করোনাকালে সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও এক কঠিন সময় পার করছে। মানুষ টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এই মহামারি থেকে মুক্তির আশা করেছিল। কিন্তু ফের করোনার নতুন ধরনের আবির্ভাবের ফলে আবার শঙ্কা জেগেছে। গত নভেম্বরেও আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের হার অনেক কম ছিল। কিন্তু কয়েক দিন থেকে আবার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকলেও শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির ছিল প্রায় ১৮ মাস। যদিও অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বস্তরের শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে সরকার। সারাদেশে গত বছর অক্টোবর মাস থেকে সশরীরে ক্লাস এবং পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু করোনার বর্তমান উচ্চ সংক্রমণে শিক্ষাক্ষেত্রে আবার হতাশা দেখা দিয়েছে- কখন বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান! যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, এখনই সরকার এমন চিন্তা করছে না। সরকার ১২-১৮ বছরের সবাইকে যত দ্রুত সম্ভব টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছেন ২০২২ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা। দুই বছর ধরে এই পরীক্ষাগুলো আয়োজন করাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এ বছরের পরীক্ষাগুলো কবে হবে, এখনও বলা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। যেমন সিলেবাস শেষ করা, সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করা এবং করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। তবে এ দুটি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা উচিত এবং এ সময়সূচি সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা উচিত।
ইতোমধ্যে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় পরীক্ষার সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এ অনুযায়ী অনলাইন এবং সশরীরে ক্লাসের মাধ্যমে মনে হয়, সব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ পরীক্ষার সিলেবাস শেষ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে শেষ না হয়ে থাকলে তাদের সময় বেঁধে দেওয়া উচিত কবে নাগাদ শেষ করতে হবে। কিছু শিক্ষার্থী আরও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস চায়। সিলেবাস আর কমানো উচিত হবে না। কেননা, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এসএসসি পাস করে কলেজের বিশদ সিলেবাস কীভাবে শেষ করবে কিংবা শিক্ষক কীভাবে নির্দিষ্ট সময়ে পাঠদান করবেন? কারণ এই শিক্ষার্থীদের ভিত্তি থাকবে অনেক দুর্বল। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় কীভাবে তারা চান্স পাবে কিংবা চান্স পেলেও ভালো পড়াশোনা করতে ও উচ্চশিক্ষায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে অনেক সমস্যা হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার কথা বললেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের গুণগত মান বজায় রাখার জন্য পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা নিতে পারে। ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করে পরীক্ষা নিয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে সিলেবাস আর সংক্ষিপ্ত করা উচিত হবে না। অনেক শিক্ষার্থী যারা নিয়মিত লেখাপড়া করে সিলেবাস শেষ করে হয়তোবা পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা পরীক্ষার সময়সূচি না পেলে পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়তে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য অনেক ক্ষতির কারণ হবে। সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা ছাড়াও পরীক্ষা সব বিষয়েই নেওয়া উচিত। ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অনেকেই মন খারাপ করেছে। কারণ তাদের জেএসসি পরীক্ষার ফলের কারণে কাঙ্ক্ষিত জিপিএ পায়নি। যদিও তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তিনটি বিষয়ের ফল অনেক ভালো হয়েছে। আমাদের কাজ শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা। কিন্তু সিস্টেমের ত্রুটির কারণে তাদের মধ্যে হতাশা যাতে দেখা না দেয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। শিক্ষার্থীরা আগে থেকে পড়ার সময়সূচি জানলে তাদের পড়াশোনায় আগ্রহ থাকবে এবং প্রস্তুতি নিতে পারবে।
আমরা দেখছি, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ লক্ষণের কারণে কেউ কেউ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। টিকা নেওয়ার পরও কেন করোনা হচ্ছে? কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার প্রথম ছয় মাস পর অ্যান্টিবডি কমে যায়। সে ক্ষেত্রে অনেকেই এখন আবার টিকার বুস্টার ডোজ নিচ্ছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে গত বছরের নভেম্বর থেকে। অনেকে ইতোমধ্যে টিকার দ্বিতীয় ডোজও নিয়েছে। তাহলে এই শিক্ষার্থীদের টিকার কার্যকারিতা থাকবে আগামী মে-জুন পর্যন্ত। তারপর তাদের আবার বুস্টার ডোজ দিতে হবে। সরকার এর মধ্যে ১২ বছরের ওপরে শিক্ষার্থীদের টিকা দ্রুত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ২০২২ সালের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দ্রুত টিকার ব্যবস্থা করে তাদের পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করা উচিত। অন্যথায় তাদের টিকার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তবে আমরা জানি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোনা প্রতিরোধ করা অনেকটাই সম্ভব।
দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে কোনো পরিস্থিতিতে উল্লিখিত দুটি পরীক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে এবং আগামী মাসে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তাই এখন জরুরি করণীয়, পরীক্ষার ফরম পূরণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি যেমন আগামী মার্চ মাসের মধ্যে সিলেবাস শেষ এবং সব পরীক্ষার্থীর জন্য টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা। পরীক্ষার আগাম সময়সূচি ঘোষণা করে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করা দরকার। যত দ্রুত এ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, ততই মঙ্গল।
ড. মোহাম্মদ শাহ্‌ মিরান: অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
shahmiran@du.ac.bd