করোনা সংক্রমণের এ সময়ে যখন সবকিছু খোলা রয়েছে তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক এবং শিক্ষার্থীর ক্ষতি বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য। বুধবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, দেশজুড়ে গত কয়েক মাস ধরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন যেমন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি সরকারি-বেসরকারি অফিস ও কলকারখানা চালু আছে। পুরোদমে চালু আছে গণপরিবহনও। এমনকি বাণিজ্য মেলাও যেখানে বন্ধ হয়নি সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে কেন? আমরা দেখেছি, দেড় বছরের বেশি সময় পর গত সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও পুরোদমে শ্রেণি কার্যক্রম চালু করা হয়নি। এরই মধ্যে ২১ জানুয়ারি আবার দেশজুড়ে বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, করোনার ভয় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই!
করোনার কারণে শিক্ষাব্যবস্থায় যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে, সে বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। শিখনশূন্যতা তো রয়েছেই, একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ছুটি থাকায় বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাতেও জট লেগে গেছে, এতে বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, টানা বন্ধের কারণে অনেক শিক্ষার্থী হতাশায় ভুগছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও স্পষ্ট। এভাবে শিক্ষালয় বন্ধ থাকা সব মিলিয়ে শিক্ষার জন্য অশনিসংকেত।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনলাইন শিক্ষা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনলাইন শিক্ষা এখনও ভালো বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। আবার গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত অনেক শিক্ষার্থীর এখনও ডিভাইস সংকট রয়ে গেছে। এর আগেও আমরা দেখেছি, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইন কিংবা দূরশিক্ষণে অংশ নিতে পারেনি। তাছাড়া অনলাইন শিক্ষার প্রভাবে মোবাইল-কম্পিউটার ডিভাইস ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তিসহ শিক্ষার্থীদের এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আমরাও একমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলাই অগ্রাধিকারে নিতে হবে।
বলাবাহুল্য, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশ অনুসারে রাষ্টষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় সমাবেশ কিংবা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য টিকা সনদ আনতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার সুযোগ থাকে, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এমন সিদ্ধান্ত কেন বহাল থাকবে না? আমরা জানি, ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী টিকার আওতায় এসেছে। বিশেষ করে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের টিকা দিতে সরকার জানুয়ারি মাসে বিশেষ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই কার্যক্রম জোরদার করায় শিক্ষার্থীরা টিকা পেয়েছে। ১২ বছরের নিচের শিক্ষার্থীদের জন্যও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা কঠিন হবে না।
আমরা মনে করি, ইতোমধ্যে নতুন বছরে শিক্ষা প্রশাসন যেভাবে সময়সূচি নির্ধারণ করেছে অর্থাৎ সপ্তাহে এক দিন, দুই দিন কিংবা পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন শ্রেণি কার্যক্রম চালু থাকবে, তারই আলোকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা অসম্ভব নয়। তাছাড়া প্রশাসন চাইলে সংক্রমণের 'রেডজোনে' কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে পারে। আমরা দেখেছি, করোনা সংক্রমণের ঢেউগুলো মহানগরকেন্দ্রিক বেশি থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেভাবে করোনাভাইরাস ছড়ায়নি। সেখানে সংক্রমণ ক্রমাগত কম থাকলে কোনোভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা উচিত নয়। তাছাড়া গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে তাদের অনলাইনে বা বিকল্প কোনো মাধ্যমে পাঠগ্রহণ কঠিন হবে। সে জন্য সংক্রমণ বিবেচনায় যতটুকু সম্ভব গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যেতে পারে। সরকার ৬ ফেব্রুয়ারির পর আবার দুই সপ্তাহের জন্য দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, আগের মতো এভাবে গড়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নতুন বাস্তবতার আলোকে যৌক্তিক বিবেচনা প্রয়োজন।
সম্প্রতি জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে স্কুল খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে। আমরাও এর সঙ্গে বহুলাংশে একমত। সরকার যদি টানা এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তা কোনো অর্থেই ভালো ফল বয়ে আনবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রশাসন সিলেবাস কমিয়ে পাঠদান করাচ্ছে। বস্তুত সিলেবাস না কমিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ওপরই জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। দুই বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা যখন সব খোলা রাখতে পারছি, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতে পারে না।

বিষয় : কভিড-১৯ সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন