কোন দেশের নির্বাচন কেমনতর হবে, তা নির্ভর করে সে দেশেরই সৃষ্ট নিয়মের ভিত্তিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন নির্বাচন হবে একেবারেই স্থায়ীভাবে নির্ধারিত সময়সূচিতে, তাতে নেই কোনো ভুলচুক। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনতা জনার্দনের সংখ্যাধিক ভোট পেয়েও হেরে যাওয়ার নজির আছে 'ইলেক্টোরাল কলেজ' ভোটের নির্ধারিত বাধা ডিঙাতে না পারায়। ফরাসি দেশে আবার সব প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেই জিতে যাবেন এমন কোনো কথা নেই, জেতার জন্য পেতে হবে সাকল্য ভোটারের অর্ধেকের বেশি ভোট। আর তাই দুইয়ের অধিক প্রার্থী থাকলে এবং কেউ মোট ভোটারের ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে শীর্ষ দু'জনের মধ্যে হয় দ্বিতীয় দফার ভোট। এমন নজির ভূরি ভূরি যে, প্রথম দফায় এগিয়ে থাকা প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় মোট ভোটারের অর্ধেকের সীমারেখা পেরোতে না পেরে হেরে গেছেন আর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রথম দফার পিছিয়ে থাকা প্রার্থী।

ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে ভোট দেন লোকসভা, রাজ্যসভা আর সারাদেশের সব বিধানসভার সদস্যরা। কিন্তু এক মাথা এক ভোট নয়। ভোটারপ্রতি ভোটের ভর আছে। সে ভর সদস্যভেদে আলাদা আলাদা। লোকসভা ও রাজ্যসভার প্রত্যেক সদস্যের ভোটের ভর ৭০৮। অন্যদিকে, একেক রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের ভোটের ভর একেক রকম। যেমন উত্তরপ্রদেশের একজন বিধানসভা সদস্যের (এমএলএ) ভোটের ভর ২০৮ আর সিকিমের একজন এমএলএর ভোটের ভর ৭। এভাবেই রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ণীত হয় একেক রাজ্যের এমএলএদের ভোটের ভর। লোকসভার ৫৪৩ জন ও রাজ্যসভার ২৩৩ জন নির্বাচিত সদস্যের সাকল্য ভোটের ভর ৫৪৯,৪০৮ এবং সারাদেশের সব বিধানসভার ৪১২০ জন সদস্যের ভোটের ভর ৫৪৯,৪৯৫। ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয় ৪৮৯৬ জন নির্বাচকের মাথা গুনতি ভোটের হিসাবে হয় না; হয় মোট ভর ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৯০৩-এর নিরিখে।

স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশেও এক অন্য ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা ছিল। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় নির্বাচিত সদস্যরা যারা পরিচিত ছিলেন মৌলিক গণতন্ত্রী সদস্য হিসেবে, তারাই নির্বাচক হিসেবে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পরিষদ সদস্য, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, বিভাগীয় পরিষদ সদস্য ও জেলা পরিষদ সদস্যদের এবং ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যানদের। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যানরাই পদাধিকারবলে হতেন থানা পরিষদের সদস্য। পদাধিকারবলে মহকুমা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক হতেন যথাক্রমে থানা পরিষদ ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সর্বজনীন ভোটে নির্বাচিত না হয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যান, সদস্য, মেয়র ও কমিশনারদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ধরন ও নির্বাচন প্রক্রিয়াও নানা দেশে নানা রকম। পাশের দেশ ভারতে শহরাঞ্চলে পৌরসভায় ও গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েতে সর্বসাধারণের ভোটে নির্বাচিত সদস্যরা পঞ্চায়েতপ্রধান ও পৌর মেয়র নির্বাচিত করেন, যা সম্পূর্ণ সংসদীয় ধরন। সংসদীয় ধরনে সব দেশেই সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত করেন প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একবার বলেছিলেন, আমাদের সরকার সংসদীয় পদ্ধতির আর স্থানীয় সরকার রাষ্ট্রপতি কাঠামো পদ্ধতির। তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকেও সংসদীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর করার ব্যাপারে অভিমত দিয়েছিলেন।


