ঢাকায় চারদিকে ধূলিকণা ভাসছে কুয়াশার মতো- শনিবার সমকালের শীর্ষসহ একাধিক প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য প্রমাণে গবেষণাগারের ফলাফলের জন্য অপেক্ষার অবকাশ নেই। সাধারণ অভিজ্ঞতাতেই এটা প্রমাণিত যে, বুকভরে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। বস্তুত এবার শীতের শুরু থেকেই ঢাকা যে বায়ুদূষণের দিক থেকে প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষস্থানে উঠে আসছে; সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তা নিয়মিত বিরতিতে তুলে ধরছে। স্বীকার করতে হবে, ঢাকা নগরী ও এর উপকণ্ঠজুড়ে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন মেগা ও মাঝারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে। আর ঢাকা ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ইটভাটার ধোঁয়ার 'ধ্রুপদি' দূষণ ছাড়াও বিভিন্ন শিল্পকারখানার বায়ুদূষণ রয়ে যাচ্ছে নজরদারি ও তদারকির বাইরে। পাশাপাশি বর্জ্য পোড়ানো কিংবা গাড়ির কালো ধোঁয়ার কথাও বলতে হবে। সেদিক থেকে আলোচ্য প্রতিবেদনটির ভাষ্য বিস্ময়কর নয়। কিন্তু যে কারণে বাড়তি উদ্বিগ্ন হওয়া প্রয়োজন তা হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এবার শীত মৌসুমে এই নগরীতে বায়ুদূষণ বেড়েছে অন্তত ১৯ শতাংশ। এতে যদিও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে; সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ মহাকাব্যিক নীরবতা পালন করে যাচ্ছে।

আমাদের প্রশ্ন, যে দেশের বাতাসে দূষণের উপাদান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা পরিমাণের চেয়ে ১৪ গুণ, সেখানে কর্তৃপক্ষ নীরব থাকে কীভাবে? এই নীরবতাকে অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করলে অত্যুক্তি হতে পারে না। আমরা জানি, বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে কিছু 'হট স্পট' তথা চরম দূষিত এলাকা থাকে, সাধারণত শিল্প এলাকাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ঢাকায় দেখা যাচ্ছে, আবাসিক থেকে বাণিজ্যিক, ঘিঞ্জি থেকে অভিজাত; সব এলাকাই বায়ুদূষণের হট স্পট। এমনকি ঢাকার উপকণ্ঠের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে এমন চরম দূষিত এলাকা। আমরা আশঙ্কা করি, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলেও দূষণের এই মানচিত্র বিস্তৃত হতেই থাকবে।

মনে রাখতে হবে, এই চিত্র নিছক পরিসংখ্যান ও গবেষণার বিষয় নয়। কর্তৃপক্ষের নীরবতা কিংবা স্থবিরতা স্পষ্টতই নাগরিকের জন্য প্রাণঘাতী হতে বাধ্য। চিকিৎসা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন, বায়ুদূষণের জের ধরে নাগরিকদের ফুসফুস ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রোগ ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা উদ্ৃব্দত করে আলোচ্য প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। স্বভাবতই ঢাকায় এই হার আরও বিপজ্জনক। আরও উদ্বেগজনক, বায়ুদূষণজনিত রোগে দেশে কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, তার সরকারি পরিসংখ্যানও নেই।
এখানেই শেষ নয়। আমাদের মনে আছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে 'কেইস' বা নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কীভাবে 'বাতাস চুরি' ঘটেছিল। ২০১৯ সালের নভেম্বরে সমকালেই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, বায়ুমান উন্নয়নের বদলে ওই অর্থ দিয়ে এমন কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, যার সঙ্গে বায়ুদূষণ রোধের সম্পর্ক সামান্য। যেমন ওই প্রকল্পের অর্থের ২৬ শতাংশ দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে 'বায়ু নির্মল' করা হয়েছিল। আর প্রকল্পটির সিটি করপোরেশন থেকে বাস্তবায়িত অংশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন ও উন্নয়নে। বায়ু নির্মল করার সঙ্গে ট্রাফিক সিগন্যালের শোভা বর্ধনের সম্পর্ক কী? এমনকি খসড়া প্রস্তুত হওয়ার দুই বছর পরও পাস করা যায়নি 'নির্মল বায়ু আইন'। এর জবাব কে দেবে? এ যেন সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা?

অথচ শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবেচনাতেই জলজ প্রতিবেশের ঢাকা নগরীর বায়ু নির্মল থাকার কথা ছিল। ঢাকার চারপাশে একাধিক নদীর বেষ্টনী ছাড়াও অভ্যন্তরে বিপুল জলাভূমি ও জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল ছিল। এগুলো সচল ও সচ্ছল থাকলে ঢাকার ভূমির ওপর চাপ কমত এবং ধূলি নিয়ন্ত্রণে থাকত। এই যুক্তি অনেকে দিতে পারেন যে, উন্নত বিশ্বে যে মাত্রায় শিল্পায়ন হয়েছে, সেই তুলনায় আমাদের দেশে হয়নি। তাই বলে বায়ুদূষণ অবারিত রেখে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত বাড়িয়েই চলব?