নোবেলবিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের পঠন-পাঠন বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রতি প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস। রেবেকা ক্লার্কের নেওয়া এই সাক্ষাৎকার ভাষান্তর করেছেন শেখ রোকন
রাতের বেলা আপনার শয্যার পাশের শেল্কেম্ফ কী ধরনের বই থাকে?
শয্যার পাশে বইয়ের স্তূপ রাখা আমার কাছে ভীতিকর রকমের অগোছালো বিষয় মনে হয়। তবে যে কিছু বই থাকে, তার মধ্যে কিছু বাংলা কবিতা। তবে সেগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের সুবিখ্যাত নির্বাচিত কবিতা নয়। বিভিন্ন স্থান ও সময়ের ইতিহাসের ওপর কিছু বইও থাকে। সেগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক বই হতে পারে তৃতীয় শতকের ভারতীয় লেখক শূদ্রক রচিত বৈপ্লবিক নাটিকাগ্রন্থ 'মৃচ্ছকটিক'। ইংরেজিতে এর অনুবাদ করা হয়েছে- 'দ্য লিটল ক্লে কার্ট'। এক স্বৈরশাসককে নিয়ে নাড়িয়ে দেওয়া গল্প। তিনি শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং আরও বেশি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়। এই বইয়ে ন্যায্যতার আরও কিছু বৈপ্লবিক নতুন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে; যা আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। আমার নতুন স্মৃতিকথায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
সর্বশেষ কোন মহৎ গ্রন্থটি আপনি পড়েছেন?
বইয়ের মহত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত রায় দেওয়ার ব্যাপারে আমি দ্বিধান্বিত থাকি। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত সিলভানা টমাসেলি রচিত ম্যারি উলস্টোনক্রাফটের জীবনী গ্রন্থটি (উলস্টোনক্রাফট : ফিলোসফি, প্যাশন, অ্যান্ড পলিটিকস) এতটাই দারুণভাবে উপস্থাপিত যে, এটাকে মহৎ গ্রন্থ না বলতে পারা খুবই কঠিন।
আপনি যাদের লেখালেখি বিশেষভাবে প্রশংসা করেন, তাদের মধ্যে অর্থনীতিবিদদের কেউ আছেন?
সানন্দে বলি, অনেকে আছেন। আমি জানি না কাকে দিয়ে শুরু করব আর কাকে দিয়ে শেষ করব। কিন্তু যেহেতু আমার স্মৃতিকথায় অ্যাডাম স্মিথের প্রভাবের কথা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং যেহেতু আমি যুক্তি দেখিয়েছি যে, তাকে সাধারণত যেভাবে তুলে ধরা হয় তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত; তার নাম এখানে বলতেই হবে। বিশেষভাবে তিনি যে ব্যতিক্রমীভাবে দারিদ্র্যবান্ধব অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, সেদিকে আমাদের আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
আপনি যদি মার্কিন প্রেসিডেন্টের পড়ার জন্য কোনো বই নির্দেশ করতে পারতেন, তাহলে সেটা কোন বই?
এক-বই-পড়া প্রেসিডেন্ট আমার পছন্দের ব্যক্তি হতেন না। কিন্তু যদি প্রেসিডেন্টের জন্য একটিমাত্র বই বাছাই করতে আমাকে বাধ্য করা হতো, তাহলে 'কিং লিয়ার' গ্রন্থটি ফেলে রাখা আমার জন্য কঠিন হতো। এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় আমি এখানে যাচ্ছি না। শুধু বলি, সহানুভূতি ও সংহতি এমন দুটি গুণ; যা প্রেসিডেন্টের মতো ব্যক্তির জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।
কোনো বই কি আপনাকে অন্য কোনো ব্যক্তির কাছাকাছি নিয়ে গেছে? বা কোনো বই কি কারও সঙ্গে নৈকট্যের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে?
ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে জাতপাতের পার্থক্যের প্রকট চর্চার বিপর্যয়কর প্রভাব নিয়ে সুরাজ ইয়েংরে রচিত সাম্প্রতিক বইটি (কাস্ট ম্যাটারস) আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছে যে, এ ধরনের বৈষম্য কতটা ক্ষতিকর। পাশাপাশি বইটি আমার মধ্যে দলিতদের আরও কাছাকাছি যাওয়ার তাড়না তৈরি করেছে, যাদেরকে সাম্প্রতিক সময়েও অচ্ছুতের মতো নিম্ন জাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বইটি তাদেরকে প্রশ্ন করার মানসিক শক্তি দিয়েছে; যারা অনেক আগে থেকে এবং এখনও অসমতার রাজনীতির সুবিধা ভোগ করে আসছে।
এখন সক্রিয় লেখকদের মধ্যে- ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সমালোচক, সাংবাদিক, কবি- কে আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রশংসাযোগ্য?
