করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশকে প্রায় দুই বছরের মতো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা আবারও ক্লাসরুমে ফিরেছিল। এরই মধ্যে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এসএসসির ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। আগামী মাসে এইচএসসির ফল প্রকাশের কথা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছিল। এ অবস্থায় আবারও স্কুল-কলেজ ২১ জানুয়ারি থেকে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেহেতু দেশে সংক্রমণের হার ২৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে এবং মৃত্যুও বাড়ছে, তাই সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে- হয়তো এ ছুটি আরও বাড়ানো হবে। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আটকে যাওয়া অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা কবে হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

ফিনল্যান্ডে করোনার পঞ্চম ঢেউ চলছে। দৈনিক সংক্রমণ যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। এত কিছুর পরও ফিনল্যান্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো চিন্তাভাবনা করছে না। এর আগেও করেনি। তারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ধরন পরিবর্তন করেছে। তারা কখনও অনলাইনভিত্তিক ক্লাস, কখনও শারীরিক উপস্থিতিভিত্তিক শিক্ষার মিশ্রণে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রেখেছে। বাংলাদেশেও এটা করা হয়েছে। তবে দেখা গেছে, অনেকে অনলাইন ক্লাসে আগ্রহী হচ্ছে না। আবার তৃণমূলে অনেকের কাছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য নয়।
আমার কর্মস্থল তাম্পেরে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস (টিএএমকে) বর্তমান করোনার পঞ্চম ঢেউয়ের কারণে জানুয়ারির প্রথম থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শারীরিক উপস্থিতিভিত্তিক ক্লাসের পরিবর্তে প্রধানত অনলাইনভিত্তিক ক্লাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এভাবে করোনা সংক্রমণের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো একটা সিদ্ধান্ত কিন্তু আত্মঘাতী- যা দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। করোনা অতিমারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ করতে হয়, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সব বিকল্প গভীরভাবে বিশ্নেষণ করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত একেবারে শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে হবে। কারণ এটা এখন স্বীকৃত- টিকা গ্রহীতারা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হলেও খুব বেশি কষ্ট পাচ্ছেন না। সেরে উঠছেন। করোনা থেকে সৃষ্ট দুর্ভোগ তখনি কমতে থাকবে যখন আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে পারব। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা কিন্তু খুব সহজসাধ্য কাজ না! ফিনল্যান্ড তার মাত্র ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষকে টিকা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষকে টিকা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। ফিনল্যান্ড সম্প্রতি কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই টিকাকেন্দ্রে ঢুকে টিকা নেওয়ার পদ্ধতিতে বেশ সুফল পাচ্ছে। যদি সম্ভব হয় তাহলে বাংলাদেশও এ পদ্ধতিতে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত নিয়মকানুন প্রতিপালন খুব জরুরি। 'নো মাস্ক নো সার্ভিস' এমন নিয়ম করে তা কড়াকড়িভাবে প্রয়োগের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শাস্তিকে ভয় পায়; অনুরোধ বা পরামর্শ মানে না, শোনেও না। করোনার ফলে সৃষ্ট অনেক ক্ষতি হয়তো সময়ের পরিক্রমায় পূরণ হবে, তবে শিক্ষা খাতের ক্ষতি সমাজে ক্ষতচিহ্নের মতো দগদগে হয়ে থাকবে। করোনা অতিমারিকে পরাজিত করতে হবে। না হলে একে অন্ততপক্ষে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে আর যেতে না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজি লাভের দিক থেকে দেশ মৃত হয়ে যায়। দেশভেদে প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা অবশ্যম্ভাবী। তবুও বলব, এ মুহূর্তে এসে করোনার কারণে আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ নয়; শিক্ষা প্রদান পদ্ধতির পরিবর্তন হতে পারে। শারীরিক উপস্থিতির পরিবর্তে অনলাইনে যাওয়া যেতে পারে, যেখানে ইন্টারনেট সুবিধা নেই সেখানে বিদ্যা আহরণ এবং বিদ্যা প্রদান হতে পারে মোবাইল ফোনে। খোলা থাক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জ্ঞানের প্রবাহ হোক বাধাহীন।

ড. কাজী ছাইদুল হালিম, শিক্ষক এবং গবেষক