত কি টিকার আওতায় আনা যাবে?

নজরুল ইসলাম: সবাইকে টিকার আওতায় আনা যাবে। তবে সময় লাগবে। এত দ্রুত সময়ে হবে না। কারণ টিকা একসঙ্গে অনেক এনে জমা করা যাবে, কিন্তু পুশ করতে সময় লাগবে। প্রক্রিয়াগত বিষয় আছে। হয়তো প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের মতো এক দিনে ৮০ লাখ টিকা দেওয়া যায়। এটা তো রোজ করা যাবে না।

সমকাল: লকডাউনের চিন্তা কি আপনাদের বিশেষজ্ঞ দল করছে? এটা কি বৈজ্ঞানিক কোনো সমাধান?

নজরুল ইসলাম: লকডাউন বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? লকডাউন মানে বাসায় থাকতে হবে। ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। সরকারি কর্মকর্তারাও এটা বোঝেন কিনা সন্দেহ আছে। সাধারণ মানুষ তো বোঝেই না। লকডাউন মানে কারও বাসার গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া না। আগের লকডাউনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, লকডাউন মানে রাস্তায় চেকিং। রিকশাওয়ালাদের লাঠিপেটা। বিদেশে যেভাবে বৈজ্ঞানিক লকডাউন করে, এটা আমাদের দেশের বাস্তবতায় সম্ভব না। যেটা পারব না সেটা নিয়ে চিন্তা করে কী লাভ? আমাদের দেশে একটা লোক এক দিন কাজ না করলে না খেয়ে থাকবে। তাই লকডাউন নয়, মাস্ক নিশ্চিত করা গেলে ৮০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ থাকবে।

সমকাল: আমরা প্রায়ই শুনি, টিকা নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করা হলেও ৪-৫ মাস পর মেসেজ আসে। এটা কীভাবে দ্রুত সময়ে নিশ্চিত করা যায়?

নজরুল ইসলাম: একসঙ্গে অনেককে টিকা দেওয়া যাবে না। তাই অপেক্ষা করতে হবে। যারা ব্যবস্থাপনায় আছেন, তারাও মানুষ। তাদেরও ভুল-ভ্রান্তি থাকবে। সুতরাং দোষারোপ না করে অপেক্ষা করতে হবে। কিছু বিশৃঙ্খলা থাকলেও ৮০ শতাংশই তারা সফল। শতভাগ সাফল্য কোনো সেক্টরেই আসে না। সময় লাগলেও যেভাবে এগোচ্ছে তাতে সবাই টিকা পাবেন।

সমকাল: আপনি অণুজীববিজ্ঞানী। দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিও ছিলেন। একজন চিকিৎসক-গবেষক হিসেবে আপনার অভিমত জানতে চাচ্ছি, আর কতদিন আমাদের করোনা মহামারি বয়ে বেড়াতে হবে?

নজরুল ইসলাম: ভাইরাসের অনেক সমাজ আছে। একেকটার বৈশিষ্ট্য একেক রকম। ভাইরাস একেক বয়সের মানুষকে একেকভাবে আক্রমণ করে। এ রকম শীতের ভাইরাস আমাদের দেশে কয়েকটা আছে। ভাইরাসের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- শ্বাসনালিতে একটা ভাইরাস প্রবেশ করলে ওই দরজা দিয়ে আর কোনো ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে না। আবার কোনো কোনো ভাইরাস একসঙ্গে একাধিক প্রবেশ করতে পারে। আমরা গবেষণা করে দেখছি কোন ভাইরাসটা প্রবেশ করতে আর কোন ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে না। যদি এটা বের করতে পারি তাহলে ওই ভাইরাসটিকে টিকা আকারে প্রয়োগ করলে আর করোনাভাইরাস প্রবেশ করতে পারবে না। কোন ভাইরাসের এই বৈশিষ্ট্য আছে তা দেখছি। একটা প্রকল্প শুরু করেছি। এই গবেষণা সফল হলে বলা যাবে কতদিন মহামারি বয়ে বেড়াতে হবে।

সমকাল: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের উদ্ৃব্দতি দিয়ে বলা হচ্ছে, বছর বছর করোনার টিকা নিয়ে বেঁচে থাকতে হতে পারে। যদি এমন হয় তাহলে সরকারের পক্ষে এভাবে সারাবছর বিনামূল্যে টিকা দেওয়া সম্ভব?

নজরুল ইসলাম: বছর বছর টিকা দেওয়াও সম্ভব। এটা করতে হলে আমাদের দেশে টিকা ইনস্টিটিউট করতে হবে। তখন কম খরচে টিকা উৎপাদন ও বাজারজাত করা যাবে।

সমকাল: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

নজরুল ইসলাম: আপনাকে এবং সমকালের পাঠকদেরও ধন্যবাদ। সেই সঙ্গে সবাইকে ঘরের বাইরে মাস্ক পরে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।