বঙ্গবন্ধুর লেখা এবং তাকে লেখা চিঠিপত্র আমাদের ইতিহাস পাঠ ও অনুধাবনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারে। বিশিষ্ট-বিখ্যাত মানুষের চিঠিপত্র সাহিত্য ও ইতিহাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সাহিত্য ও ইতিহাস চর্চার একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে পত্রসাহিত্য ইতোমধ্যেই বিশেষ স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের চিঠিগুলো তার বিশ্ববীক্ষার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তার 'ছিন্নপত্র' কিংবা 'চিঠিপত্র' আমাদের বাংলা সাহিত্যকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে তার সময়কেও বুঝতে সাহায্য করে। একইভাবে কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা নেহরুর চিঠি সে সময়কার বিশ্ব-বাস্তবতার এক অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলসের চিঠিগুলো তো রাজনৈতিক অর্থনীতির একাডেমিক আলোচনার বিষয়। গ্রামসির চিঠিপত্রও ইতিহাস চর্চার উল্লেখযোগ্য উপকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। জেল থেকে তার কন্যা ও স্ত্রীকে লেখা নেলসন ম্যান্ডেলার চিঠিপত্রগুলোও ইতিহাসে সমুজ্জ্বল সম্পদ।

বঙ্গবন্ধুও প্রচুর চিঠি লিখেছেন। পেয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। এগুলোতে একদিকে বঙ্গবন্ধুর ওপর দেশবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়েছে, অন্যদিকে দেশের প্রতি ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তার দায়বোধ ও আপসহীন অঙ্গীকারও ফুটে উঠেছে। তবে তার 'চিঠিপত্র' নিয়ে এখনও পর্যন্ত গভীর গবেষণা ও লেখালেখি খুব একটা চোখে পড়েনি। তার লেখা ও পাওয়া চিঠিপত্রগুলো খুব ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়ে ওঠেনি।

তিনি যে রকম অনিশ্চয়তার জীবন কাটিয়েছেন প্রতি মুহূর্তে, চিঠি সংগ্রহে রাখার মতো অবস্থাও ছিল না। তার পরও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু চিঠি সংরক্ষিত হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর আরও কিছু চিঠি আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। বঙ্গবন্ধুর চিঠিপত্র নিয়ে একটি ছোট্ট বই প্রকাশ করেছেন সত্যজিৎ রায় মজুমদার। সত্যজিৎ রায় উল্লেখ করেছেন, দরখাস্তসহ বিভিন্ন সূত্রে থেকে প্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর ৮৭টি পূর্ণ চিঠি এ-পর্যন্ত সংরক্ষণ করা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাত্র ১৬টি ব্যক্তিগত বাংলা চিঠি। বেশিরভাগ চিঠিই তিনি লিখেছেন দলীয় নেতাকর্মীদের। গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পেরেছি প্রিয়জন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, প্রিয় রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং প্রিয়নেতা মওলানা ভাসানীকে তিনি প্রচুর চিঠি লিখেছেন। তারাও তাকে অনেক চিঠি লিখেছেন। এসব চিঠির বেশিরভাগই আদান-প্রদান হয়েছে তিনি জেলে থাকা অবস্থায়। তাৎক্ষণিক সময়ের খবরাখবরই ওই সময়ের চিঠিগুলোতে বেশি। জেলখানা থেকে চিঠি লিখলে মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশও করা যেত না। কারণ জেল কর্তৃপক্ষ চিঠিগুলো পড়ে কোনো রাজনৈতিক খবর না থাকলেই কেবল প্রাপকের হাতে দিতেন। তাকে লেখা চিঠিতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার পরও এই চিঠিগুলো অমূল্য সম্পদ হিসেবে সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। একেবারে শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর ওপর যে আস্থা রেখেছিল, তা তাকে লেখা চিঠিগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে :

