তিনি যে আমার জীবনে কত বিস্ময় উপহার দিয়েছেন তা তিনি জেনেছেন জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে। যদিও আমি জানতাম না, আমার সঙ্গে আর কথা হবে না ২০২০ সালের পরে। আমি আর জানাতে পারব না, আমার জীবনকে কিংবা যাদের জীবন ৬০ বা ৬৫-এর ওপরে গেছে তাদের অনেকের জীবনে কাজী আনোয়ার হোসেনের ভূমিকা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৪ সালে সেগুনবাগিচা প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত কুয়াশা সিরিজের প্রথম বই। রবিন হুডের মতো এক বাঙালি চরিত্র। সরোদের মতো মিষ্টি এক বাদ্যযন্ত্র বাজান তিনি। সঙ্গে আরও দুই চরিত্র শহীদ আর কামাল। কী যে দুর্দান্ত জনপ্রিয় হয়েছিল কুয়াশা সিরিজ তখন! ১৯৭১ সালে শহীদ বা কামাল এই দুই চরিত্রের মধ্যে একটির মৃত্যু হয়। এর পর কত যে চিঠি কাজী আনোয়ার হোসেনের দপ্তরে জমা হয়েছে, সেটা কেউ জানে না। পরবর্তী পর্যায়ে কাজী আনোয়ার হোসেন সেই চরিত্রকে আবার জীবিত করে তুলতে বাধ্য হন।
কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও রহস্য খুব ভালোবাসতেন। তা না হলে নিজের জীবনকে এত রহস্যময় করে রাখবেন কেন? তিনি ভালোবাসতেন মাছ ধরতে, শিকার করতে কিংবা লংড্রাইভে যেতে। ভালোবাসতেন বিদেশি সেরা রহস্য উপন্যাস পড়তে। যার প্রকাশনী থেকে দেশের একমাত্র রহস্য পত্রিকা নিয়মিত বের হয়েছে। ৫০০-এর ওপরে বই বের হয়েছে তার। যার মধ্যে মাসুদ রানা, কুয়াশা, বিশ্বের সেরা রহস্যের গল্প, সেরা সাহিত্যের অনুবাদ, আত্মরক্ষা কৌশল উল্লেখযোগ্য। এত ধরনের বইয়ের সঙ্গে যিনি যুক্ত তিনি সেইভাবে বড় কোনো প্রচারমাধ্যমে আসেননি। তিনি বহু বইয়ে নির্দি্বধায় স্বীকার করেছেন, বিদেশি গল্পের বই থেকে এ বইটি রচিত। মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই বের হয় ১৯৬৬ সালে। বইয়ের নাম ধ্বংস পাহাড়। খুব সম্ভবত বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম পেপারব্যাক বই। ততদিনে সেগুনবাগিচা প্রকাশনী হয়ে গেছে সেবা প্রকাশনী আর বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে মাসুদ রানা চরিত্রের মধ্যে এত নতুনত্ব যে, পাঠক এখন পর্যন্ত মাসুদ রানা চরিত্রের সেই রহস্যের স্বাদ পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পাঠকের কাছে মাসুদ রানা বা সেবা প্রকাশনীর বইগুলো এত জনপ্রিয়- এক সময় বইগুলো ঢাকা শহরে তথা সমগ্র বাংলাদেশে পাঠকদের জন্য শুধু যে বিক্রি হতো তাই নয়, পাঠকদের কাছে সেই বই ভাড়াও দেওয়া হতো। তখনকার বিভিন্ন বইয়ের স্টলে দুই টাকার বই ভাড়া পাওয়া যেত। প্রতিটা চার আনা। বাংলা বইয়ের ইতিহাসে এমন আগ্রহের আর কোনো উদাহরণ আছে কিনা জানা নেই। মাসুদ রানার প্রথম বইটাতেই ছিল মাসুদ রানার দেশপ্রেম। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে বাংলাদেশের একটি বাঙালি চরিত্রে এই দেশপ্রেমী যে কাজগুলো করেছে সেই সাহসিকতার গল্প পড়লে যে কোনো বাঙালি পাঠক বিস্মিত হবে। তাকে শিহরিত করবে। ১৯৭১ সালে বহু যুবক-কিশোর বলেছে, রণাঙ্গনে বিপদের সময় তারা ভেবেছে, এ ক্ষেত্রে মাসুদ রানা হলে তারা কী করত! সেটা ভেবে অনেক বিপদ থেকে তারা রক্ষা পেয়েছে। কাজী আনোয়ার হোসেন একজন পেশাদার লেখক। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে নিজের কাজটা ভালোমতো জানে তার পিঠ কখনও দেয়ালে ঠেকে না। সে ঠিকই পথ বের করে দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন, জীবনযুদ্ধে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। আফজাল হোসেনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান আপন প্রিয়তে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। আমি আফজাল হোসেনকে অনুরোধ করব ভবিষ্যতে সেই স্মৃতি নিয়ে বড় কোনো লেখা লিখতে।
কাজী আনোয়ার হোসেন মাসুদ রানা বা কুয়াশা সিরিজের স্রষ্টা হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন। কিন্তু তিনি যদি এই চরিত্রের স্রষ্টা না হতেন তবুও সংগীতশিল্পী হিসেবে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারতেন। 'তালাশ' ছবির সেই বিখ্যাত গান 'রিকশাঅলা বেচারা' গানটির গায়ক ছিলেন তিনি। তার বাবা ছিলেন জ্ঞানতাপস ড. কাজী মোতাহার হোসেন। কাজী আনোয়ার হোসেন গত অক্টোবর থেকে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। কিন্তু সেইভাবে প্রচারমাধ্যমে এই তথ্যগুলো তেমন গুরুত্বের সঙ্গে আসেনি। কাজী আনোয়ার হোসেন তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পাননি। তার জীবনে পুরস্কারের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে ১৯৭৪ সালে বাচসাস পুরস্কার, পরবর্তী পর্যায়ে জহির রায়হান স্মৃতি পুরস্কার। তবে মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের জীবনে সবচেয়ে বড় পুরস্কার কিশোর-যুবকদের মনে সাহস তৈরির পুরস্কার। এই সাহসী যুবকরাই একদিন বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিয়ে আসতে থাকবে আরও গর্বের অনেক কিছু। তিনি একবার লিখেছিলেন, 'প্রায় সবার বাসায় একটা ছুরি থাকে। সেই ছুরি দিয়ে কে রুটি কাটবে, কে মানুষ মারবে সেটা তার সিদ্ধান্ত। আমি পাঠকদের কাছে মাসুদ রানা বা কুয়াশার মতো চরিত্র উপহার দিচ্ছি। সেই চরিত্রের কোন দিকগুলো পাঠক গ্রহণ করবে সেটা একান্তই তার ব্যাপার।'
রহস্যময় মানুষটি ভালোবাসতেন ছবি তুলতে। বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বহু ছবি তিনি তুলেছেন। গত কয়েক দিন ধরে ভাবছিলাম, তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করব- তিনি জীবনের প্রথম দিককার বইগুলো কেন বিদ্যুৎ মিত্র বা শামসুদ্দিন নওয়াব নামে লিখতেন? প্রশ্নটা আর কোনোদিন করা হবে না। মাসুদ রানার রহস্যের মতো জগতের ভেতর রহস্যই থেকে গেল প্রশ্নটা।
ফরিদুর রেজা সাগর :লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব