ধর্ষণের মতো অপরাধ দিনে দিনে এতই বেড়েছে, এটি এখন নীরব অতিমারিতে পরিণত হয়েছে। দলবদ্ধ ধর্ষণের লাগামহীনতা এতই নিষ্ঠুর যে, কক্সবাজারের ঘটনার পরই খাগড়াছড়ির এক বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে প্রতিবন্ধী মেয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকারে পরিণত হয়। এর প্রধানতম কারণ, ধর্ষণের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা।

নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নথিভুক্ত তথ্যে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ঢাকায় ৯৭ শতাংশ মামলায় কোনো সাজা মেলেনি, ৪১ শতাংশ বিচারের আগেই অব্যাহতি পায়, ৫৫ শতাংশ পায় বেকসুর খালাস। কিন্তু যারা মামলার আওতায় আসতে পারে না বা আসে না তার তো কোনো হিসাবই নেই। মামলা কেন হয় না- এ বিষয়ে সমাজতাত্ত্বিক অ্যান্থনি গিডেন্স (২০০৬) উল্লেখ করেন, ব্রিটেনের অধিকাংশ অপরাধ মামলাতেই আসে না; কারণ ৫০ শতাংশের বেশি ভিকটিম যৌন নিপীড়নের মতো বিষয়গুলোকে গোপন রাখতে চায় নিজেদের প্রাইভেসির জন্য আর পুলিশের হেনস্তা থেকে রক্ষার তাগিদে। আসলেই যত নারী ধর্ষিত হয় তাদের অধিকাংশ পুলিশের কাছে মামলা দিতে চায় না এই ভয়ে যে, তারা মেডিকেল পরীক্ষায়, পুলিশি তদন্তে এবং কোর্টে জনসমক্ষে জেরার মধ্য দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে পারে। এর মানে নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিচার ব্যবস্থা পাশ্চাত্য সমাজেও অনেক নাজুক অবস্থায় আছে।

বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ। কেননা, আমাদের সমাজ কাঠামোতে কোনো মেয়ে কোনোভাবে নিপীড়িত হলে, তা যদি কেউ জানতে পারে তাহলে সেই মেয়ের বিয়ে হওয়া জটিল হয়ে পড়ে। সে কারণে ভিকটিমের পরিবারই পুলিশ ও মামলা এড়িয়ে চলতে চায়। যদিও অল্পসংখ্যক ঘটনা মামলাতে গড়ায়, তবে মামলায় আসামিপক্ষ এক অদৃশ্য ইশারায় শক্তি পায় অথচ ভিকটিম মামলার পরে আরও ভিকটিম হয়ে পড়ে। কারণ ভিকটিম মামলার খরচ চালাতে গিয়ে সর্বস্ব হারায়। যেসব ভিকটিম বিচারের চক্রে ঢুকে পড়েছে তাদের অনেকেই এমনভাবে অপদস্থ হয়, শেষ পর্যন্ত তারা 'বিচার' থেকে পালাতে চায়। উন্মুক্ত এজলাসে ভিকটিমকে এমনভাবে জেরা করা হয়, তাতে তাকে বিব্রত হতে হয়। অধিকাংশ ধর্ষণের চাক্ষুষ সাক্ষী হাজির করা সম্ভব হয় না। বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার ঘটনায় অনেকে মামলা করতে উৎসাহ হারান। অনেক সময় বিচারের রায় পেতে কেটে যায় ৭-৮ বছর, কারও ক্ষেত্রে এক যুগ। এই দীর্ঘসূত্রতা ভিকটিমকে আরও ভিকটিম করে। বিচার যত বিলম্বিত হয় ভিকটিম তত সামাজিকভাবে হেনস্তা ও কটাক্ষের মধ্যে বাস করে।

শুধু তাই নয়, বিচারের জন্য প্রার্থীকে এখনও সেই ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন ও ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কয়েকটি ধারার ওপরে নির্ভর করতে হয়। আইনের এই ধারাগুলোর কোনো কোনো অংশে একই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া ধর্ষণ আর গণধর্ষণ- এই দুই ধরনের অপরাধকে ভিন্ন মানদণ্ডে আনা হয়নি। এই সুযোগে নারী ও শিশুদের ধর্ষণবিষয়ক বিচার প্রক্রিয়া গেঁথে যাচ্ছে দীর্ঘসূত্রতায়। এ দীর্ঘসূত্রতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে।

এ অবস্থায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিত করতে বিচার ব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোয় সংস্কার সময়ের দাবি। ভিকটিমদের মামলা চালানোর খরচ চালাতে সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা ফান্ড গঠন করাও প্রয়োজন। আইনি বিধিমালায় সংস্কার আনতে রিভিউ কমিটি গঠন করারও প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সামাজিক প্রথাগুলোর সংস্কার আর বিচার ব্যবস্থার মান উন্নয়নের মাধ্যমে নির্মিত হোক নারীবান্ধব সুষম সমাজ।

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়