" ... ছয় বৎসর পূর্বের ১৯৪৬ শালের ফেব্রুয়ারি মাসে গত নির্বাচনের সময় বোয়ালমারী বাজারে আপনার প্রতিভা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলাম এবং তখনই আমার সহকর্ম্মী হইব বলিয়া হৃদয়ে আশা পোষণ করিয়াছিলাম। যদিও আমি মুসলিম লীগের একজন নগণ্য খাদেম হিসাবে এযাবৎ কাজ করিয়া আসিতেছিলাম :কিন্তু মুসলিম লীগের কার্য্যকলাপে আমি কোন দিনই সন্তুষ্ট হইতে পারি নাই। ... মুসলিম লীগের উপর এখন আর জনসাধারণের আস্থা নাই। আছে শুধু মুষ্টিমেয় কয়েকজন স্বার্থপর ও দালাল লোকদের। আপনাদের প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের উপর এখন অনেকেই আস্থা স্থাপন করিয়াছে।" [১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধুকে লেখা ফরিদপুর নিবাসী এম. এ. গফুরের লেখা চিঠি (সিক্রেট ডকুমেন্টস, ভলিউম ০২, পৃষ্ঠা ৪৯৬-৪৯৭)]

বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে বন্দি রেখেও তার ওপর জনগণের আস্থা কমানো যায়নি। জেলে বসেই তিনি তার শুভানুধ্যায়ীদের চিঠি পেতেন। বিশেষ করে তরুণদের কাছ থেকে পাওয়া তার চিঠিগুলো খুবই অনুপ্রেরণামূলক।

" ... আপনী এ বৎসর গোপালগঞ্জে মোহকমার একজন এম এল সাহেব হইবেন, এই আসাতে আমরা ছাত্রবৃন্দ এক সভা করিয়া সেই সভায় হিন্দু মুসলমান সবাই এক বাক্যে সিকার করেছেন যে মুসলীম নেতা মুজিবর রহমানের জন্য আমারা প্রাণপণে প্রার্থনা করি যাহাতে দেশের ও দুঃখ দীনের অভাব অভিযোগ না থাকে তাহার জন্য প্রাণ দিতে আমরা রাজী, চাই গরিবের দুঃখ মছোন করিতে আমারা চাই জাতী ও দেশকে বাচাইতে আমরা চাই জগতের সম্মুখে জাতীয় গৌরব রক্ষা করিতে তাহাতে আমরা জীবন দান করিব তাহার জন্য আপনী কোনই চিন্তাযুক্ত হইবেন না আল্লা আমাদের সহায় আছে ভয় কি আছে।" [কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুকে ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বরে ছাত্রবৃন্দের পক্ষ থেকে লেখা চিঠি থেকে (সিক্রেট ডকুমেন্টস, ভলিউম ০১, পৃষ্ঠা ৫০০-৫০১)]। সব স্তরের মানুষই তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন এবং চিঠি লিখে তাকে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু চিঠিপত্রে নিজেকে নিয়ে ভাবনার চেয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম সংগঠিত করায় বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। মানুষের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসাই তাকে এক নান্দনিক নেতায় পরিণত করেছিল। তার আত্মবিশ্বাসও ছিল অতুলনীয়।

" ... আমার মনে হয় আপনারা সকলে আমার জন্যে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চিন্তার কোন কারণ নাই। ... জেলখানায়ও যদি মরতে হয় তবে মিথ্যার কাছে কোন দিন মাথা নত করবো না। আমি একলা জেলে থাকাতে আপনাদের কোন অসুবিধা হবে না। কাজ করে যান খোদা নিশ্চয়ই সাহায্য করবে।" [১৯৫১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কারাবন্দি অবস্থায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠি থেকে (সিক্রেট ডকুমেন্টস, ভলিউম ০২, পৃষ্ঠা ৭৯)]


রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি বঙ্গবন্ধুর সংবেদনশীলতা ধরা পড়ে তার লেখা চিঠিপত্রে। তিনি ছিলেন খুবই বাস্তবানুগ এক রাজনীতিক। আগেভাগেই অনুভব করতে পারতেন কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সৃষ্টি হতে পারে। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তার গভীর সংযোগের কারণেই তিনি এমন করে ভাবতে পারতেন। জীবন থেকে শেখা এই গণমুখী রাজনীতিক তাই অনায়াসে আসন্ন বিপদের সন্ধান পেতেন।

