দূরপাল্লা কিংবা ঢাকার উপকণ্ঠের বাসযাত্রীদের জন্য সড়কদস্যুতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে, ফের এর সাক্ষ্য মিলেছে মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে একটি যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতদের দীর্ঘ আট ঘণ্টা ধরে নির্মমতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর আবদুল্লাহপুর থেকে টাঙ্গাইলে গন্তব্যে পৌঁছার উদ্দেশ্যে একজন চিকিৎসক তার বন্ধুকে নিয়ে ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী একটি বাসে উঠেছিলেন। ওই বাসের যাত্রীবেশী সবাই ছিল ডাকাত। তারা হামলে পড়ে ওই চিকিৎসক ও তার বন্ধুর ওপর। চালায় নির্মম নির্যাতন। এক পর্যায়ে সকালে ডাকাতরা তাদের ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে নামিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
আমরা দেখছি, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ডাকাতি বেড়ে গেছে। ১৭ জানুয়ারি বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা সোনার তরী পরিবহনের একটি নৈশবাসে ডাকাতির খবর সমকালেই প্রকাশিত হয়েছে। ওই বাসেও যাত্রীবেশে ছিল কয়েকজন ডাকাত। তারা যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নেয়। ওই ঘটনায়ও মামলা করতে গিয়ে থানা-পুলিশের চরম হেনস্তার মুখে পড়তে হয় বাসচালককে। থানার এলাকা বিভাজন বিতর্কে সাভার থানা পুলিশের ব্যাখ্যা- যেহেতু টাঙ্গাইল থেকে ডাকাতরা বাসে উঠে ডাকাতি সেরে তারা ওই থানা এলাকায়ই নামে; সেহেতু মামলা হতে হবে সংশ্নিষ্ট থানাতেই। বৃহস্পতিবারও ঘটে একই ঘটনা। যাত্রাবাড়ী থানায় ভুক্তভোগী চিকিৎসক ডা. শফিকুল ও তার বন্ধু অভিযোগ জানাতে গেলে তারা কোনো সহায়তা পাননি। উল্টো তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়, আবদুল্লাহপুর এলাকায় যেহেতু তারা ডাকাতের খপ্পরে পড়েন সেহেতু তাদের যোগাযোগ করতে হবে সেখানে! আমরা থানা পুলিশের এমন আচরণে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। দেশের যে কোনো নাগরিক অপরাধের শিকার হলে আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে কেন তাকে এমন বিড়ম্বনা পোহাতে হবে?
আমরা জানি, যে কোনো অপরাধের যদি যথাযথ আইনি প্রতিবিধান নিশ্চিত না হয় তাহলে যেমন অপরাধের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়; তেমনি অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তা ছাড়া এ প্রশ্নও সংগতই দাঁড়ায়- অপরাধীরা কি এমন অদ্ভুত নিয়মের জটিলতায় পার পেয়ে যাবে? যারা দস্যুতার শিকার হবেন তাদের নাগরিক অধিকার এভাবেই ভূলুণ্ঠিত হবে? সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর এলাকায় সড়কে যানবাহনে ডাকাতির ঘটনা নতুন নয়। ওইসব এলাকার সড়ক-মহাসড়ক সন্ধ্যার পর থেকেই সমাজবিরোধীদের চারণভূমি হয়ে ওঠার খবরও পুরোনো। আমরা জানি, সড়ক নিরাপত্তায় টহল পুলিশ নিয়োজিত। কিন্তু ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো কি তাদের উপস্থিতি কিংবা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সাক্ষ্য দেয়? রয়েছে একাধিক চেকপোস্টও। টহল পুলিশ তো বটেই, সংশ্নিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষও এমন পরিস্থিতির দায় কি এড়াতে পারে?
দূর অতীত বাদ দিলেও দেখা যায়, গত বছর দেশের সড়ক-মহাসড়কে যাত্রী কিংবা পণ্যবাহী পরিবহনে ডাকাতির অনেক ঘটনা ঘটেছে। তাতে প্রতীয়মান সড়ক-মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দস্যুরা। আমরা জানি, ডাকাতদের কবলে পড়ে যাত্রীরা সর্বস্ব খোয়ানোর পাশাপাশি হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এক সময় যাত্রীবাহী নৈশবাসে জননিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকতেন আনসার সদস্যরা। কী কারণে তাদের প্রত্যাহার করা হলো কিংবা পরিবহন মালিকরাই বা কেন এ ব্যাপারে মৌন- এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সংশ্নিষ্ট কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় যেমন প্রশাসনের তেমনি পরিবহন কর্তৃপক্ষেরও। সড়কে ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বহুপক্ষীয় দায়-এর বিষয়টি স্পষ্ট। আমরা মনে করি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের টহল জোরদার করার পাশাপাশি পরিবহন কর্তৃপক্ষেরও অধিকতর সতর্কতা জরুরি। থানার এলাকা বিভাজন বিতর্কে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও মামলা গ্রহণে যেসব প্রতিবন্ধকতা জিইয়ে আছে; নাগরিকদের বৃহৎ স্বার্থে এর নিরসন জরুরি। যে এলাকাতেই অপরাধ ঘটুক তা অপরাধই। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব অপরাধ দমন করা। এ ক্ষেত্রে কোন এলাকায় ঘটনা ঘটেছে- তা বিবেচ্য হতে পারে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে যেখানে বহুজাতিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে, সেখানে থানার 'সীমানা বিরোধ' নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা মেনে নেওয়া যায় না। আইনের প্রয়োগ 'আইল' মেনে চলতে পারে না।

বিষয় : নৈশবাসে ডাকাতি

মন্তব্য করুন