মনোরঞ্জন হাজং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে দেশটির সীমান্ত প্রহরী ছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। কিন্তু সেই মনোরঞ্জন হাজংয়ের দিন কাটছে হাসপাতালের বিছানায়। এক পা হারিয়ে অন্যরকম ভীতিকর এক জীবনযুদ্ধে সীমান্তের একদা অতন্দ্র প্রহরী মনোরঞ্জন হাজং। বিগত বছরের ২ ডিসেম্বর এক সড়ক দুর্ঘটনায় বদলে যায় মনোরঞ্জন হাজংয়ের যাপিত জীবন। রাজধানীর বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ীতে সড়কে মনোরঞ্জন হাজংয়ের মোটরসাইকেলকে চাপা দেয় দ্রুতগতির একটি বিএমডব্লিউ। মারাত্মকভাবে আহত মনোরঞ্জন হাজংকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কেটে ফেলতে হয় একটি পা। সেই থেকে কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে তিনি এখন বারডেমে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পরপরই পথচারীরা বিএমডব্লিউ গাড়িটি আটক করে চালক-আরোহীসহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পুলিশ গাড়িটিকে বনানী থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু সেই রাত্রেই পুলিশ গাড়িটি ছেড়ে দেয়। সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হয় গাড়ির আরোহীদের। এ সড়ক দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মামলাও হয়নি। যদিওবা আহত ব্যক্তির কন্যা পুলিশ সার্জেন্ট মহুয়া হাজং বনানী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু পুলিশই পুলিশের মামলা নিচ্ছিল না।
এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হতে থাকে। পরে সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদে জানা গেল, বিএমডব্লিউ গাড়িটি যে চালাচ্ছিল, সে এক প্রভাবশালীর ছেলে। আরও একটু আলো ফেলার পর তথ্য মিলল, সেই প্রভাবশালী দেশের উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতি। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম এবং গণমাধ্যমের নানামুখী চাপের কারণে অবশেষে বনানী থানা মামলা নিতে বাধ্য হলো। কিন্তু এই মামলার আসামি অজ্ঞাত। সেই সঙ্গে আরেকটি প্যাঁচ লাগানো হলো। ওই গাড়ির চালক মনোরঞ্জন হাজংয়ের বিরুদ্ধে বনানী থানায় একটি জিডি করেন।
মজার বিষয়, জিডি করা হয় মামলা গ্রহণ করার আগের দিন। মনোরঞ্জন হাজংয়ের বিষয়টি সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পন্ন হতে পারত। অপরাধীকে জনতা আটক করে গাড়িসহ পুলিশে সোপর্দ করেছিল। সুতরাং পুলিশ সাধারণ নিয়মে মামলার পর গাড়িটি জব্দ করে আসামিদের নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারত। মনোরঞ্জন হাজং সাবেক বিজিবি সদস্য; তার কন্যা মহুয়া হাজং ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সার্জেন্ট। সংগত কারণে আইন স্বাভাবিকের চেয়ে আরেকটু দ্রুতগতিতে অপরাধীর ওপর চড়াও হওয়ার কথা ছিল। দ্রুততম হওয়া তো দূরের কথ, পুলিশ স্বাভাবিক আইনির পথেই হাঁটেনি। বরং বনানী থানার পুলিশ উল্টো আচরণ শুরু করে।
এ ক্ষেত্রে ক্ষমতার কাঠামো এবং বিন্যাস বেশ তাৎপর্যময় ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতীয়মান। মনোরঞ্জন হাজং বিজিবির সাবেক সদস্য হলেও তিনি পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন না। তার মেয়ে মহুয়া হাজং পুলিশের তরুণ সার্জেন্ট। মহুয়া হাজংয়ের সার্জেন্ট পদবিও পুলিশ বিভাগে এত দাপুটে নয়। বরং পুলিশ সার্জেন্টের দাপট সড়কের নিরীহ যানবাহনের ওপরেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। পক্ষান্তরে মনোরঞ্জন হাজংকে যে গাড়িটি চাপা দিয়েছে, সেটি একটি বিএমডব্লিউ। গাড়ির ব্র্যান্ডই বলে দিচ্ছে, মালিক যথেষ্ট ধনাঢ্য। সেই কারণে আরোহী কিংবা মালিক প্রভাবশালী হতে বাধ্য। পরবর্তী পরিচিতি বলছে, গাড়িটির আরোহী উচ্চ আদালতের এক বিচারপতির পুত্র। মূলত এ পরিচিতিই মনোরঞ্জন হাজংকে 'আন্ডারডগ' করে ফেলেছে। মনোরঞ্জন নামটির শেষে হাজং থাকার কারণে তিনি আপনাআপনি আরও অধিক প্রান্তিক অবস্থানে চলে যান। তাহলে আমরা দেখি, দুর্ঘটনার শিকার মনোরঞ্জন হাজং প্রথমত, জাতি পরিচয়ে অধিপতি বাঙালি জাতির কেউ নন। দ্বিতীয়ত, তিনি অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য হলেও পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন না। তৃতীয়ত, তিনি একটি নিরীহ গোচের মোটরসাইকেলে ছিলেন। অন্যদিকে যার বিরুদ্ধে দুর্ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ, সেই ব্যক্তিটি পৃথিবীর অন্যতম দামি গাড়ি বিএমডব্লিউ হাঁকাচ্ছিলেন। তিনি জাতিগত পরিচয়ে বাঙালি। বাস করেন অভিজাত এলাকা গুলশানে। তার পিতা দেশের উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতি।
