শতবর্ষ আগে আজকের দিনে (২৭ জানুয়ারি) সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় কংগ্রেস ও খেলাফত কর্মীদের বিলেতি পণ্য বর্জনের শান্তিপূর্ণ আয়োজনে গুলি করে গণহত্যা চালায় ব্রিটিশ পুলিশ। সেখানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করতে সাড়ে চার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিল বলে সরকারিভাবে বলা হলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এ সংখ্যা অনেক বেশি। এ ঘটনার তিন বছর আগে ১৯১৯ সালের ২৪ এপ্রিল পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে ৩৮৯ জন নিহত হয়েছিলেন। তখন এ নিয়ে উপমহাদেশে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশের দেওয়া 'নাইট' উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অথচ শতবছরেও সলঙ্গা বিদ্রোহের ঘটনাটি সামনে আসেনি। আসেনি আলোচনায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের একতরফা ভারতীয় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তে লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। ঠিক সেই সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রাওলাট আইন নামে একটি আইন পাস করা হয়। এ আইনবলে ভারতবাসীর ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়। পুলিশের দমন-পীড়নে ক্ষোভ দানা বাঁধে। অন্যদিকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর তুরস্কের অখণ্ডতা হুমকিতে পড়ে। মুস্তাফা কামাল তুরস্কের সুলতানকে সিংহাসনচ্যুত করলে ব্রিটিশ সরকার কামালকে সমর্থন করে। তুরস্কের অখণ্ডতা রক্ষা ও তুর্কি সুলতান বা খলিফার মর্যাদা, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রাখার দাবিতে মুসলমান নেতারা খেলাফত কমিটি গঠন করেন। কংগ্রেস খেলাফত আন্দোলনকে সমর্থন জানায়। 
মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে গণক্ষোভকে কাজে লাগাতে একটি জাতীয় প্রতিবাদ আন্দোলনের সূচনা করেন। সব অফিস ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। আইনজ্ঞরা আদালত বর্জন করেন। গণপরিবহন, ব্রিটিশ পণ্যসামগ্রী বিশেষত কাপড় বর্জিত হয়। আর খেলাফত আন্দোলনের নেতারাও গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। আন্দোলন জোরালো হয়ে ওঠে। এমন একটি বাস্তবতায় সংঘটিত হয় সলঙ্গা বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের সপ্তাহখানেক পর ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তর ভারতের গোরক্ষপুর জেলায় চৌরিচৌরার অসহযোগ আন্দোলনকারী জনতা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দিলে পুলিশ গুলি চালায়। সেখানে ২৩ জন পুলিশ ও তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন। অহিংস ও অসহযোগ চরিত্র থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করে। বলা হয়, আন্দোলন এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছিল, তা অব্যাহত রাখলে বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতে ব্রিটিশ শাসনের মেরুদণ্ড তখনই ভেঙে দেওয়া সম্ভব ছিল; ১৯৪৭-এ সমঝোতায় ইংরেজ বিদায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না।
সলঙ্গা বিদ্রোহের নায়ক সে সময়ের তরুণ কংগ্রেসকর্মী আবদুর রশীদ পরবর্তী সময়ে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ নামে খ্যাতি পেয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নিযুক্ত হন। পরে গণআজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তুলেছিলেন। আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের লেখা থেকে পাওয়া যায়, "সরকারি তদন্ত রিপোর্টে হতাহতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার বলে হিসাব পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কত শত আহত হয়ে ছুটে পালাতে গিয়ে পথঘাটে ঝোপে-জঙ্গলে মৃত্যুবরণ করেছে এবং কত শত আজও অজ্ঞাত, তার হিসাব নেই। সরকারি কোপদৃষ্টিতে পড়ে নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে কখনও মৃত্যুর কথা প্রকাশ করেনি স্বজনরা। অবিরাম গুলিবর্ষণে আর্মড পুলিশের সব গুলি শেষ হয়ে যায়। এ খবর মুহূর্তে সাধারণ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষিপ্ত, উত্তেজিত, মার খাওয়া জনতা ফালা, লাঠি, সড়কি, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে চারদিক ঘিরে সংঘবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে মুক্ত করে দিয়ে অনুরোধ করেন, 'আপনি যেমন করেই হোক জনতাকে বুঝিয়ে শান্ত করুন এবং ফিরিয়ে নিন।' "
তিনি আরও লেখেন, 'যতদূর মনে পড়ে বলেছিলাম, এখন আপনারা যদি নিরস্ত্র না হন, শান্ত না হন, তবে এ সংবাদ পেয়ে আরও পুলিশ আসবে, সৈন্যও আসবে। তারা এলে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে, নির্বিচারে হত্যা করবে, ধরে নিয়ে যাবে। এ কথা শোনার পর জনগণের ভেতর থেকে একটি বিক্ষুব্ধ কণ্ঠ ভেসে এলো, তাহলে গান্ধী রাজারে খবর দেন, সেও তার সৈন্য পাঠাক। উত্তরে বললাম, গান্ধী রাজার সৈন্য তো আমরাই। অন্য সৈন্য গান্ধী পাবেন কোথায়? তখন ভিড়ের মধ্যে শতকণ্ঠে প্রশ্ন এলো, তাহলে ওই লেজ ধরেছেন কেন?'
ইমাম গাজ্জালী: সাংবাদিক