বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অংশ হিসেবেই সম্ভবত জেলা প্রশাসক মঙ্গলবার থেকে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনের আগে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে 'পুল' গঠনের প্রস্তাব এনেছেন। আমরা মনে করি, এটি যথার্থ প্রস্তাব। আমরা দেখেছি, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআইবি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উঠে আসে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে সাড়ে তিন লাখ থেকে শুরু করে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এ অর্থ দিতে হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিকে।

আশ্চর্য বটে, মাধ্যমিক শিক্ষার এ চিত্র অনেকটা 'ওপেন সিক্রেট' হলেও এর বিপরীতে, অর্থাৎ স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। তবে বেসরকারি স্কুল-কলেজে সহকারী শিক্ষকরা এখন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএর নিবন্ধনের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ পাচ্ছেন। অনেকটা বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের পরীক্ষার আদলে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভার মাধ্যমে উত্তীর্ণ প্রার্থীকে এনটিআরসিএ সংশ্নিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ করে বলে আগে যেমন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির প্রভাব ছিল, সেটি এখন আর নেই। কিন্তু প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংকট রয়েই গেছে। যার ফলে সেখানে অনৈতিক লেনদেন কিংবা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

আমরা জানি, প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা রয়েছে। গত বছরের মার্চে জারি করা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিপত্রে বলা হয়, সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে তিন বছরের অভিজ্ঞতাসহ এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে মোট ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করা যাবে। কলেজের ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপক পদে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নির্ধারণ করে এবং এদের যে কোনো একটিতে প্রথম শ্রেণি ও শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরেই তৃতীয় শ্রেণি গ্রহণ না করার কথা বলা হয়। অনেকে কঠিন শর্তের কারণে এ নীতিমালার সমালোচনা করেছেন। বলাবাহুল্য, বর্তমান নিয়মে কেউ শর্ত পূরণ করলেও এ নিয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবমুক্ত নয়। সে জন্যই পুল গঠনের বিষয়টি আসছে। প্রস্তাবে পুল গঠনের বিস্তারিত বলা না হলেও আমরা মনে করি, এ নিয়ে আরও চিন্তাভাবনার সুযোগ রয়েছে।

অধ্যক্ষ এবং প্রধান শিক্ষক নিয়োগে পুল গঠনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রাধান্য পাবে। কিন্তু কারা এ পুল গঠনের দায়িত্ব নেবেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এনটিআরসিএ পুল গঠনের কাজটি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বিদ্যমান নীতিমালা থাকবে কিনা। এনটিআরসিএ বিদ্যমান নীতিমালায় যেখানে শিক্ষকদের আপত্তি রয়েছে, সেখানে ছাড় দিয়ে যোগ্যতা নির্ধারণ করে বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে আগ্রহী অভিজ্ঞ শিক্ষকদের আবেদন আহ্বান করতে পারে। আগ্রহী শিক্ষকদের অধ্যক্ষ হতে প্রয়োজনীয় গুণাবলি যাচাইপূর্বক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে চূড়ান্ত করে একটি পুল গঠন করা যেতে পারে। এর পর সেখান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার আলোকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।

বলা বাহুল্য, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষকের পদ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানপ্রধান সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান। যোগ্য প্রধান পেলে যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিয়োগ জটিলতা কিংবা নানা কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন প্রধানের পদ শূন্য থাকে। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রশাসন অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে পুল গঠনের মাধ্যমে সমস্যা যেমন কাটিয়ে উঠবে, একই সঙ্গে যোগ্য নেতৃত্বে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমভাবে এগিয়ে যাবে।