অবশেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল বলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরা এবং একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলার পেছনে মূল কারণ ছিল শিক্ষার্থীরা যাতে করোনা আক্রান্ত না হয়। ইউনিসেফের গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪টি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে এবং ১৬৮ মিলিয়নেরও বেশি শিক্ষার্থী কোনো ধরনের ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এর মধ্যে বাংলাদেশও ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে আমাদের দেশে ৩৭ মিলিয়নেরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষাবঞ্চিত হয়েছে।
গত বছর জুন থেকে সরকার শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। ফলে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার ব্যবস্থাও করা হয়। এতে করে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও অগ্রগামী হচ্ছে এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অল্প বয়সেই পরিচিত হতে পেরেছে। ব্যাপকভাবে এ কার্যক্রমের সফলতা না এলেও কিছুটা উপকার পাওয়া যাচ্ছে না, তা বলা যাবে না। এটা সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক শিক্ষার্থী এ অনলাইন শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে বিভিন্ন কারণে। অনেক গ্রামে ইন্টারনেট না থাকা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের ভয়াবহ সমস্যা, অনেক অসচ্ছল পরিবারের আধুনিক মোবাইল না থাকা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যাপারে অনেক অভিভাবকের কোনো জ্ঞান না থাকা ইত্যাদি কারণে বহু শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সময়মতো অনলাইনে ক্লাস, পরীক্ষা, থিসিস ও ইন্টার্নশিপ পেপার মূল্যায়ন, ভাইভা নেওয়াসহ রেজাল্টও প্রকাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প খরচে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এসব উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া করোনাকালে সরকারিভাবে টেলিভিশনের মাধ্যমে ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যেখান থেকে অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছে।
আইএলওর তথ্যমতে, ২০২০ সালে বিভিন্ন সময়ে ২৫৫ মিলিয়নের ওপর মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং এভাবে চলতে থাকলে ২০২১ সালেও ১৩০ মিলিয়নের ওপরে ফুলটাইম চাকরি হারাবে। বাংলাদেশের ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ বা ৪.২ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষ। ওদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেয়েও ২৮ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ বেকার। আবার যারা চাকরি করছেন তাদের মধ্যে বেশির ভাগই খুব কম টাকা বেতনে চাকরি করেন। করোনা মহামারি থেকে সৃষ্ট বেকার সমস্যা দূরীকরণে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার সুফল পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এ ধরনের উদ্যোগগুলোর মধ্যে যেমন- স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য ফ্রি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, বিসিসি জাতিসংঘের এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক ট্রেনিং সেন্টার ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় ওমেন আইটি ফ্রনটিয়ার ইনভাইট নামে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ২০১৭ সাল থেকে চালু করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৫৩৬ জন নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারকে আরও নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ এ সুবিধা তাদের হাতের কাছেই পেয়ে যায়। তথ্য আরও সহজলব্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পড়াশোনা করে, যাতে চাকরির আশায় বসে না থাকে সেজন্য উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সহজ শর্তে বিনা জামানতে তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে সঙ্গে সব রকম সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পর্যটন শিল্পসহ পিছিয়ে থাকা কিছু ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বিভিন্ন সেক্টরে যেসব বিদেশি কাজ করে সেসব জায়গায় আমাদের দেশের মানুষকে বসানোর জন্য সব রকম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা-উপজেলাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সেন্টার খুলে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে বেকার তরুণদের বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য আকৃষ্ট করতে হবে। এভাবে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে বেকার সমস্যা অনেকাংশেই দূরীভূত করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে পরিস্থিতি খারাপ হলেও সমন্বিত সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে চালু রাখতে হবে। যেমন- স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবককে ভ্যাকসিন দিয়ে দিতে হবে, একাডেমিক ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন করে ক্ষতি যেভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, সেভাবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নতুন ক্যালেন্ডার তৈরি করতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের অনুদান দিতে হবে, যাতে যোগ্য শিক্ষকরা এ পেশা ছেড়ে চলে না যান। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সবাই যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে সে ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের অ্যাসেসমেন্ট এবং পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, সে জন্য প্রেরণা জোগাতে হবে। সর্বোপরি এ ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠে যাতে আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা যায়, সেই চেষ্টাই করা উচিত। এই বৈশ্বিক মহামারি শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারাবিশ্বে ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করেছে, যা সহসাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষতি যতটা সম্ভব পুষিয়ে নিয়ে যাতে আবারও পুরো উদ্যমে উজ্জীবিত হয়ে ওঠা যায়, সে চেষ্টা সম্মিলিতভাবে করতে হবে।
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়