মাধব-বীথি, সম্পর্কে দেবর-ভাবি। চট্টগ্রাম নগরের টেরিবাজারের আফিম গলিতে ছিল তাদের বাস। দু'জনের ছিল অনৈতিক সম্পর্ক। সেই ঘনিষ্ঠ সংযোগের রসায়নে বীথির কিছু গোপন ছবি চলে আসে মাধবের মোবাইল ফোনে। সেই ছবিকে 'ট্রাম্প কার্ড' বানিয়ে মাধব শুরু করে ব্ল্যাকমেইল। এক পর্যায়ে মাধব দু'জনের অন্তরঙ্গ ছবি ছড়িয়ে দেয় ফেসবুকে। আর তাতেই তেতে ওঠেন বীথি। মাধবকে হত্যা করে খাটের নিচে লাশ লুকান। লাশ খাটের তলায় রেখে বীথি ওই ঘরে ভয়ডরহীন ছিলেন তিন রাত। পরে জানাজানি হলে উদ্ধার হয় লাশ, বীথিকে নেওয়া হয় পুলিশের ডেরায়। ভাবির সঙ্গে প্রেম, এরপর প্রতারণা, সবশেষ খুন দিয়ে গল্পের যবনিকা। গত ৭ ডিসেম্বর এই খুনের ঘটনার পর থেকে বীথি কারাবন্দি।

শুধু কি অনৈতিক সম্পর্ক, তুচ্ছ ঘটনায় গত ৬ নভেম্বর নগরের আমবাগান এলাকার বায়তুল আমান জামে মসজিদের সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদকে মেরে ফেলা হয়। ভাড়া নিয়ে ফারুকের সঙ্গে অটোরিকশাচালকের কথা কাটাকাটির সময় সোহেল নামে এক যুবকও তর্কে জড়ান। এক পর্যায়ে সোহেলের সঙ্গে তার মা রোকসানা ও খালা মর্জিনা এক হয়ে ফারুককে পিটিয়ে হত্যা করে। একইভাবে গত ২২ আগস্ট নগরের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় সড়কের ওপর ময়লা ফেলা নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল মালেককে ইট দিয়ে বুক ও মাথা থেঁতলে হত্যা করে তায়িবা ও আনু বেগম। ওই সময় খুন করেও তাদের ক্রোধ দমেনি, মালেকের নিথর দেহ পাশের নালায় ফেলে সেই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তারা।

নারী। কেউ আবেগি, কেউ হয় প্রতিবাদী। কখনও ভালোবাসার, কখনও প্রাণহারিণী। রাগ, ক্রোধ বশে রাখতে না পেরে শহুরে তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীর 'কোমল হাত' হচ্ছে রক্তাক্ত। পরে জীবনটাকে আইনের কাছে সঁপে দিয়ে নিকষ আঁধারে ডুব দিচ্ছে এক একটি সম্ভাবনা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তরুণীরাই সবচেয়ে বেশি খুনে জড়াচ্ছেন। গ্রামে আবার উল্টো ছবি। মধ্যবয়সী নারীদের হাতেই গ্রামের সবুজ প্রান্তর হচ্ছে রক্তে লাল। শহরে ১৮ থেকে ৩৫ বছর এবং গ্রামে ৩৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের খুনে জড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে ধারাবাহিক। চট্টগ্রামের নারীর অপরাধ বিষয়ে সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই ভীতিকর তথ্য।

২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম জেলা ও নগরের ৩২ থানায় ৭৭৪টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে ২১৫ খুনে অভিযুক্ত ছিলেন ২৩৭ নারী। ওই নারীদের গ্রেপ্তার করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আইনের ফাঁক গলে জামিনে কারামুক্ত হয়ে যায় অধিকাংশ খুনের আসামি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, খুনের মামলায় নারী আসামিদের বেশিদিন কারাগারে আটকে রাখা যাচ্ছে না। খুনের ঘটনায় নারী আসামিদের সাজার হারও খুব কম। পাঁচ বছরে সাজা হয়েছে মাত্র ছয়জনের। সাজার এ হার দায়ের হওয়া খুনের মামলার ৩১ গুণ কম।

নগরের ৭৪ খুনের ৫৭টিতেই তরুণী: চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ বছরে ঘটে যাওয়া ৭৪ খুনের ৫৭টিতেই অভিযুক্ত ছিল তরুণী। শেষ ২০২১ সালে ১৬ খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত হয় ১৮ নারী। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের ১১ তরুণী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। এ ছাড়া শহরে অভিযুক্ত বাকি সাত নারীর বয়স ৩৫ বছরের ওপরে।

একইভাবে ২০২০ সালে নগরে ১৮ খুনের ঘটনায় ২২ নারী গ্রেপ্তার হয়। ৩৫ বছরের নিচে অভিযুক্ত ১৪ তরুণী। ২০১৯ সালে ১২ খুনে ১৫ নারী গ্রেপ্তার হলেও ৩৫ বছরের নিচে অভিযুক্ত ১২ তরুণী। ২০১৮ সালে ১০ খুনে গ্রেপ্তার ১১ জনের মধ্যে আট নারীর বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ২০১৭ সালে ১৮ খুনে গ্রেপ্তার ২০ জনের মধ্যে ১২ জনের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।

নগরের চেয়ে গ্রামে খুন দ্বিগুণ: চট্টগ্রামে পাঁচ বছরে নগরে ৭৪ খুনের বিপরীতে গ্রামে হয়েছে ১৪১ হত্যা। সেই হিসাবে নগরের চেয়ে গ্রামে ঘটেছে দ্বিগুণ হত্যাকাণ্ড। খুনের দায়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় ১৫১ নারী। ২০২১ সালে চট্টগ্রামে ১৬ উপজেলার গ্রামে ১৮ খুনের ঘটনায় ২১ নারী গ্রেপ্তার হয়।

