খবরটি বেরিয়েছিল ৩ জানুয়ারি সমকালের ভেতরের পৃষ্ঠায়। হয়তো খবরটি অনেকেরই নজরে পড়েনি। বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ইলেকট্র্রনিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক বিশ্বের তরুণ সমাজকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক লেক্স ফ্রিডম্যান তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বড় কিছু করতে চান, এমন তরুণদের কী পরামর্শ দেবেন? উত্তরে ইলন মাস্ক বলেছেন, 'বেশি বেশি বই পড়তে হবে, আর নেতা হওয়ার প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে হবে। মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে।' তবে তিনি এও বলেছেন, 'মানুষের কাজে লাগবে এমন কিছু করা অবশ্য খুব কঠিন।'
ইলন মাস্কের এ পরামর্শ বিশ্বের অন্য দেশের তরুণরা কীভাবে নেবে, জানা নেই। তবে আমাদের দেশের তরুণরা তা খুব একটা খুশি মনে গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে নেতা হওয়ার বাসনায় জীবনের অন্য সব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছুড়ে ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে শুরু করেছেন, তারা তো নয়ই। আমাদের দেশে নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কমবেশি প্রায় সবার মধ্যেই রয়েছে। তাই যে যেভাবে পারে নেতা হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হচ্ছে। সমাজের প্রায় সর্বক্ষেত্রে নেতা হওয়ার এ তীব্র প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। সে পাড়া-মহল্লার সংঘ-ক্লাব, স্কুল-কলেজ কিংবা অন্য কোনো পরিচালনা কমিটি যা-ই হোক, নেতৃস্থানীয় একটি পদ বাগিয়ে নেওয়ার জন্য এক শ্রেণির মানুষের পেরেশানির অন্ত নেই। 'পদ' যেন এক সোনার হরিণ। 'তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই'- কবিগুরুর কালজয়ী এ গানের কলি যেন আমাদের সমাজে কতিপয় মানুষের নেতা হওয়ার উদগ্র বাসনায় দেদীপ্যমান। যোগ্যতা থাক বা না থাক, পদ একটা বাগাতেই হবে। সে জন্য টাকা-পয়সা, ধনদৌলত যা কিছু দরকার; অকাতরে বিলিয়ে দিতে এমন ব্যক্তিরা কার্পণ্য করে না।
একটু চোখ খুলে যদি তাকাই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে, দেখব সেখানে নেতা হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সমাজ বলুন আর রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্র, এসব সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। যদি কেউ তা অস্বীকার করেন, তাহলে বলব, তিনি হয় সত্যকেই অস্বীকার করছেন অথবা রয়েছেন বাস্তবতা থেকে বহু ক্রোশ দূরে। সমাজে নেতার অবশ্যই দরকার আছে। নইলে সমাজ চলতে পারে না, এগোতে পারে না।

এই যে আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ পেয়েছি, তা প্রতিষ্ঠা করতে নেতার অবদান কি আমরা অস্বীকার করতে পারব? সেই ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে আমাদের স্বদেশভূমিকে স্বাধীন করার আন্দোলন-সংগ্রাম-লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তো নেতারাই। এই ধারাবাহিক সংগ্রামের বাঁকে বাঁকে নেতৃত্বের বদল হয়েছে। একেকজন একেক সময় নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে আমাদের অভীষ্টে পৌঁছে দিয়েছেন। তারা নেতা হতে পেরেছিলেন বলেই আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক। তাদের কাছে আমাদের ঋণের কোনো শেষ নেই। কিন্তু প্রশ্ন, তারা কি শুধু নেতা হওয়ার জন্যই রাজনীতিতে এসেছিলেন; আন্দোলন-সংগ্রামে শামিল হয়েছিলেন? নাকি দেশ ও জাতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার প্রত্যয় নিয়ে রাজনীতিতে এসে এক পর্যায়ে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন? আমরা যদি উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে যে সত্যটি প্রতিভাত হবে, তার সঙ্গে আজকের বাস্তবতা মিলবে না। ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত যেসব প্রাতঃস্মরণীয় নেতার অবির্ভাব হয়েছে, তারা জীবনের শুরুতেই নেতা হওয়ার বাসনায় রাজনীতিতে নাম লেখাননি। সময় এবং প্রয়োজন তাদের নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেছে। আর সাধারণ মানুষ তাদের নেতৃত্বকে গ্রহণ করেছে। কারণ তারা দেখেছে, যারা নেতৃত্বে আসীন হয়েছেন, তারা ব্যক্তিস্বার্থ নয়; দেশ ও জাতির কল্যাণচিন্তাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। শুধু তাই নয়; দেশের স্বাধীনতা, অধিকারহারা মানুষের অধিকার আদায় এবং নির্যাতিত মানুষের পক্ষে তারা রেখেছেন অসামান্য অবদান। আর তা করতে গিয়ে তারা শিকার হয়েছেন শাসক-শোষকের জুলুম-নির্যাতনের।
