দেশে নিত্যপণ্যের দাম মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। এর ফলে মানুষের জীবনমানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রেকর্ড উৎপাদন ও আমদানির পরও কেন নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না, তা পরিস্কার হওয়া দরকার। অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। দেশে চালের প্রকৃত চাহিদা কত, তার সঠিক মূল্যায়ন করে প্রতি বছর কী পরিমাণ চালের জোগান হয়, তার হিসাব বের করা উচিত।

করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম টেকসই হচ্ছে না। আর না হওয়ার কারণ হলো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অস্থির। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোও স্বস্তিতে নেই। করোনা মহামারির আগেও এসব সমস্যা ছিল। এখন তা বেড়েছে। চালের কী পরিমাণ চাহিদা, তার মূল্যায়ন করা দরকার। আগের চেয়ে চালের চাহিদা বেড়েছে। এর বাণিজ্যিক ব্যবহারও বাড়ছে। ভোগের বাইরেও চালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব বিষয় হিসাবে আনা দরকার। ঘাটতি টানাপোড়েনের সুযোগে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে যাচ্ছে। কতিপয় গোষ্ঠী চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।

সিপিডির গবেষণায় উঠে এসেছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে মূল্যস্টম্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যে মূল্যস্টম্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর বিরাট ফারাক রয়েছে। করোনার সময়ে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও একটা চাপ পড়ছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু সরকারি সংস্থা বিবিএসের তথ্যে দাম বাড়ার কোনো প্রতিফলন নেই। কারণ হতে পারে, বিবিএস যেসব পণ্যের ওপর ভিত্তি করে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) করে সেটি অনেক পুরোনো। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের ভোগে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাই সময় এসেছে, ভোক্তা মূল্যসূচক করার জন্য নতুন পণ্যের বাস্কেট করতে হবে। কারণ, বাজারে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সঙ্গে বিবিএসের তথ্যে বেশ ফারাক দেখা যাচ্ছে।

মোটা চাল ও চিকন চালের মধ্যে নিম্ন-মধ্যবিত্তরা সাধারণত মোটা চাল খেয়ে থাকে। চিকন চালের পাশাপাশি মোটা চালেরও দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। আমাদের দেশে চিকন চালের তুলনায় মোটা চালের চাহিদা অনেক বেশি। অথচ এ ধরনের চালের পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়ায় দাম কম থাকার কথা ছিল। আমরা সিপিডির গবেষণায় দেখিয়েছি, মোটা চালের দাম বেড়েছে মাঠ পর্যায়ে, আর চিকন চালের দাম বেড়েছে বাজারে। মাঠ পর্যায়ে মোটা চালের দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে বড় বড় কৃষক ও রাইস মিলারদের হাত। তারা চাল গুদামজাত করে রেখে সংকট তৈরি করে। তখন বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান সংকট তৈরি হয় এবং বেশি দামে ওই গুদামজাত করা চাল বিক্রি করা হয়।

চাল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আহরণ করা হয়ে থাকে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে চাল উৎপাদন হচ্ছে। যদিও বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হয়। চালের দাম বাড়ার পেছনে কাজ করে উৎপাদন ব্যয় ও চাহিদা বৃদ্ধি। বর্তমানে উৎপাদন খরচ ও চাহিদা উভয়ই বেড়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর ফলে সেচ কাজে ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এমনকি জ্বালানি তেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক নিয়ামকের দাম বাড়ায় এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে। বর্তমানে আমন চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব খুব একটা থাকার কথা ছিল না। কারণ এ ধান আগেই মাঠ থেকে উঠে গেছে। তারপরও এ মোটা চালের দাম বেড়েছে। আগামী মার্চে বোরো ধান বাজারে এলে তখন আরেক দফা চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আমনের তুলনায় বোরো উৎপাদনে সেচ খরচ তুলনামূলক বেশি। এর একটি প্রভাব বাজারে পড়বে।


ইদানীং চালের বহুমুখী চাহিদা বেড়েছে। এখন আর চাল দিয়ে শুধু ভাত রান্না করা হয় না। বরং চালকে কাঁচামাল হিসেবে ধরে অন্য অনেক খাদ্যপণ্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মুড়ি, চিড়া, খই থেকে শুরু করে নানা ধরনের পিঠা-পায়েস। এগুলো আগেও তৈরি হতো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে চাল বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক আকারে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। চাল দিয়ে তৈরি এসব খাবার বাজারজাত করছে বিভিন্ন কোম্পানি। চাল দিয়ে গবাদি পশু ও প্রাণীর খাবার তৈরি হচ্ছে। মাছের খাবার হিসেবে চাল ব্যবহূত হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত করে পশু, মৎস্য খাবারে রূপ দেওয়া হচ্ছে চালকে। ফলে এখানেও চাল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এসব কারণে চালের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাঠ থেকে যত বেশি চাল কিনে রাষ্ট্রীয় গুদামে মজুদ করা যাবে, তত বেশি অসাধু ব্যবসায়ীরা সতর্ক হবে। কারণ সরকার ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছ থেকে ধান বা চাল কিনলে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য পায়, অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা আর কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে না। কারণ তারা জানে, বাজারে চালের সংকট হলে সরকারের কাছে থাকা মজুত চাল দিয়ে সে চাহিদা পূরণ করা যাবে। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান বা চাল কেনার পাশাপাশি চালের আমদানিও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও চাল আমদানি করছে। এতকিছুর পরও শঙ্কা কাটেনি। বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার পেছনে কাজ করছে কতিপয় গোষ্ঠী। তারাই চাল গুদামজাত করে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং সুবিধামতো দাম বাড়িয়ে দেয়। এসব চক্রের লাগাম টেনে ধরতে পারলে বাজার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে আগেই বলেছি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণে আসবে, এটা বলা যাবে না। চালের বাজার সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে হলে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়কে আরও জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। অনেক বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। উৎপাদন, মজুত ও আমদানি বিষয়ে প্রয়োজনে নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। নিবন্ধনভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া নিবন্ধনহীন কেউ যেন চাল আমদানি করে বাজার অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে।

এর বাইরে আরও কিছু ভূমিকা নিয়ে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাজারমূল্য নির্ধারণে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সিন্ডিকেটের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। খুচরা বাজার নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে বড় বড় কৃষক ও রাইস মিলারদের দিকে নজরদারি বাড়িয়ে দিতে হবে। যেন তারা গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। এই কাজগুলো করা অত সহজ নয়। তারপরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিয়ে আসা দরকার। বড় ব্যবসায়ী ও রাইস মিলারদের নিবন্ধনভুক্ত করতে হবে। অস্বাভাবিক মজুত দেখলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে আমদানিকারকদেরও নিবন্ধন করে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিযোগিতা কমিশনের জোরালো ভূমিকা রাখার সময় এসেছে। কৃষির আধুনিকীকরণের ফলে ধান তথা চালের উৎপাদন বেড়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ভোগ বেড়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। এ অবস্থায় উৎপাদন বাড়ানো অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বে এখন করোনা মহামারি চলছে। তার ওপর আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সামনে বোরো মৌসুমে চালের দাম বৃদ্ধি পেলে মানুষ কষ্ট পাবে। তাই বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে উদ্যোগ নিতে হবে। চালের আমদানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য খোলাবাজারে (ওএমএস) পণ্য বিক্রি অব্যাহত রাখতে হবে। এর ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে হবে। না হলে পুষ্টির ওপর প্রভাব পড়বে। স্বল্প আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে যাতে খোলাবাজারে আরও বেশি করে পণ্য বিক্রি করা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)