একইভাবে ২০২০ সালে গ্রামে ২১ খুনে ২৪ নারী, ২০১৯ সালে ৩৩ খুনে ৩৫ নারী, ২০১৮ সালে ৪৪ খুনে ৪৬ নারী, ২০১৭ সালে ২৫ খুনে ২৫ নারী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যায়। গ্রামে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের ১১২ নারী অভিযুক্ত হয়।

খুনের আসামি ৮৮ শতাংশ নারীই জামিনে মুক্ত: খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধে নাম জড়ালেও বেশিদিন কারাগারে থাকতে হচ্ছে না নারীদের। হত্যা মামলায় সহজে মেলে না জামিন। তবে নারী আসামিরা কারাগারে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে মুক্তি মিলেছে। এই হার ৮৮ শতাংশ। পাঁচ বছরে ২১৫ খুনে ২৩৭ নারী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও এখন মাত্র ৩৩ নারী কারাগারে বন্দি রয়েছে। ২০৪ নারী মুক্তি পেয়েছে জামিনে।

২০২১ সালে ৩৪ খুনে ৩৯ নারী কারাগারে যায়। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর বছর না যেতেই জামিনে মুক্তি পায় ২২ আসামি। ২০২০ সালে ৩৮ খুনে ৪৫ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও এখন বন্দি আছে মাত্র সাত আসামি। ২০১৯ সালে ৪৫ খুনে ৫১ জন কারাগারে গেলেও এখন বন্দি মাত্র চারজন। ২০১৮ সালে ৫৪ খুনের ঘটনায় ৫৭ জন নারী গ্রেপ্তার হলেও কারাবন্দি মাত্র এক আসামি। ২০১৭ সালে ৪১ খুনে ৪৫ নারী গ্রেপ্তার হলেও কারাগারে আছে মাত্র চারজন।

রাউজান ভয়ংকর: পাঁচ বছরে নারীদের হাতে সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে রাউজানে। এই এক থানাতেই নারীর হাতে খুন হয়েছেন ১৯ জন। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয় ১৯ জন। এ ব্যাপারে রাউজান থানার ওসি আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, পাঁচ বছরে রাউজানে খুনের ঘটনায় বেশি সংখ্যক নারীর সম্পৃক্ততার তথ্য আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে। বিষয়টি সত্য হলে প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাজার চেয়ে ৩১ গুণ বেশি মামলা: পাঁচ বছরে ২১৫ হত্যায় ২১৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি হয়ে সাজা হয়েছে মাত্র ছয়টির। সাজা হওয়ার তুলনায় মামলা রেকর্ডের পরিমাণ ৩১ গুণ বেশি। ছয় নারীর যাবজ্জীবন সাজা হয়। তারা হলো- বাঁশখালীর তুর্ণা দাস ও ফাতেমা বেগম, বোয়ালখালীর কামরুন নাহার, সাতকানিয়ার জান্নাতুল নাঈম লিজা, কুমিল্লার ছায়েবা হক মৌ এবং চন্দনাইশের নুর জাহান বেগম।

হত্যাচেষ্টায়ও অভিযুক্ত ৪৭ নারী: শুধু খুন নয়, ২০২১ সালে চট্টগ্রামে হত্যাচেষ্টার মামলায় ৪৭ নারী অভিযুক্ত ছিল। চট্টগ্রামের ৩২ থানায় রেকর্ড হওয়া মামলায় অভিযুক্ত সবাই খুনের চেষ্টা মামলায় করেছে কারাভোগ।

কে কী বলছেন: হত্যার সঙ্গে নারীদের জড়িয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'বিশ্বের সঙ্গে আমরাও এখন লিঙ্গ সমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। তাই নারী ক্ষমতায়ন বেড়েছে, সর্বক্ষেত্রে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির নেতিবাচক আসক্তি, সেলিব্রিটি হওয়ার বিকৃত চিন্তা, মোহ, রাতারাতি কিছু পাওয়ার মানসিকতা থেকেই খুন-খারাবির মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়াচ্ছে নারীরা। অসুস্থ বিনোদন আমদানি বন্ধ করে সুস্থ বিনোদন চর্চাই আমাদের এ সংকট থেকে বের করে আনতে পারে।'

চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে নারীদেরও অপরাধ জগতে পা ফেলার প্রবণতা বাড়ছে। খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধও সহজে ঘটিয়ে ফেলছে তারা।'

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'খুনের মামলার তদন্ত শেষ করতে কয়েক বছর চলে যায় পুলিশের। অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর বিচার শুরু করতে বছরখানেক সময় লাগে। বিচার শুরু হলে পুলিশ যথাসময়ে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় বিচার বিলম্বিত হয়।'

কারাগারের জেলার দেওয়ান মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, 'কারাগারে এখন খুনের মামলায় ৩৩ নারী বন্দি রয়েছে। কয়েদি আছে পাঁচজন। যারা জামিন পেয়েছে, তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।'

সূত্রহীন হত্যা মামলার রহস্য গভীর থেকে টেনে তুলে আনার ব্যাপারে যার জুড়ি মেলা ভার তিনি চট্টগ্রাম পুলিশের চৌকস তদন্ত কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা। নগরের খুলশী থানার এই ওসি মনে করেন, খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধে নারীরা জড়িয়ে পড়ার কারণ মূলত অনৈতিক সম্পর্ক, পারিবারিক বিরোধ ও প্রতারণা। এই তিন কারণে তরুণী থেকে মধ্য বয়সের নারীরা একটা সময় গিয়ে খুবই উন্মত্ত আচরণ করে। তখনই খুন করে বসে।