তরুণদের নেতা হওয়ার প্রবণতা থেকে দূরে থাকার যে পরামর্শ ইলন মাস্ক দিয়েছেন, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত বা দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। তরুণদের মধ্য থেকেই তো বেরিয়ে আসবে ভবিষ্যৎ নেতা, তবে সবাই নয়। নেতা তারাই হবেন, যারা এই যোগ্যতাকে ধারণ করেন। কিন্তু আমাদের দেশে এখন যেসব তরুণ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের অধিকাংশই কর্মী থাকতে চান না; নেতা হতে চান। তারা হয়তো এটা বিস্মৃত- এই উপমহাদেশে যারা নেতা হয়েছেন, তারা কেউ এক লাফে গাছের মগডালে চড়ে বসেননি; গোড়া থেকে ধীরে ধীরে উঠেছেন ওপরে। তারা সবাই এক সময় কর্মী ছিলেন। তারা তাদের কর্মদক্ষতা আর যোগ্যতার বদৌলতে পরিণত হয়েছিলেন নেতায়। কিন্তু এখনকার তরুণরা সে পথে হাঁটতে নারাজ। তারা দ্রুত গতির কোনো যানে চড়ে পৌঁছে যেতে চায় সে মঞ্জিলে মকসুদে। এ জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে চালু হয়েছে নানা পদ্ধতি। তারই একটি হলো 'পদ বাণিজ্য'। এ শব্দযুগল বাংলা ভাষায় অধুনা সংযোজিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলের পদ নিয়েও যে বাণিজ্য চলে, তা আমাদের দেশের দলগুলোর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ না করলে অনুমান করা কষ্ট।
ইলন মাস্ক তরুণদের বেশি বেশি বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার এ পরামর্শের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই। জ্ঞান আহরণে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লেভ তলস্তয় বলেছেন, 'জীবনে শুধু তিনটি জিনিস প্রয়োজন- বই, বই আর বই।' এ উক্তি থেকে বই পাঠের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীও তার 'বই পড়া' প্রবন্ধে এর গুরুত্ব বর্ণনা করার পাশাপাশি আমাদের দেশের মানুষের বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। অবসরে একটি বইয়ের কয়েক পাতা ওল্টাতে আলস্যের সীমা নেই। রাজনীতি যারা করেন, পুস্তক পাঠ তাদের জন্য অপরিহার্য। আগে রাজনৈতিক দলগুলোতে নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন হতো। রাজনীতির পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও ছিল দলগুলোতে। এখন আর তা নেই। এখন আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মীদের বেশিরভাগ বই-পুস্তকের ধার ধারেন বলে মনে হয় না। অনেক নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি; উপমহাদেশের রাজনীতি তো দূরের কথা, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সম্বন্ধেও তারা সম্যক জ্ঞাত নন। নেতাদের বক্তৃতা-ভাষণে যেটুকু শোনেন, ততটুকু তাদের জ্ঞানের পরিধি। কেউ কেউ রুষ্ট হতে পারেন, তবে চরম সত্যি হলো, আজকের তরুণ অনেকেই মুখস্থ রাজনীতি করেন। তারা পড়াশোনার ধার ধারেন না। বই-পুস্তকের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে ভবিষ্যতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ক্রমে সুদূর পরাহত হয়ে উঠছে।
নেতা হওয়ার প্রবণতা থকে তরুণদের দূরে থাকার যে পরামর্শ ইলন মাস্ক দিয়েছেন, তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হওয়া যাচ্ছে না। তরুণদের মধ্যে নেতা হওয়ার প্রবণতা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে তা যেন সমগ্র চিন্তা-চেতনাকে গ্রাস না করে। নেতা হওয়ার লক্ষ্য থাকবে মানুষের কল্যাণ। আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে নেতা হওয়ার বাসনা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক