আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক পট পরিবর্তন অর্থাৎ গনি সরকারের পতন ও তালেবানের ক্ষমতারোহণের মধ্যে বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা বিশ্বের জন্যই শিক্ষা রয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান নারী শিক্ষা ও নারীদের ঘরের বাইরে কর্মে অংশগ্রহণের বিরোধী, অথচ একটি দেশে সাধারণত ৫০ শতাংশই নারী থাকেন। উন্নয়নকর্মে যদি নারী অংশগ্রহণের সুযোগ না পায়, তবে উন্নয়নও অর্ধেক হবে। যা বঞ্চিত করবে পুরুষকেও। তাই পুরুষের নিজের স্বার্থেই উন্নয়নকর্মে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।
বংলাদেশে '৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। সামরিক সরকার কর্তৃক সংবিধান থেকে দুই মূলনীতি বাদ দিয়ে এবং রাষ্ট্রধর্মের বিধান করে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক চরিত্র দেওয়া হয়েছে। যা পরোক্ষভাবে ধীরে ধীরে জনগণের চেতনায় পরিবর্তন এনেছে এবং পরিবর্তনটা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিপরীতে।
অথচ মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালি ভুলে গিয়েছিল কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ আর কে খ্রিষ্টান।
কিন্তু বিভাজন ও ধর্মীয় বিদ্বেষ দেখা দিল স্বাধীনতার পরপরই। বিএনপি জামায়াতকে কাছে টেনে শক্তি বৃদ্ধি করল। অসংখ্য ছোট ছোট উগ্রবাদী ইসলামী দল, উপদলের জন্ম হলো। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক পট পরিবর্তন জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য নিষিদ্ধ উগ্রবাদী ইসলামী দল-উপদলগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙ্গা হবে এবং বহুগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করবে। তারা ভাববে, বাংলাদেশেও তাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসা সম্ভব। শুধু মনস্তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবেই তারা তালেবানের কাছ থেকে অর্থ, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাবে।
অথচ বাংলাদেশের উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী শ্রমের ওপর। বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা তথা গ্রোথ ইঞ্জিন হলো তৈরি পোশাক শিল্প, যেখানে ৮০ শতাংশই নারী। শুধু তাই নয়, ফার্ম ও নন-ফার্ম সেক্টরেও এখন প্রচুর নারী শ্রমিক কাজ করেন। নারীরা অর্থ উপার্জন করে ছেলে শিশুর পাশাপাশি কন্যাশিশুকেও স্কুলে পাঠান, শিক্ষিত করেন; যাতে তার সন্তানকে আর তার মতো হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করতে না হয়। গবেষণা বলছে, গড়ে এক বছর স্কুলিংয়ের ফলে ভবিষ্যতের মজুরি বেড়ে যায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এভাবেই বাংলাদেশ ক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তানে ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন শিশু স্কুলের বাইরে, যার ৬০ শতাংশ মেয়ে শিশু। আফগানিস্তানে যেসব শিশু স্কুলে যায়, তার শুধু ১৬ শতাংশ মেয়ে। ১৭ শতাংশ মেয়েকে তাদের ১৫তম জন্মদিনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করা হয়। এই পরিসংখ্যান পরিস্কার বলে দেয়, নারী শিক্ষা ও নারীশ্রম সেখানে অনুপস্থিত।
হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামী দলগুলোর অনেকেই ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে নারী শিক্ষা ও নারীর কর্মে যুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটা প্রধান সূচক হলো নারীর কর্মে নিযুক্তি যা ১৯৯০ সালে আফগানিস্তানের চেয়ে দেড় গুণ ছিল বাংলাদেশে। সেটা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে ২০১৯ সালে। কিন্তু বাংলাদেশে এই সূচক এখনও (২০১৯ সালে) মাত্র ৩৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় নগণ্য। বস্তুত পোশাক শিল্পের বাইরে নারীর কর্মে নিযুক্তির হার খুবই কম।
আরও কিছু পরিসংখ্যান আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে- প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে কীভাবে ও কেন বাংলাদেশ আফাগানিস্তানের ওপরে অবস্থান করতে পারছে। আফগানিস্তানে ১৪-ঊর্ধ্ব বয়সী নারীদের মধ্যে মাত্র ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ নারী সাক্ষর, যেখানে বাংলাদেশে ৭১ দশমিক ১৮ শতাংশ (২০১৮-এর উপাত্ত অনুযায়ী)। নারীর সম্ভাব্য গড় আয়ুস্কাল আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে প্রায় ১০ বছর বেশি। নারীর ক্ষমতায়নের দুটি প্রধান সূচক এ রকম- ১. দেশের আইন ও প্রবিধান নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগকে কীভাবে প্রভাবিত করে; ২. নিজের স্বাস্থ্য পরিচর্যা, প্রধান প্রধান গৃহস্থালির জিনিসপত্র ক্রয় ও বাপের বাড়ি বেড়ানো- এই তিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, প্রথমটিতে বাংলাদেশের স্কোর আফগানিস্তানের চেয়ে ২১ বেশি আর দ্বিতীয়টিতে প্রায় ১৫ বেশি। এসব উপাত্ত সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে, নারীর শিক্ষা, নারীর কর্মে নিযুক্তি, তার ক্ষমতায়ন দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। অতএব, তালেবানের মতো কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশও আফগানিস্তানের মতোই খাদের নিচে গড়িয়ে পড়বে, যেখান থেকে আর সহসা উঠে দাঁড়াতে পারবে না।
শিক্ষাব্যবস্থাই হলো একটা দেশের উন্নয়নের ভিত্তি। শিক্ষাব্যবস্থাই একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দেয়। আগেই বলা হয়েছে, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষাই উন্নয়নের মূলমন্ত্র। আর আকাঙ্ক্ষাটা সৃষ্টি হয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ইহজগতে অর্থাৎ এই জীবনে উন্নত জীবনযাপন করার আকাঙ্ক্ষাই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুই শিশুর মনন গঠন করে। শিশু কী শিক্ষা পেল, তার ওপর নির্ভর করে সে বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, আধুনিক, সংস্কৃতিমান, মুক্তচিন্তার ও সমন্বিত জীবনচেতনার অধিকারী হবে কিনা। যদি না হয় সে নিজের ও সমাজের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেজন্যই শিক্ষার মূল সুর হতে হবে ইহজাগতিকতা ও জীবনঘনিষ্ঠতা। শিক্ষার মূল সুর হতে হবে সমাজবাদ। না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশও পরিণত হবে আজকের আফগানিস্তানের মতো একটি পশ্চাৎপদ দেশে। প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, জীবনমান, গড় আয়ু- সব হবে নিম্নমুখী। দেখা দেবে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও অনাহার।
তালেবানের আদর্শপুষ্ট হেফাজতে ইসলাম শিক্ষাক্রমে পরিবর্তনের দাবি তুলে শিক্ষাব্যবস্থাকে, দেশকে পেছনের দিকে নিতে চাইছে। তারা তালেবানের আদর্শপুষ্ট, হেফাজত নিশ্চয়ই তা স্বীকার করবে না। কিন্তু নারীর শিক্ষা, নারীর উচ্চশিক্ষা, ঘরের বাইরে তাদের কর্মে নিযুক্তি এবং পুরুষের সমান অধিকারের যারা বিরোধী, নিশ্চয়ই তারা তালেবানের আদর্শপুষ্ট।
পাঠ্যপুস্তকের ক্ষেত্রে দেশের জনগণকে বুঝতে হবে, কথাটা একজন হিন্দু বললেন, না একজন মুসলিম বললেন, না একজন নিরশ্বরবাদী বললেন- সেটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কী বললেন, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য। বুঝতে হবে, যে রচনা মানুষের মুক্তির কথা বলে, সেটাই শ্রেষ্ঠ রচনা। রচয়িতা যে-ই হোক না কেন। যে সাহিত্য মানুষের মুক্তি তথা শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে না, সে সাহিত্য জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য নয়। সে সাহিত্য পরিত্যাজ্য।
আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠান তথা ইনস্টিটিউশন গড়ার মূল কাজটাই করেনি যুক্তরাষ্ট্র এই বিশ বছরে। এক কথায়, যে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠান নেই, সেই রাষ্ট্রে কিছুই নেই। যতই উন্নয়ন হোক না কেন, প্রতিষ্ঠান না থাকলে সেই উন্নয়ন এক সময় মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে বাধ্য। পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, বিয়ে, পরিবার, শিক্ষা ইত্যাদি হলো প্রতিষ্ঠান তথা সুপার স্ট্রাকচারের উদাহরণ। এসব গড়ে না উঠলে দেশে এক সময় অরাজকতা দেখা দেয়। অরাজকতা দেখা দিলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয় আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করতে পারলে উন্নয়ন ঘটবে কীভাবে?
তুর্কি বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ ডারোন এসিমগলুসহ জেফ্রি স্যাক্স, স্টিগলিট্‌জ, পল ক্রুগম্যান প্রমুখ মার্কিন বুদ্ধিজীবীর মোটামুটি একই মত- আমেরিকা আফগানিস্তানে কোনো ইনস্টিটিউশন গড়ার চেষ্টা করেনি। ফলে ২০০১ সালে যখন তারা সেখানে গিয়েছিল আর ২০২১ সালে যখন ফিরে এলো, দুই অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাদের মত হলো, শুধু সামরিক হস্তক্ষেপ দিয়ে কোনো দেশের উন্নয়ন তো দূরের কথা, কোনো পরিবর্তনও করা যায় না। মার্কিনিরা ২০ বছরে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, এর মধ্যে ২ শতাংশেরও কম ব্যয় হয়েছে ভৌত অবকাঠামো ও দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পে অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ২ শতাংশেরও কম পৌঁছেছে আফগান জনগণের কাছে।
সরকারের স্বার্থে প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা আর প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা একই কথা। আজ বাংলাদেশে যখন পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে, তখন আফগানিস্তান থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া দরকার। প্রতিষ্ঠানহীন রাষ্ট্র মানে অন্তঃসারশূন্য রাষ্ট্র, সেখানে আজকের আপাত উন্নয়নও একদিন অদৃশ্য হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। পড়ে থাকবে শুধু রাষ্ট্র নামের একটি কঙ্কাল, দেখা দেবে নৈরাজ্য, গৃহযুদ্ধ, অনাহার, অর্ধাহার আর মৃত্যু!
হড. এন এন তরুণ :রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ এবং ড. কুদরতে খোদা :জাপানের আইচি গাকুইন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক।
ntarun@gmail.com