নাব্য রক্ষায় নদী খনন একটি জরুরি পদক্ষেপ। আমরা জানি, বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী দখল-দূষণ ও ভরাটে বিপর্যস্ত। আমাদের নদীর সংকট যতটা বাড়ছে; নদী সুরক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণের হার যেন ততটাই কমছে। পলি ও বালু দ্বারা ভরাট হওয়া নদী যাতে নিয়মিত খনন করা হয় সে জন্য নানা দাবি ও দেন-দরবার করার পর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই প্রকল্প গ্রহণের পেছনেও অনেক ক্ষেত্রে অন্য স্বার্থ জোরালো রয়েছে। নদী খননের নামে আসলে কী হচ্ছে- বুধবার সমকালে লোকালয়ে প্রকাশিত একটি খবরই তা স্পষ্ট করছে। 'খননের পর ভাঙনের কান্না কুমার নদের পাড়ে' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে নদী খনন আসলে হিতে বিপরীত হয়েছে। আলোচ্য ফরিদপুরের নগরকান্দায় কুমার নদ খননের পর মানুষের বসতবাড়ি নদে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে থানা, স্কুল ভবন ও সদর বাজার।
স্থানীয়দের বক্তব্যেই বাস্তবতা উঠে এসেছে। তারা বলছেন, নদী খনন করার নামে তারা বালুর ব্যবসা করছে। গভীর করে নদ খনন করে যেভাবে বালু তুলে নিচ্ছে, সে কারণে নদের পাড় ভেঙে পড়ছে। বস্তুত খননের নামে চলছে নানা ধরনের ব্যবসা। খনন কাজ পাওয়া নিয়ে হচ্ছে এক ধরনের ব্যবসা; বালু বিক্রির মাধ্যমে হচ্ছে অন্য ধরনের ব্যবসা। আবার নদী খননের পর কাদামাটি পাশে ফেলে রাখায় সেগুলো সরানোর জন্য পুনরায় বরাদ্দ চাওয়া এবং সেখানে সরকারি বরাদ্দের মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন ব্যবসা। অথচ খনন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়মমাফিক হচ্ছে না। অতিরিক্ত খনন করার ফলে কুমার নদের মতো পাড়ের জনবসতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় নদীর পাড়েই কাদামাটি ফেলার কারণে সেগুলো আবার নদীত পড়ে ভরাট হয়ে যায়। নদী খনন নিয়ে যেন এক ধরনের খেলা চলছে। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে; মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; নদীরও উপকার হচ্ছে
না। উপরন্তু লাভবান হচ্ছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী।
অথচ কিছু নদীর খনন কাজ বিনামূল্যেই করা সম্ভব। নদী ভরাটকারী পলি, বালু ও কাদামাটি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়। অবকাঠামো নির্মাণে সিমেন্টের সঙ্গে বালু অবশ্যক। নদী খননে বালু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যেমন চুক্তি করা যায়, তেমনি অন্যান্য ক্ষেত্রে যাদের পলি, বালু ও কাদামাটি প্রয়োজন তাদের সবার অংশগ্রহণে খনন কাজ করতে পারলে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করা যায়। সেভাবে না করলেও নদী খননের কাজটি পরিকল্পিতভাবে হওয়া জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশেও সফল উদাহরণ রয়েছে এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়েও সরকার একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভরাট হওয়ার ফলে দেশজুড়ে উল্লেখযোগ্য নদীরই এখন মরণদশা। এমনকি নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌপথ অনেক কমে গেছে। পরিকল্পিতভাবে খনন কাজের মাধ্যমে নদীগুলো যেমন ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তেমনি নৌপথের বিস্তৃতিও অসম্ভব নয়। সে জন্য খনন কাজের পুরো প্রক্রিয়া প্রথমত স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত কতটুকু খনন করতে হবে; খননের পর বালু কিংবা কাদামাটি কীভাবে রাখতে হবে, তারও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। পুরো কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে প্রশাসনের নিবিড় তদারকির বিকল্প নেই। তা না হলে নদী খনন এভাবে ব্যবসার উপলক্ষ হয়েই থাকবে।
ফরিদপুরের নগরকান্দায় কুমার নদের তথাকথিত খননের প্রভাব যেভাবে পাড়ের মানুষ টের পাচ্ছে সেটিই বস্তুত আমাদের প্রচলিত নদী খননের সংকট সামনে আনছে। সেখানে বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তার চেয়েও প্রয়োজন এ খনন কাজের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি করা।
নদী রক্ষা, নৌপথ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির জন্য নদী খনন অনিবার্য বাস্তবতা। প্রকৃত অর্থেই নদী খনন করলে আমরা এর বহুবিধ সুফল পেতে পারি। ইতোমধ্যে দেশে অনেক নদী খননও হয়েছে। অথচ সুফল কি আমরা পেয়েছি? নদী খননে এতদিনের অভিজ্ঞতা আমাদের ভাঙনের কান্নার মতোই বাজছে। নদী খননের বিপরীত যে পিঠ আমরা দেখছি তা চলতে দেওয়া যায় না। নদী, মানুষ ও পরিবেশের স্বার্থেই এ অনৈতিক চর্চা বন্ধ করতে হবে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: সাংবাদিক
mahfuz.manik@gmail.com