যারা খুব সাহসী, এই প্রশ্ন তাদের জন্য। তুখোড় লেখকদের একজনকে আরেকজনের সঙ্গে কি আসলেই আমরা তুলনা করতে পারি? আরও কঠিন বিষয়, সাহিত্যের ভিন্ন ভিন্ন শাখায় বিশেষত্ব অর্জনকারী লেখকদের মধ্যে কি তুলনা টানা সম্ভব? আমি এ ধরনের প্রশ্নের জবাব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিতে পারি না। কিন্তু নিজেকে সাহসী দেখানোর মজা বন্ধ করতে হলে সম্ভবত এ ধরনের প্রশ্নের জবাব দেওয়া যেতে পারে। যেহেতু যখনই সম্ভব হতো, আইরিশ কবি সিমাস হ্যানির সঙ্গ (তার কবিতার প্রতি ভালোবাসার কথা বলছি না) আমি দারুণ পছন্দ করতাম, তার প্রশংসা আমি প্রায়শই করতাম। তিনি, হায়, মারা গেছেন ২০১৩ সালে। কিন্তু মৃত্যুর আট বছর পরও তিনি এখনও দারুণভাবে সাম্প্রতিক রয়ে গেছেন।
সাহিত্যের কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে?
আমার মনে হয় না যে, সাহিত্যের অভিন্ন কোনো বিষয় রয়েছে- যা সব ক্ষেত্রে আমাকে সমান স্পর্শ করবে। বরং একটি গ্রন্থ যেভাবে রচিত হয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক ধারণার বিস্তৃতি ঘটায়, সেটাই আমাকে স্পর্শ করে। যেভাবেই দেখি না কেন- শেকসপিয়ারের হ্যামলেট ও সনেট, গ্যোটের ফাউস্ট, পঞ্চম শতকের সংস্কৃত কবি ও নাট্যকার কালিদাসের মেঘদূত- এই সবগুলোকে আমাদের এক কক্ষে জায়গা দিতে হবে। কালিদাসের রচনায় উঠে আসা স্মৃতিকথা ই. এম. ফস্টারকে দীর্ঘ রেলভ্রমণের মাধ্যমে উজ্জয়নীতে নিয়ে গিয়েছিল। কালিদাস ওই শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ফস্টার তার 'অ্যাবিঙ্গার হারভেস্ট'-এ লিখেছেন, তিনি কালিদাসের প্রিয় নদী শিপ্রায় একটি ডুবও দিয়েছিলেন। মুগ্ধতা থেকে কালিদাসের অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে আনার জন্য ফস্টার এ-ও দেখতে চেয়েছিলেন যে, নদী থেকে ওঠার পর রেলস্টেশনে আসার সময়ের মধ্যে তার ভেজা কাপড়চোপড় শুকায় কিনা।
আপনি কোন ধরনের বই পছন্দ করেন? আপনার আবেগ, না বুদ্ধিবৃত্তি স্পর্শকারী বই?
এই পার্থক্য করা খুবই কঠিন। কিন্তু আমি মনে করি না যে, কোনো একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে নিয়ে আমি তৃপ্ত হব। যদি আমাকে বাধ্য করা হয়, তাহলে আমি হয়তো বুদ্ধিবৃত্তির দিকেই সায় দেব। যদিও আমি প্রত্যাশা করব যে, বুদ্ধিবৃত্তির সেই জগতে আবেগের কিছু আকর্ষণও অনুপ্রবেশ করবে।
আপনার কোন প্রিয় বইটি সম্পর্কে আর কেউ জানে না?
এটি আসলেই কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু আমি উত্তরের চেষ্টা করতে চাই। কয়েক বছর আগে প্রিঙ্কটোন থেকে প্রকাশিত একটি বই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। এর শিরোনাম- 'আ লোকাল হিস্ট্রি অব গ্লোবাল ক্যাপিটাল : জুট অ্যান্ড পিজেন্ট লাইফ ইন দ্য বেঙ্গল ডেল্টা'। এটা গুরুতরভাবে অপরিচিত কিন্তু দারুণভাবে কৌতূহলোদ্দীপক বই। একই সঙ্গে খুবই সহজপাঠ্য। দারুণ মেধাবী একজন বাংলাদেশি এই বইয়ের লেখক, নাম তারিক ওমর আলী। এই বইটি পড়ার জন্য আমি জোরের সঙ্গে সুপারিশ করি।
অর্থনীতিবিদ হিসেবে আপনার কাজ কল্যাণমূলক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণায় নিবদ্ধ। এই ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকের জন্য আপনি কোন লেখকদের নাম বলবেন?
