নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রে একজন জনপ্রতিনিধির নাম যেভাবে এসেছে, তাতে আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। এর আগে আমরা দেখেছি, পুলিশের তদন্তে ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিভিন্ন ঘটনায় শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীর নাম এসেছিল। এখন এ অভিযোগে একজন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেত্রীর গ্রেপ্তারের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই দেখা যাচ্ছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূল আসলে অনেক গভীরে। আমরা জানি, কভিড-১৯ এর কারণে উল্লেখযোগ্য সময় চাকরিতে নিয়োগ এক প্রকার বন্ধ ছিল। এর পর যখন গত বছরের শেষদিকে নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয় তখনই প্রশ্ন ফাঁসে জালিয়াত চক্রের বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে, গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সরকারি পাঁচটি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বস্তির বিষয়, ওই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। অস্বস্তির বিষয় হলো, ওই ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নাম আসে। এ ছাড়া নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের আরেকটি ঘটনায় বরখাস্ত হন দুই ব্যাংকার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তা। একটি চক্র ধরা পড়তে না পড়তেই আরেকটি প্রশ্ন ফাঁস চক্র যেভাবে সামনে আসছে, সেটিই উদ্বেগের বিষয়।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রশ্ন ফাঁসের এ চক্র ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে বাইরে থেকে প্রশ্ন সমাধান পাঠিয়ে ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরিপ্রার্থীদের পাস করাত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে নিশ্চয়ই আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে। শুক্রবার প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের অধীনে অডিটর নিয়োগে যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, সে প্রশ্ন ফাঁসচক্রে জনপ্রতিনিধির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বরখাস্তকৃত এক কর্মকর্তাও ছিলেন। আমাদের মনে আছে, কয়েক বছর আগে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ছিল অনেকটা নিয়মিত। প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপে সেখানে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে যেভাবে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস চলছে, এটি রোধেও প্রশাসন প্রযুক্তির সহায়তা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট কেন্দ্রের শিক্ষকদের সচেতনতা ও সতর্কতার বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য।

একজন জনপ্রতিনিধির প্রশ্ন ফাঁসের মতো অনৈতিক ও গর্হিত অপরাধে জড়িত থাকার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট- বিষয়টি ঘিরে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে সমাজে সর্বস্তরের সুবিধাভোগীরা জড়িয়ে পড়ছে। বস্তুত প্রশ্ন ফাঁসের বিষবৃক্ষ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা চলতে দেওয়া যায় না। আমরা জানি, জনপ্রতিনিধিরা জনকল্যাণে কাজ করার শপথ নেন; রাজনীতিবিদরা দেশ গঠনে নিবেদিত থাকেন। তাদের এক ধরনের ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতা যদি তারা প্রশ্ন ফাঁসের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন, শঙ্কা সেখানে আরও বেশি। এমন একজন জনপ্রতিনিধির ধরা পড়ার মাধ্যমে আরও অনেক 'ক্ষমতাবান' চক্রের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জড়িত থাকার আশঙ্কাও আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কলঙ্কের বিষয়। আমরা জানি, সরকারি চাকরি অনেকের কাছে সোনার হরিণের মতো। কিন্তু এ মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে যারা এগিয়ে থাকবে, তাদেরই এ চাকরি পাওয়া উচিত। আমরা দেখেছি, অনেকে কয়েক বছরের নিরলস প্রস্তুতি নিয়ে এ ধরনের চাকরির পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। সে পরীক্ষাটি যদি কেউ প্রশ্ন ফাঁস বা অন্য কোনো অসদুপায়ে উত্তীর্ণ হয়ে থাকে, তার চেয়ে বেদনার বিষয় আর কী হতে পারে! আমরা বিশ্বাস করি, প্রশাসনের কঠোরতায় পাবলিক পরীক্ষা যেমন প্রশ্ন ফাঁস থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে; ঠিক একইভাবে সরকার চাইলে চাকরির পরীক্ষা কিংবা ভর্তি পরীক্ষাসহ সব পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে পারবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রশ্ন ফাঁসের অপরাধে অনেকে গ্রেপ্তার হলেও কারও দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। আমরা চাই, এ অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তারকৃত সব অপরাধীকে তদন্তসাপেক্ষে শাস্তির আওতায় আনা হোক। প্রশ্ন ফাঁসের বিষবৃক্ষ আর বাড়তে দেওয়া যায় না। এর মূলোৎপাটন জরুরি।