ইউক্রেন সীমান্তে ন্যাটোর সৈন্য দলের উপস্থিতি স্পষ্টত সংকটের বার্তাবহ। ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার ইন্ধনের মাত্রা বলাই বাহুল্য। ইউক্রেনে সম্ভাব্য রাশিয়ার সামরিক হামলার শঙ্কা থেকেই আসলে ন্যাটোর পদক্ষেপ। আমরা জানি, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক ২০১৪ সালে রাশিয়াপন্থি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পতনের পর থেকে এ পর্যায়ে আসে। বস্তুত দেশটি এখন বিভক্ত। যখন রুশভাষী পূর্ব ইউক্রেনের অংশ বিদ্রোহ করে, সেখানে সহায়তা দেয় রাশিয়া। মস্কো ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।
চলমান সংকটে ইতোমধ্যে ইউক্রেনে অবস্থিত দূতাবাসকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। রাশিয়া হামলা চালানোর পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করলেও ইউক্রেন সীমান্তে সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছেন পুতিন। এদিকে, এ হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রস্তুতির খবর আমরা জানি। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্কের অন্যতম কারণ সাংস্কৃতিক। ভাষা ও সংস্কৃতিগত মিল থাকায় দুই দেশের দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক রয়েছে। রাশিয়া বরাবরই চেয়েছে ইউক্রেন ন্যাটোভুক্ত না হোক। কিন্তু পশ্চিমারা এর বিরোধী। সব প্রমাণ এটা স্পষ্ট করছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার স্বার্থের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান; যে শাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে এবং ১৯৬৮ সালে স্লোভাকিয়ায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পশ্চিমারা এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করে বরং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে।
রাশিয়ার এই মানসিকতা অন্য ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। ভদ্মাদিমির পুতিন বেলারুশ ও ইউক্রেনে পশ্চিমা জীবনাচরণে অভ্যস্ত সমাজ ও তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চান। পুতিন পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশকে বিভক্ত করে ১৯৯০ সালের ওয়ারশ চুক্তির বাইরে রেখেছেন। তিনি বিশেষ করে এই দুটি দেশকে পশ্চিমাদের কাছে হারাতে চাননি। শক্তিধরদের প্রভাববলয় এবং যে অঞ্চলে এক জাতির স্বার্থ অন্য যে কোনো স্বার্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে কূটনীতি অসহায়। ১৯৬২ সালে কিউবান মিসাইল সংকটের কথা আমরা জানি। সে সময় স্নায়ুযুদ্ধের সংকট সবচেয়ে ঘনীভূত হয়। কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে সহায়তা করেছিল। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা ওই বছরের অক্টোবরে ১৩ দিনের রাজনৈতিক এবং সামরিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র যেমন কিউবাকে সহায়তা করে, একইভাবে আমরা দেখছি, এখনও মস্কো ইউক্রেনে মার্কিন মিসাইল কিংবা সামরিক উপস্থিতি সহ্য করতে প্রস্তুত নয় এবং কিয়েভে রাশিয়াবিরোধী শাসনও পুতিন দেখতে চান না।
ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এখনও দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। রাশিয়া যদিও বলছে, ইউক্রেনে হামলার পরিকল্পনা নেই; তারপরও সেখানে সীমান্তে রাশিয়ার শক্তি বৃদ্ধির বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর পদক্ষেপ আমরা দেখছি। