গুম হওয়া মানুষদের স্বজনদের আর্তনাদ কে শোনে? 'কীসের পুলিশ? আমি থানায় গেছি, পুলিশ আমাকে থানা থেকে বের করে দিয়েছে। পুলিশের ডিসি আমার চিঠিটা একবার পড়ল না। বলে, র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ; আপনি র‌্যাবের কাছে যান। পুলিশ এখন তিন বছর পর এসে জিজ্ঞেস করে, আমার স্বামী আসলে গুম হয়েছে, নাকি কোথাও চলে গেছে? আমাদের কষ্ট লাগে, ঘেন্না আসে এখন।'

কথাগুলো বলছিলেন গুম হওয়া ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী নাসিমা আক্তার। গুম হওয়া পরিবারগুলোর সংগঠন 'মায়ের ডাক' ১৫ জানুয়ারি প্রেস ক্লাবে সমবেত হয়ে জানায়, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের বাসায় গিয়ে তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে পুলিশ। বাসায় বাসায় গিয়ে জেরা করা, থানায় ডেকে পাঠানো, পুলিশের লিখিত বিবৃতিতে সইয়ের চাপ; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সাদা কাগজে সই নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা। ৮-১০ বছর আগে যেসব মানুষ গুম হয়েছেন, যাদের পরিবার বারবার সন্ধান করেও এটুকু জানতে পারেনি তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে, যে পরিবারগুলোর সন্তানরা বড় হয়েছে 'বাবা' ডাকটির সঙ্গে পরিচিত না হয়েই। যে পরিবারগুলো দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে প্রতিবার ভাবে, হারানো স্বজন ফিরে এলো বুঝি; সেই পরিবারগুলোর ওপর নতুন করে নেমে এসেছে এক নতুন ধারার নির্যাতন।

বাংলাদেশে গত এক দশকে যারা গুম হয়েছেন, তাদের কেউ কেউ ফিরে এলেও আসেননি অনেকে। যারা ফিরে এসেছেন, তারাও জানাননি, ঠিক কী হয়েছিল তাদের। কারা নিয়ে গিয়েছিল, কেন নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় রেখেছিল তাদের, কেমন আচরণ করা হয়েছিল তাদের সঙ্গে। এসব বিষয়ে কখনোই মুখ খোলেননি ফিরে আসা মানুষ। পরিবারের তরফ থেকেও বলা হয়নি কোনো কথা। বরং স্বজন ফিরে আসার স্বস্তিই মুখ্য হয়েছিল প্রতিটা ক্ষেত্রে। চাক্ষুষ সাক্ষী থাকার পরও জিডি করতে গিয়ে কখনোই বলা যায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা। কারণ একটাই- এ কথা বললে জিডি নেবে না পুলিশ। প্রায় সর্বক্ষেত্রে বছরের পর বছর পার হলেও জিডির কোনো তদন্ত হয়নি। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অধিকার কিংবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার বলা সত্ত্বেও কর্ণপাত করেনি সরকার।
অবশেষে সরকারের টনক নড়ল যখন নিষেধাজ্ঞা দিল মার্কিন প্রশাসন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে প্রতিষ্ঠান হিসেবে র‌্যাব এবং র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দপ্তর। এ নিষেধাজ্ঞার সহজ পরিণতি হলো, সেদেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া এবং সেদেশে কোনো সম্পদ থেকে থাকলে সেটা বাজেয়াপ্ত হওয়া। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য এ দফায় বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেবে না। বাংলাদেশ কী পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারত, সেটি নিয়ে বিশদ আলোচনায় না গিয়ে এটুকু বলাই যায়, পরে সরকার হুঁশে ফিরেছে। কারণ আমেরিকার দেওয়া নিষেধাজ্ঞা অলিখিতভাবে প্রযোজ্য হয়ে যায় কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে। এমনকি ইউরোপের অন্যান্য দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে বিবেচনায় নেয়।

এর পর সরকার নিচু স্বরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছে। প্রকাশ্যে বলেছে, যেসব ক্ষেত্রে আমেরিকার অসন্তোষ আছে, সেসব ক্ষেত্রে কাজ করবে সরকার। সংসদীয় কমিটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সরকারও ল ফার্ম এবং লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের কথা বলেছে। কিন্তু আমরা জানলাম, লবিস্ট নিয়োগ নতুন নয়, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজিআর, ফ্রিডল্যান্ডার গ্রুপ, কোনওয়াগোসহ বেশ কিছু লবিস্ট ফার্মকে দিয়ে সরকার লবিং করিয়ে যাচ্ছে। এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব ইস্যুতে এ নিষেধাজ্ঞা এসেছে, সেসব ইস্যুতেও বছরের পর বছর আমেরিকায় লবিং করিয়েছে সরকার। দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিপীড়ন করে সেটা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আবার তারই করের টাকায় লবিং ফার্ম পোষা হয়েছে। এর চেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা আর কী হতে পারে!

আমরা জানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, বিএনপির নিয়োগ করা লবিস্ট ফার্মের লবিংয়ের কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা। তর্কের খাতিরে যদি বিষয়টির সত্যতা স্বীকারও করি, তবু মনে রাখতে হবে, লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ কোনো বেআইনি বিষয় নয়। সচেতন মানুষ জানেন, আমেরিকায় লবিং বিষয়টি আমাদের দেশীয় তদ্বিরের মতো নয়। কোনো প্রভাবশালীকে টাকা ধরিয়ে দিয়ে সব অন্যায়-বেআইনি কাজ করিয়ে ফেলা যায় না। মিথ্যা তথ্য দিয়ে লবিংয়ে যে সফল হওয়া যায় না, তার প্রমাণ আওয়ামী লীগের লবিং ফার্ম তাদেরকে নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

এই নিষেধাজ্ঞা এক দিনে আসেনি। বেশ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে সতর্ক করেছে সরকারকে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তো আছেই। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কর্মীরা গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার মূল টার্গেট বলে তারা সব সময় সোচ্চার ছিল এসব বিষয় নিয়ে। কিন্তু কর্ণপাত করেনি সরকার। তারই ফল হয়েছে আজকের নিষেধাজ্ঞা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ তথ্যটি দিয়ে শেষ করছি। গত নভেম্বরে নিকারাগুয়ায় একটি চরম কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন হয়। এর ফলে দেশটির নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অনেকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা: সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক