দেশি-বিদেশি বিপুল বিনিয়োগের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী। এরই মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে এ এলাকায়। ৭৮ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের আরও ছয়টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলমান। এর বাইরে আরও ৫৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে মাতারবাড়ী ও এর সংলগ্ন মহেশখালী ও ধলঘাটে। জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকা ঘিরে লজিস্টিক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং অন্যান্য শিল্পে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রাথমিক প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিনিয়োগ করবেন সে দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তারা। বাকি ১০ বিলিয়ন ডলার সহজ শর্তে বাংলাদেশকে ঋণ দেবে জাপান।

সংশ্নিষ্টদের ভাষ্য, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে যে বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। কারণ এখানে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার প্রতিটিই দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখানে উন্নত যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দর, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাত নতুন করে স্থাপন করা হচ্ছে। এতে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে সহায়তা করবে। এগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প ও বাণিজ্য প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

গত ১৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বাস্তবায়ন বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজের সভাপতিত্বে মাতারবাড়ী এলাকায় সমন্বিত উন্নয়ন নিয়ে এক সভা হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ওই এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর, এলএনজি, এলপিজি টার্মিনাল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, ওয়াটার ফ্রন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, পেট্রোকেমিক্যালস, টাউনশিপ ডেভেলপমেন্ট, পানি উন্নয়ন এবং ইকোট্যুরিজম পার্ক ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। ব্যাপক বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে সরকার একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের চিন্তা করছে। কর্তৃপক্ষের কাজ হবে, শিল্পকারখানাসহ সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ ও কার্যক্রমে সহায়তা করা। এ এলাকার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে সরকার ২০১৮ সালে মহেশখালী-মাতারবাড়ী ইন্টিগ্রেটেড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সংক্ষেপে 'মিডি' নামে এক সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে এখন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে রূপান্তর করা হবে। এ জন্য একটি আলাদা আইনও করা হবে।

মিডি সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মো. সারোয়ার আলম সভায় জানান, এ এলাকায় প্রাথমিকভাবে ৩৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি প্রকল্পে জাপান সরকার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। জাইকা জানিয়েছে, তারা এসব প্রকল্পে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, যার মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার ওডিএ (অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট এইড) এবং ১০ বিলিয়ন ডলার তাদের দেশের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নিয়ে আসবেন। ঋণের পুরোটাই সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে। জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে জাইকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিতভাবে বিনিয়োগ জমা দেয়। বিনিয়োগ বিষয়ে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সম্মত হন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় মাতারবাড়ীতে ৬৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী সমকালকে বলেন, মাতারবাড়ী, ধলঘাটা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ওই এলাকায় যে বিনিয়োগ হচ্ছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পাল্টে দেবে। দেশের অর্থনীতির রূপান্তরে ত্বরণ হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার বড় অংশ নির্ভর করছে এই এলাকার ওপর। এ জন্য দ্রুত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, মাতারবাড়ীকে 'এনার্জি হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে এলএনজি টার্মিনাল, এলপিজি টার্মিনাল, অয়েল টার্মিনাল, গ্যাস ট্রান্সমিশন এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। অন্যদিকে, 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে অয়েল রিফাইনারি, এনার্জি ও ফুড স্টোরেজ, ট্যুরিজম, এমব্যাঙ্কমেন্ট ও ওয়াটারফ্রন্ট ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজও চলছে। বর্তমানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। সংযোগ রেলপথও নির্মাণ করা হবে। মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা এলাকা ঘিরে 'পাওয়ার হাব' গড়ে তুলতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আটটি প্রকল্প ছাড়াও এলএনজি, সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট ও কোল টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। গড়ে তোলা হবে টাউনশিপ। এ ছাড়া, জাপানি অর্থায়নে ১০৬ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী জাপান। এ ছাড়া, সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬০ কিলোমিটার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মাতারবাড়ীতে একটি জাপানি ইকোনমিক জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাইকি। মহেশখালী গভীর সমুদ্রবন্দর সংলগ্ন এলাকায় প্রস্তাবিত ইকোনমিক জোনে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে বিপুল বিনিয়োগ হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মাতারবাড়ীতে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে বন্দর সুবিধাসহ জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে সামিট গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে জাপানের কোম্পানি জেরা এশিয়া। এ প্রকল্পের আওতায় বছরে দুই কোটি টনের বাল্ক্ক কার্গো হ্যান্ডেলিং সম্ভব হবে।

এদিকে কক্সবাজারের উন্নয়নে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে সরকার। এ কর্তৃপক্ষের কাজ মূলত একটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় পর্যটননগরী প্রতিষ্ঠা। কক্সবাজার জেলার মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে ১৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সমীক্ষা প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হবে। প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগের বিবেচনাধীন রয়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া মৌজার ২৪৮ একর এর অন্তর্ভুক্ত থাকলেও মাতারবাড়ী-ধলঘাটা মৌজার কোনো এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত নেই।

চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি :প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সভায় উপস্থাপন করা তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় আট হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নেভিগেশন চ্যানেল টার্নিং বেসিন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। চলতি বছরই এর বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ১০৯ কোটি টাকা। আট হাজার ৮২১ কোটি টাকা ব্যয়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর ৬৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের রাজঘাট-মোহরীঘোনা-নিউ খোয়েলা সেতু পর্যন্ত মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। আগামী বছরের জুন নাগাদ এ সড়ক চালু হওয়ার কথা রয়েছে। আর ৫১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে 'মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার পাওয়ার পল্গান্ট'-এর ভৌত কাজ হয়েছে ৫২ শতাংশ। ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৬ সালে চালু করা যাবে বলে আশা করছে সরকার। মাতারবাড়ী-মধুনাঘাট ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরং উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পের ৬৯ শতাংশ ভৌত কাজ হয়েছে।