স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে চেয়ারম্যান বা মেয়রের সঙ্গে সদস্য বা কমিশনার বা কাউন্সিলরদের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। যিনি নিজেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র হওয়ার মতো উপযুক্ত মনে করেন, তিনি সদস্য বা কমিশনার বা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হন না। ফলে যিনি চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচিত হন, তিনি সদস্য বা কমিশনার বা কাউন্সিলরদের থেকে নিজেকে অনেক ওপরের স্তরের ভাবতে থাকেন। যা প্রকারান্তরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জন্ম দেয় একক কর্তৃত্ববাদিত্বের। এই প্রবণতা গণতন্ত্রায়নের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই কর্তৃত্ববাদিত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাতেই এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে অভূতপূর্ব হতাহতের নানা ঘটনা। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত ভূরি ভূরি স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রার্থী হচ্ছেন। এমনকি পিতাও দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে প্রার্থী হচ্ছেন পুত্রের বিপক্ষে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে আরেকটি তামাশা হয় নারীর প্রতি। যদিও সাধারণ আসনে একজন নারী প্রার্থী হতে পারেন এবং এ সংখ্যা খুবই কম- নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বিবেচনায় রেখে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রাখা হয়েছে। তিনটি সাধারণ আসন নিয়ে নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন। নির্বাচনী লড়াইয়ে সাধারণ আসনের একজন পুরুষ সদস্য বা কমিশনার বা কাউন্সিলর প্রার্থীকে যতটুকু এলাকায় নির্বাচনী প্রচার ও কর্মকাণ্ড চালাতে হয়, একজন সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীকে তার তিন গুণ বেশি এলাকায় জনসংযোগ ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। অথচ নির্বাচিত হওয়ার পরে সংরক্ষিত আসনে বিজয়ী বলে নারী হয়ে পড়েন অনেকটা দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিভুক্ত। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়েছে বলে মনে হয় না। আমদের দেশের জনঘনত্ব বিবেচনায় এনে নিজেদের মতো করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এমনভাবে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে বেশিসংখ্যক মানুষ প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, আবার প্রার্থিতার কারণে সংঘাতের হারও কমে আসে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে সরাসরি নির্বাচন বন্ধ করা হোক। বিদ্যমান প্রতিটি ওয়ার্ডে একযোগে তিনজন করে সদস্য বা কাউন্সিলর বা কমিশনার নির্বাচিত হবেন। একজন ভোটার ব্যালট পেপারে তিনজনকে ভোট দিতে পারবেন। যে তিনজনকে তারা ভোট দেবেন, সবাই পুরুষ হবেন না বা সবাই নারী হবেন না। কমপক্ষে একজন পুরুষ বা একজন নারীকে ভোট দিতে হবে। ফলাফল প্রকাশের সময় নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন, তিনি ওয়ার্ডের প্রথম আসনটি পাবেন। অবশিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত একজন পুরুষ ও একজন নারী নির্বাচিত হবেন। এর ফলে প্রতি ওয়ার্ড থেকে যে তিনজন নির্বাচিত হবেন, তাদের কমপক্ষে একজন পুরুষ বা একজন নারী থাকবেন। কোথাও কোথাও দু'জন পুরুষ ও একজন নারী, আবার কোথাও দু'জন নারী ও একজন পুরুষ নির্বাচিত হবেন। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নারী নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই নির্বাচিত নারীরা যেহেতু পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হবেন, তাই তাদের কেউ দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতে ঠেলে দিতে পারবেন না।

একইভাবে জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনও হতে পারে। একেক জেলা ও উপজেলার আয়তন ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলাকে কয়েকটি নির্বাচন এলাকায় বিভক্ত করা যেতে পারে। নির্বাচনী এলাকা হতে পারে সর্বনিম্ন ১০টি ও সর্বোচ্চ ২৫টি বা কিছু কমবেশিও হতে পারে। ওপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোট গ্রহণ হতে পারে।

সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেই ওয়ার্ড বা নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক প্রথম স্থান অধিকারী সদস্য বা কাউন্সিলর বা কমিশনারদের মধ্য থেকে সদস্য বা কাউন্সিলর বা কমিশনাররা সরাসরি ভোটে মেয়র বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ চার বা পাঁচ বছর হলেও মেয়র বা চেয়ারম্যানের পদের মেয়াদ হবে এক বছর। প্রতিবছর মেয়র বা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হবে এবং একজন মেয়র বা চেয়ারম্যান প্রত্যেক বছরই নির্বাচিত হতে পারবেন। একইভাবে যারা প্রথম আসনধারী নন, তাদের মধ্য থেকে একজন নারী ও একজন পুরুষ প্যানেল মেয়র বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারবেন।

চাইলে এই পদ্ধতিতেও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন সম্ভব। তবে এখন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে যেমন নাম ছাড়া কেবল প্রতীকের ওপর ভোট হয়, সে ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। ব্যালট পেপারে সব প্রার্থীর প্রতীকসহ নাম থাকবে। দলীয় প্রতীক হিসেবে গুচ্ছ প্রতীক থাকতে পারে। যেমন জলযানগুচ্ছ- নৌকা, স্টিমার, স্পিডবোট, খাদ্যশস্য শীষগুচ্ছ- ধানের শীষ, গমের শীষ, কাউন শীষ, কৃষি যন্ত্রগুচ্ছ, ফলগুচ্ছ, ফুলগুচ্ছ, প্রভৃতি ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রতীক বরাদ্দ থাকতে পারে।

অনুরূপভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করলে অধিক সংখ্যক মানুষ জনপ্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ লাভ করবেন। একই আসনে তিনজন নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকায় মনোনয়ন লাভের লড়াইয়ে সহিংসতা হ্রাস পাবে। মেয়র বা চেয়ারম্যানরা প্রাথমিকভাবে সদস্য বা কাউন্সিলর বা কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় এবং প্রতিবছর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার কারণে ওই পদাধিকারীদের ভেতর একক কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা জন্ম নেবে না। নূ্যনতম ২৭ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিষদ একটি স্থানীয় সংসদ হিসেবে কাজ করবে। সংসদীয় কায়দায় কর্মপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তগুলো অনুমোদিত হবে, যা গণতন্ত্র ও সামাজিক সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আশা করা যায়, এতে করে হ্রাস পাবে হানাহানি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে ফিরে আসতে পারে আনন্দমুখর পরিবেশ।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: সাবেক অতিরিক্ত সচিব