সম্প্রতি আমেরিকার গণতন্ত্র সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে চীন একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা দাবি করছে, চীনও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। তাদের মতো করে নানা যুক্তি দিয়ে তারা বলছে, তাদের গণতন্ত্রের একটা বিশেষ ভার্সন আছে। সেটা হলো 'যে গণতন্ত্র কাজ করে'। আমাদের এই অঞ্চলে আমরা দেখেছি মৌলিক গণতন্ত্র, উন্নয়নের গণতন্ত্র ইত্যাদি নাম নিয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। এতে এটাই প্রমাণিত হয়, গণতন্ত্রের একটা সার্বজনীন প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে আছে।
কথাটা মনে পড়ল বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ঘটনা প্রবাহে। এক সময় দেশে সংসদ নির্বাচনের মান যেমনই থাকুক না কেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো মোটাদাগে ভালো হতো। কিছুদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বাগেরহাটের প্রায় সব ইউনিয়নে যখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হচ্ছিল, তখন নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য হওয়া একজন প্রার্থী বিবিসি বাংলাকে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এমনকি এরশাদ সরকারের সময়েও তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটা ভালোভাবে করতে পারতেন।
দেশের সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন উৎসবের আমেজ এনে দিত বহুকাল থেকে। যেহেতু এই নির্বাচনের ফল যেটাই হোক না কেন, সেটা রাষ্ট্রের ক্ষমতার মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন ঘটায় না, তাই ক্ষমতাসীন সরকারের প্রার্থীরা এই নির্বাচনগুলোতে হেরে গেলেও সেটাকে নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতেন না তারা। বরং এই নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করার মাধ্যমে তাতে নিজেদের অনেক প্রার্থী পরাজিত হতে দিয়ে সমাজে তারা এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করতেন- দেশে গণতন্ত্র আছে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সময়ে এই চর্চার খুব বড় ধরনের ব্যত্যয় তৈরি হয়েছে। একটির পর একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগের চেয়ে ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা, সেটা না পারলে নিজেদের মধ্যে মারামারি-খুনোখুনি করে, ভোটারদের হুমকি দিয়ে যে কোনো মূল্যে জেতার মরিয়া চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে মন্ত্রীর অধীনে দেশের স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব, সেই মন্ত্রীর এলাকায় গত তিন বছরে লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, লাকসাম পৌরসভা নির্বাচন, লাকসাম উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে কোনো ভোট হয়নি। আর এবার দুই উপজেলার প্রায় সব ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান এবং প্রায় সব মেম্বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
ইউপি নির্বাচনের প্রথম দুটি ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং নির্বাচন মিলিয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থী বেশি জিতেছিলেন। কিন্তু সেই প্রবণতা পাল্টাতে থাকে এর পরের ধাপগুলোতে। ক্রমান্বয়ে নৌকার জেতার সংখ্যায় ভাটার টান শুরু হয় এবং বেশি সংখ্যায় জিততে থাকেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যা শেষের দিকে এসে প্রায় সমান হয়ে যায়।
নৌকার পরাজয়ের চেয়ে বড় বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক ইউনিয়ন পরিষদে নৌকার যাচ্ছেতাই ফলাফল। অনেক নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীরা হেরে দ্বিতীয়ও হননি; হয়েছেন তৃতীয় বা চতুর্থ। আমাদের অনেককে অবাক করে দিয়ে অনেক স্থানে তারা জামানত হারিয়েছেন। না; বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। বেশ কয়েকটি ইউপিতে নৌকা মার্কা ৪০-৫০ থেকে শুরু করে শখানেক ভোট পেয়েছে।
এই নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছিল, যদিও বিএনপির কিছু মানুষ স্বতন্ত্র হিসেবে অংশ নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ জিতেছেনও। তবে নৌকাকে হারানো স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের 'বিদ্রোহী প্রার্থী'। তাই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের পরাজয় হলেও তাতে জিতেছে আওয়ামী লীগের লোকই।
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় 'নৌকাডুবি' একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের সামনে এনেছে। বর্তমান সরকারের অধীনে যেহেতু জাতীয় থেকে শুরু করে স্থানীয় সব নির্বাচনে 'নৌকা মানেই জয়' প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তাই নৌকা মার্কা পেতে মরিয়া সবাই। নৌকা মার্কার মনোনয়ন বাণিজ্য প্রায় 'ওপেন সিক্রেট'। ইউপি নির্বাচনের ফল প্রমাণ করেছে, এই লেনদেন কত উৎকট পর্যায়ে গেছে। জামানত হারানো কিংবা ৪০-৫০ ভোট পাওয়ার মতো জনসংযোগের ভিত্তিহীন মানুষের কাছে মনোনয়ন কত অবিশ্বাস্য অঙ্কে বিক্রি হয়েছে, সেটা বুঝতে পেরে রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না।
যে কোনো মূল্যে নৌকাকে জেতানোর জন্য নানা রকম অন্যায় পদক্ষেপ নেওয়া; তারপরও জয় নিশ্চিত করতে না পারা এই মার্কাটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে কিনা- এ আলোচনা এখন সরকারি দলের মধ্যে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘদিন ধরে বলে যাচ্ছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকমুক্ত হওয়া উচিত।
দলীয় প্রতীকমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে স্থানীয় পর্যায়ে হানাহানি এবং ভোটে অনিয়ম করার প্রবণতা কমবে- এ ধারণায় আস্থা রাখা কঠিন। দলীয় প্রতীক না থাকলে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়তো কমবে বেশ খানিকটা। তার পরও স্থানীয় এমপি বা প্রভাবশালী কোনো নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হতে হলেও যথেষ্ট টাকার লেনদেন হবে। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মারামারি-খুনোখুনিসহ যাবতীয় অনিয়মের মাধ্যমে যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে জেতার প্রবণতা কমবে না মোটেও।
ক্ষমতাসীন দলের কোনো পদে কিংবা কোনো পর্যায়ে যে কোনোভাবে 'নির্বাচিত' সিল লাগানো গেলে সেই ব্যক্তি আক্ষরিক অর্থেই আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে যান। অসীম ক্ষমতা-প্রতিপত্তি এবং অকল্পনীয় পরিমাণ উপার্জনের নিশ্চয়তা থাকে তাতে। এই ক্ষমতা এবং উপার্জন যায় এমন মানুষদের হাতে; মোটাদাগে যাদের পক্ষে এই সমাজে তাদের শিক্ষা বা দক্ষতার বিনিময়ে মোটামুটি মানের একটা চাকরি জোটানোও সম্ভব না।
খেলায় স্টেইক বড় হবে সেই খেলা তত বেশি মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। যে কোনোভাবে যে কোনো মূল্যে সবাই জিততে চায়। ক্ষমতাসীন দলের হয়ে এই খেলায় জেতা-হারার স্টেইক ভীষণ বড় এখনই। সামনের দিনগুলোতে এটা আরও বড় হবে- নিশ্চিত।
তাই ভবিষ্যতে আরও অনেক তুচ্ছ কারণে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়বে; হবে হানাহানি, খুনোখুনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান :শিক্ষক, নাগরিক অধিকারকর্মী