স্বাভাবিকভাবেই মামলার পুরো ঘটনাক্রম অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। আইন প্রয়োগের সাধারণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক গলদ পরিলক্ষিত হয়। ২ ডিসেম্বর ২০২১ এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলে দেখানো হয়েছিল। পুলিশের কাছে এ ফুটেজটি জমা হওয়ার কথা। দুর্ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত গাড়িকে আরোহীদ্বয়সহ বনানী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সুতরাং দুর্ঘটনা কে ঘটিয়েছে, সেটি সুনির্দিষ্ট। তারপরও মনোরঞ্জন হাজংয়ের ঘটনাবলি ক্ষমতার দাপুটে চরিত্রের চিরায়ত চিত্রকেই সামনে নিয়ে আসে। তাই দুর্ঘটনার রাতেই গাড়িটিকে আরোহীসহ থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মামলা গ্রহণ করা হয় না। নানামুখী চাপের পর মামলা নেওয়া হলেও আসামি অজ্ঞাত থেকে যায়। আবার সেই মামলাকে দুর্বল করার জন্য মামলার আগেই ভিকটিমের বিরুদ্ধে জিডি করা হয়।
মনোরঞ্জন হাজংকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত হচ্ছে। তিনি এক পা হারিয়ে বর্তমানে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মাসের অধিক সময় ধরে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা এত সহজ বিষয় নয়। অর্থনৈতিক মানদণ্ডে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা খুবই জটিল এবং কঠিনতম কাজ। এই সময়ে মামলার কোনো উন্নতি হয়েছে বলে আমরা শুনিনি। পুলিশ এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করেছে- এ ধরনের কোনো তথ্য আমরা পাইনি।
শুরু থেকেই পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। মনোরঞ্জন হাজংয়ের কন্যা পুলিশের সার্জেন্ট হওয়ার কারণে বারবার একটা কথা ঘুরেফিরে সামনে আসতে থাকে। পুলিশের মামলা যদি পুলিশ আমলে না নেয়, তাহলে অন্যদের বেলায় কী ঘটনা ঘটে? মনোরঞ্জন হাজংয়ের ঘটনাবলি আমাদের সুখকর কোনো বার্তা দিতে পারছে না। বরং দেশে আইনের শাসনের ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মনোরঞ্জন হাজং তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু এই রাষ্ট্রের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। রাষ্ট্রের মনোরঞ্জন করেছেন। পিতার ধারাবাহিকতায় তার কন্যাও পুলিশ সার্জেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মনোরঞ্জন হাজং এবং তার তনয়া মহুয়া হাজং- এ দুই প্রজন্ম আমাদের প্রিয় দেশমাতৃকার সেবক। সেই হিসেবে এই রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে মনোরঞ্জন হাজংয়ের সড়ক দুর্ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার। জীবনের এই সময়ে এসে মনোরঞ্জন হাজংয়ের হাসপাতালের বিছানায় অসহায় গড়াগড়ি আমাদের কারও কাম্য নয়। সরকার মনোরঞ্জন হাজংয়ের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিক। প্রয়োজনে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। মনোরঞ্জন হাজংয়ের বাকি জীবন সুন্দর করার জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
পরিশেষে এটুকু আরেকবার বলি, মনোরঞ্জন হাজং শুধু তার হাজং পরিচিতির জন্য যেন ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন। মনোরঞ্জন হাজংয়ের জন্য আইন যদি একচোখা আচরণ করে, তাহলে আইনের শাসন শুধু মুখের ফাঁকা বুলি হিসেবেই থেকে যাবে। আমরা আশাবাদী হয়ে দেখতে চাই, মনোরঞ্জন হাজংয়ের জন্য আইনের দু'চোখের সঙ্গে একটি তৃতীয় চোখও খোলা থাকুক। প্রভাবশালী হওয়ার কারণে অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায়- রাষ্ট্র এবং সরকার সেই নিশ্চয়তা প্রদান করুক; এটাই আমাদের সবার চাওয়া।
দীপায়ন খীসা :প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম
mawrum@hotmail.com