এই বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টিমূলক লেখা লিখেছেন, এমন অনেক লেখক রয়েছেন। ১৮ শতকের ফরাসি দার্শনিক মার্কুইস ডি কনডোরসে থেকে আমাদের সময়ের মার্কিন অর্থনীতিবিদ কেনেথ অ্যারো। কিন্তু এ ব্যাপারে আরেকভাবেও দেখা যায়। এটা খারাপ ধারণা নয় যে, প্রথমে আপনি কোনো গুরুতর বিষয়বস্তু নির্বাচন করলেন এবং তার ওপর ভালো ভালো লেখকের খোঁজ করলেন। যেমন গৃহহীনতার ভয়াবহ সংকট নিয়ে পড়ার জন্য খুবই ভালো হবে ম্যাথু ডেসমন্ডের সিদ্ধান্তমূলক গ্রন্থ 'এভিকটেড'।
শৈশবে আপনি কেমন পাঠক ছিলেন? শৈশবে পড়া কোন বই বা লেখক সবচেয়ে বেশি সময় ধরে আপনাকে আচ্ছন্ন রেখেছিল?
আমি নিজেকে আখ্যা দেব নির্বিচার পাঠক হিসেবে। বিশেষত আমি যখন তরুণ ছিলাম, তখন পর্যন্ত গোগ্রাসে সবকিছু পড়তাম। যত বেড়ে উঠতে থাকলাম, ততই আমার পাঠ আগ্রহ বিশেষায়িত হতে থাকল। বিশেষত নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে। যে কোনো একটি বিষয়ে নিজেকে 'ছোটখাটো বিশেষজ্ঞ' হিসেবে দেখানোর জন্য আমি ওই বিষয়ের সব বই পড়ে ফেলতাম। যেমন একটি বিষয় ছিল, আড়াই শতাব্দী আগের কলকাতা এলাকায় জনবসতি। কখনও কখনও হয়তো আমি দুয়েকটি বিষয় শিখতাম এবং সবাইকে বলে বলে বিরক্ত করে ছাড়তাম যে আমি আসলে কী শিখেছি। কিন্তু সেই বইগুলোর কথা আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, যেগুলো ছিল সুখপাঠ্য- অনেক সময় খুবই হাস্যরসাত্মক। যেমন সুকুমার রায়ের হাসির গল্প ও কবিতাগুলো। শৈশবে বই পড়ার ক্ষেত্রে আমার মূল লক্ষ্য ছিল আনন্দিত হওয়া।
আপনি বই গোছান কীভাবে?
আমার আশঙ্কা, এই প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত আমি বই গোছাই না। অথবা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, বই গোছানোর ক্ষেত্রে আমি সফল হতে পারি না। অবশ্যই আমি চেষ্টা চালাই, অনেক সময় কঠিন প্রচেষ্টা- যতক্ষণ ধৈর্য কুলায়। হয়তো চিনুয়া আচেবে থেকে উদ্ৃব্দতি দিতে যাব, খুঁজতে গিয়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ফলাফল ভয়াবহ। নিজেকে উন্মাদ মনে হয়, যখন জর্জ বার্নার্ড শ' রচিত 'ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান' বইটি হাতের কাছে পাই না। অথচ আমি ভালোভাবেই জানি যে, বইটির একটি কপি আমার কাছে আছে। কখনও কখনও অবশ্য অপ্রত্যাশিত আনন্দের ঘটনাও ঘটে। যেমন হয়তো প্রবল নিরুৎসাহ নিয়ে একটি উপন্যাস খুঁজে চলছি, যেটা আমাকে 'অবশ্য পাঠ্য' হিসেবে কেউ বলেছে। সেটা খুঁজতে গিয়ে পুরোনো প্রিয় আরেকটি বইয়ের ভেতর ঢুকে যাই কিছু সময়ের জন্য। যেমন এরিক মারিয়া রেমার্কের 'থ্রি কমরেডস'। তখন আমার স্বভাবকে, যা অগোছালো নামে খ্যাত, ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যায় না।
কোন 'জেনরে' বা একক ধরনের বই পড়া আপনি বিশেষভাবে উপভোগ করেন? আর কোন একক ধরন এড়িয়ে যান?
আমাদের আসলে এককের বদলে বিভিন্ন ধরনের বই পড়া উচিত। যেমন আমি গোয়েন্দা গল্প পড়তে পছন্দ করি। কিন্তু নিরন্তর গোয়েন্দা গল্প পড়ে যাওয়া, মাঝখানে আর কিছু নয়, একপর্যায়ে গিয়ে অসহনীয় হয়ে পড়বে। যদিও কেউ যখন খানিকটা নিস্তেজ, তখন আগাথা ক্রিস্টির দুই-একটি বই টানা পড়ে যাওয়া চাঙ্গা করে তুলতে পারে।