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুধু এ অঞ্চলেই নয়। আমরা দেখেছি, চীন এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের প্রাধান্য বিস্তারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরেও তারা প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে এটাও দেখা কঠিন, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে আসলে কী অর্জিত হলো। এদিকে ব্রিটেন দক্ষিণ চীন সাগরে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্থাপনের এক হাস্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বাস্তবতা হলো, পশ্চিমা বিশ্ব ৯০-এর দশকের ন্যাটোকে প্রসারিত করার এক পরিকল্পিত খেলা খেলছে। বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার যে প্রভাববলয়, সেখানে প্রতিবেশী হিসেবে ফিনল্যান্ডের সতর্ক ও বাস্তবোচিত নিরপেক্ষ পদক্ষেপ বিষয়ে কিছু বলার নেই। তবে সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর অবস্থান আমরা দেখেছি। যেভাবে ন্যাটো রাশিয়াকে 'ট্রিট' করেছে, তার মাধ্যমে উগ্র জাতীয়তাবাদী রূপই স্পষ্ট। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী রাশিয়া ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেৎসিন পরিবর্তন চেয়েছিলেন। এমনকি তিনি ন্যাটোর সঙ্গেও কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটি অগ্রাহ্য করা হয়। বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতা হাস্যকর। এখন আমরা তার রূপ দেখছি ভদ্মাদিমির পুতিনের মাধ্যমে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলছেন, ২০১৫ সালের মিনস্ক-২ চুক্তি বাস্তবায়ন হোক। এটি ইউক্রেনের ডোনবাস অঞ্চলে শান্তির জন্য চুক্তি। যেখানে রাশিয়ান ফেডারেশনসহ কয়েকটি পক্ষ স্বাক্ষর করে। মিনস্ক-২ এর মাধ্যমে ন্যাটোর বিস্তৃতি রোধ করে রুশভাষী ডনবাসে শান্তি আনার চেষ্টা করা হয়। জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসাডর সামান্তা পাওয়ার সে সময় মন্তব্যে বলেন, মিনস্ক ছিল একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানোর উপায়। নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শীরা সংকট উত্তরণে 'মিনস্ক' চুক্তিকে একটি বাস্তব ও স্বচ্ছ উপায় হিসেবে দেখবেন। কিন্তু এক সময়ে এ চুক্তিটি অগ্রাহ্য করা হয়, যে কারণে রাশিয়ানপন্থি ডনবাসরা শঙ্কিত। এখন ডনবাস অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনে স্বীকৃতি দিয়ে পুতিন সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলেছেন। তিনি ডনবাস সীমান্তের কাছে এক লাখ সৈন্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মোতায়েন করে রাখতে পারেন না। বস্তুত যে ভয় তিনি পাচ্ছেন, পশ্চিমা সৈন্যবাহিনী ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে হামলা করতে পারে।
এই পর্যায়ে এসে ক্ষমতার বাস্তব চিত্রায়ণ আমরা দেখছি। ন্যাটো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন হয়ে ডনবাসে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে- এটি অবিশ্বাস্য বিষয়। জার্মানি ও ফ্রান্স এখানে অংশ নিচ্ছে না। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনেরও প্রয়োজনীয় সৈন্য নেই। তাদের দিক থেকে মিসাইলের হুমকি রয়েছে বটে, কিন্তু অন্যান্য লজিস্টিক বিষয় ছাড়া এগুলো ব্যবহার করা অসম্ভব। অধিকন্তু, ইউক্রেনকে রক্ষা করতে ব্রিটেনের কোনো আবশ্যকতা নেই। এমনকি রাশিয়ার হামলা প্রতিহত করাও তার জরুরি নয়। কারণ ব্রিটেনের ইউক্রেনের সঙ্গে কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই। এমনকি ইউক্রেন ন্যাটোরও সদস্য নয়। এদিক থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল ব্রিটেনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের শক্তিমত্তা প্রদর্শন আসলে একজন একনায়কের চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ এবং যাতে তিনি তার দেশের জনগণ ও বিশ্বকে বোঝাতে চান, তিনি এখনও সক্ষম। যদি তিনি সামনে অগ্রসর হন এবং ডনবাস দখল করেন তবে বিশ্ব তার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং সেখানে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। যেটি আমরা ক্রিমিয়াতেও দেখেছি। বলা বাহুল্য, এই সংকটে শান্তি অন্বেষণের মধ্যেই রয়েছে সমাধান। ঝুঁকি কিংবা যুদ্ধ সব সময়ই অভিশাপ। এ সংকট কাটাতে সব পক্ষের ধৈর্য ধারণ জরুরি।
সায়মন জেনকিন্স: গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; ইংরেজি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক