জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'হিন্দু-মুসলমান' কবিতার 'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/ মুসলিম তার নয়ন মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।/ এক সে আকাশ মায়ের কোলে যেন রবি-শশী দোলে,/ এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান ... চাইব ক্ষমা পরস্পরে, হাসবে সেদিন গরব ভরে এই হিন্দুস্তান'। এই পঙ্‌ক্তিগুলো মূলত অন্য ধর্মে বিশ্বাস না করা সত্ত্বেও ধর্মের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান প্রদান করে। এই ধারণাকে মর্যাদাসীন করার লক্ষ্যে মানবিকতায় উজ্জীবিত চেতনার নামই অসাম্প্রদায়িকতা। এই জনপদে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ সব ক্ষুুদ্র নৃগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ ও সাবলীল বসবাস এই জাতির আবহমান সংস্কৃতির উজ্জ্বল পরিচায়ক।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের সভায় অতি আবেগি ভাষণে বলেছেন, 'এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আপনারা সুখে বাস করবেন। পাশাপাশি বাস করবেন। ভাই ভাই বাস করবেন। কোনোমতে যেন সাম্প্রদায়িকতা বাংলার মাটিতে আর না হয়। তাহলে আমি হার্টফেল করে মারা যাব। কারণ জীবনভর আমি সংগ্রাম করেছি মানুষের মঙ্গলের জন্য। মুসলমান ভাইয়েরা, আল্লাহ কিন্তু রাব্বুল আল আমিন আল্লাহ কিন্তু রাব্বুল মোত্তেকিন। সমস্ত মানুষের সে খোদা। কোনো সম্প্রদায়ের সে খোদা নয়। তাই আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, সাম্প্রদায়িকতার বীজ যেন বাংলার মাটিতে বপন না করে। তাহলে ত্রিশ লাখ যে শহীদ হয়েছে ওদের আত্মা শান্তি পাবে না।' এই বক্তব্য থেকে অতি সহজে অনুমেয়, বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্টম্ন দেখেছেন তার স্বরূপ উন্মোচিত ও পরিপূর্ণতা পাবে যেদিন বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-শোষণমুক্ত মানবিক সমাজের অবস্থানে পৌঁছে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশে গাউসুল আজম শাহ সুফী হজরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) প্রবর্তিত একমাত্র তরিকা হচ্ছে মাইজভান্ডারী দর্শন। মহান আল্লাহ প্রেরিত পবিত্র কোরআন এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) জীবনাদর্শের অমূল্য অনুষঙ্গগুলোকে যথার্থ ধারণ-অনুসরণ-পরিচর্যার মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন মাইজভান্ডারী দর্শনের মৌলিক ভিত্তি। উপমহাদেশের প্রধান আধ্যাত্মিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র মাইজভান্ডার দরবার শরিফ। এটি কেবল একটি দর্শন। পারলৌকিক সাধনা কিংবা চেতনার নাম নয় বরং একটি মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক এবং বিচারসাম্যমূলক সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রাম। এ দর্শন সব ধরনের গোঁড়ামি ও মানবতাবিরোধী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিক বিপ্লব। মাইজভান্ডার দর্শনে ধর্ম সাম্যের যে বাণী তার যথার্থ প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয় এর প্রবর্তক শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর (ক.) কর্মকাণ্ডের মধ্যে। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীর সবাইকে নিজ নিজ ধর্মে থেকে কাজ করার ও আল্লাহকে স্মরণ করার পরামর্শ দিতেন। সম্প্রদায়গত ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে তার কর্মকাণ্ড সব সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রচণ্ড প্রভাবিত করে। ফলে ধীরে ধীরে মাইজভান্ডার দরবার শরিফ সব ধর্মের মানুষের অপরূপ মিলন কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়।

কুপ্রবৃত্তি বন্ধ করে রুহে ইনসানির সুপ্রবৃত্তি জাগ্রত করার জন্য হজরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী (ক.) নির্বিঘ্ন ও সহজসাধ্য মাধ্যম হিসেবে তরিকার উসুলে সপ্তপদ্ধতির প্রবর্তন করেন, যা দুই স্তরে অনুশীলিত হয়। প্রথম স্তর হচ্ছে ফানায়ে ছালাছা বা রিপুর ত্রিবিধ বিনাশ আর দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে মউতে আরবা বা প্রবৃত্তির চতুর্বিধ মৃত্যু। ফানায়ে ছালাছা বা রিপুর ত্রিবিধ বিনাশ স্তর হচ্ছে- ফানা আনিল খাল্ক্ক (পরমুখাপেক্ষী না হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা), ফানা আনিল হাওয়া (অনর্থক কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা) ও ফানা আনিল এরাদা (নিজ ইচ্ছা বাসনাকে খোদার ইচ্ছায় বিলীন করে তাসলিম ও রজা অর্জন করা)। অপরদিকে মউতে আরবা হলো- মউতে আবয়্যাজ বা সাদা মৃত্যু (উপবাস-সংযমের মাধ্যমে অর্জিত এই মৃত্যুতে মানবমনে উজ্জ্বলতা ও আলো দেখা দেওয়া)। মউতে আছওয়াদ বা কালো মৃত্যু (সমালোচনায় বিরক্ত বা রাগান্বিত না হয়ে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের মনমানসিকতা অর্জনই কালো মৃত্যু), মউতে আহমর বা লাল মৃত্যু (কামস্পৃহা ও লোভ-লালসা থেকে মুক্তিতে হাসিল হওয়া) ও মউতে আখজার বা সবুজ মৃত্যু (নির্বিলাস জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে সবুজ মৃত্যু লাভ হওয়া)। এই কোরআনি হেদায়াতের সপ্তপদ্ধতি মানবজীবনের এক নিখুঁত সহজ-সরল ও স্বাভাবিক পন্থা, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনে।

হজরত মাওলানা আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) যুগান্তকারী মাইজভান্ডারী দর্শনের সমন্বয়সমৃদ্ধ বিশ্বমানবতার মিলনমন্ত্রের যে বীজ বপন করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর তারই ভ্রাতুষ্পুত্র ইউসুফে ছানী হজরত গাউছুল আযম সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভান্ডারী (ক.) অধিকতর শোভিত ও বিশ্বব্যাপী পরিপূর্ণ বিকাশে সার্থক রূপদানে ব্রতী ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় মাইজভান্ডারী দর্শনের স্বরূপ উন্মোচক ওছীয়ে গাউছুল আজম হজরত দেলোয়ার হোসেন মাইজভান্ডারী (ক.) এবং সর্বোপরি তারই পুত্র শাহানশাহ হজরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর (ক.) নির্লোভ-নির্মোহ-মানবকল্যাণে সামগ্রিক নিবেদন-দেশপ্রেমের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকায় অলৌকিক অধ্যাত্মবাদের আলোকে অসাম্প্রদায়িক-মানবিক বাংলাদেশসহ বিশ্বপরিমণ্ডলকে অত্যুজ্জ্বল করার মানসে যে অভূতপূর্ব অবদান রেখে গেছেন, তা অবিস্মরণীয়। আজ ২৪ জানুয়ারি, মাইজভান্ডারী দর্শনের প্রবর্তক হজরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) কেবলা কাবার ১১৬তম ওরশ মোবারক উপলক্ষে মহান স্রষ্টার দরবারে বিশ্ববাসীকে সর্বাত্মক শক্তি-সাহস ও সচেতনতায় করোনা অতিমারি প্রতিরোধে জয়যুক্ত করার প্রার্থনা করি।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়