বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য রোহিঙ্গারা হুমকি- এমন ভাবনার উদ্রেক করতে পারে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত 'আরসাপ্রধানের ভাইয়ের হাতে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র' বিষয়ক সংবাদটি। ১৬ জানুয়ারি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আরসার প্রধান আতাউল্লাহ আবু জুনুনীর ভাই শাহ আলীকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র। এবারই প্রথম নয়; এর আগেও রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টি অনেকবার গণমাধ্যমে এসেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তিতে দুর্নীতি এবং অনিয়ম হয়- এমন অভিযোগ নতুন নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির একটি প্রক্রিয়া আছে। আমরা জানি, তথ্য সংগ্রহ; ফরম পুনঃযাচাইকরণ, নিবন্ধন কেন্দ্রে তথ্য সংগ্রহ ও পরিচিতি যাচাই, প্রতিবন্ধী, জেলখানার ভোটার, বাদ পড়া ভোটার ও অসুস্থদের নিবন্ধন, তথ্য উপজেলা সার্ভারে প্রক্রিয়াজাতকরণ- এই পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করার পর জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়ন ও প্রদান করা হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী শাহ আলীর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করে পরিচয়পত্রটি দেওয়া হয়েছে- এই ধারণা পোষণ করা যেতেই পারে। তাতে প্রতীয়মান, অনিয়মের পাশাপাশি দুর্নীতি হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম এবং দুর্নীতি বন্ধ না হলে শুধু রোহিঙ্গা নয়, অন্য দেশের নাগরিক যে কোনো ব্যক্তির হাতেও যেতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ভিনদেশি কেউ অবৈধ উপায়ে জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছে কিনা, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খতিয়ে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের নাগরিক সুবিধা লাভের অধিকার এবং এর অপব্যবহারের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয়। যিনি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পাবেন, তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত আইনের চোখে সমতা, ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য, সরকারি নিয়োগ লাভে সমতা, আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা লাভের অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার, সম্পত্তির অধিকারসহ প্রায় ১৮টি মৌলিক অধিকারপ্রাপ্ত হবেন। বাংলাদেশের শ্রমবাজার বিশ্বে সমাদৃত। অবৈধভাবে রোহিঙ্গা যারা জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে, তারাও চাইবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে এবং অভিযোগ আছে, ইতোমধ্যে করেছেও। আরসার নেতার যে ভাইয়ের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে, তিনি হয়তো পাসপোর্ট করতে পারতেন। তিনি যদি অন্য কোনো দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতেন, প্রাথমিকভাবে এই দায়ভার এসে পড়ত বাংলাদেশের ওপর।

বাংলাদেশের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়, প্রায় সাড়ে চার বছর অতিবাহিত হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নানাবিধ চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও মিয়ানমারের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, চীন-ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা না রাখা, বার্মার নাগরিকত্ব আইন, প্রত্যাবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়াসহ নানাবিধ জটিলতার কারণে আটকে আছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ১৯ দফা সংবলিত একটা সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য তালিকা প্রণয়ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এই তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রমাণস্বরূপ এলাকাভিত্তিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ৮০০০ রোহিঙ্গার একটি তালিকা হস্তান্তর করা হয়। তার পরও মিয়ানমার সরকার একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। যদি কোনো রোহিঙ্গা যে কোনো উপায়ে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নিতে পারে, তাহলে মিয়ানমারের পরিবর্তে বাংলাদেশের নাগরিকের তালিকায় যুক্ত হবে তার নাম। জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও তাদের মিয়ানমারের নাগরিক বলাটা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। কতসংখ্যক রোহিঙ্গার হাতে আছে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র, তা অনুসন্ধানের জন্য উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল গঠন করে দ্রুততার সঙ্গে খুঁজে বের করে সংশ্নিষ্ট মহলের জবাবদিহির পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র হাতের মোয়া নয়।

জি এম আরিফুজ্জামান: রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
gmarif.cgs@du.ac.bd