স্বৈরাচারী পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা রেখেছিলেন মওলানা ভাসানীও। তাই তো এক চিঠিতে তিনি তার ওপর আস্থার কথা স্পষ্টভাবেই তুলে ধরেছিলেন। " ... পূর্ব বাংলার ৪ কোটী মজলুমের সহায় একমাত্র আল্লাহ আর তোমরা কতিপয় যুবক ছাড়া আর কেহ নাই। পদ প্রার্থী ব্যতীত নিঃস্বার্থ লোক মোটেই পাওয়া যায় না। আল্লাহ ভরসা করিয়া তোমাদের উপর দায়িত্ব দিয়া বিদায় হইলাম। সত্যের জয় মিথ্যার পতন অবশ্যই হইবে তবে ত্যাগের দরকারী। শান্তি ও ধর্ম্ম- সঙ্গে থাকে ইহা আমার অনুরোধ।" [১৯৫২-এর এপ্রিলে পাকিস্তানি সরকারের কাছে আত্মসমর্পণের আগে মওলানা ভাসানীর বঙ্গবন্ধুকে লেখা চিঠি থেকে (ভলিউম ০২, পৃষ্ঠা ১৫২)]

বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা তার সংগ্রামে সদা-সহায়ক ছিলেন। চিঠিপত্রে সে প্রমাণও মেলে। বিশেষ করে তার পিতা তাকে বরাবরই গাইড করতেন। খোকার ওপর তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। "সামসুল হক, মওলানা সাহেবকে আমাদের ঠিক রাখা কর্ত্তব্য। ... তোমরা উহাদের সহিত দেখা করিলে উহারা খুব গৌরব মনে করে। ... আমার মনে হয় ইলেকসন কখনই হইবে না। ইলেকশনের খুব তোড় জোড় করিয়া শেষে বন্ধ করিয়া রাখিবে। তুমি প্রধান মন্ত্রীর সহিত দেখা করিয়া সকলের মুক্তির চেষ্টা করিবা। সত্তর তোমার কুশল লিখিবা।" [১০ মে ১৯৫২-এ টুঙ্গিপাড়া থেকে বঙ্গবন্ধুকে লেখা তার পিতার চিঠি থেকে (সিক্রেট ডকুমেন্টস, ভলিউম ০২, পৃষ্ঠা ২০১)]

বঙ্গবন্ধুর আপসহীন সংগ্রামের কারণে তার পরিবারকে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, চিঠিপত্রে তা বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। রাজনীতির টানে তিনি এতটাই মগ্ন ছিলেন, পরিবারে নতুন অতিথি আসার খবরকেও খুব সাদামাটাভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। আর তা তিনি করতে পেরেছেন স্ত্রী রেণুর প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও বিশ্বাসের জোরে। "স্নেহের রেণু, আজ খবর পেলাম তোমার একটি ছেলে হয়েছে। তোমাকে ধন্যবাদ। খুব ব্যস্ত, একটু পর ট্রেনে উঠব। ইতি তোমার মুজিব।" [সংগ্রামে সদাব্যস্ত বঙ্গবন্ধু ১৪ মে ১৯৫৩ নিজের সন্তান হওয়ার সংবাদ পেয়ে স্ত্রীকে লেখা চিরকুটে এতটুকু লেখার সুযোগ পেয়েছিলেন]

সহযোদ্ধাদের ত্যাগের প্রতি বঙ্গবন্ধুর সংবেদনশীলতাও উঠে এসেছে তার চিঠিপত্রে। "আপনার ছেলে খালেক নেওয়াজ আজ জেলখানায় এতে দুঃখ করার কারণ নাই। আমিও দীর্ঘ আড়াই বৎসর কারাগারে কাটাতে বাধ্য হয়েছি। দেশের ও জনগণের দুঃখ দুর্দ্দশা দূর করার জন্যই সে আজ জেলখানায়। দুঃখ না করে গৌরব করাই আপনার কর্তব্য।" [কারাবন্দি সহযোদ্ধা খালেক নেওয়াজের মাকে ১৯৫২ সালের ৭ জুন লেখা বঙ্গবন্ধুর ওপরের চিঠি থেকে (সিক্রেট ডকুমেন্টস, ভলিউম ০২, পৃষ্ঠা ২৫২)]

বোঝা যায় কী গভীর ছিল এই রাজনৈতিক বন্ধন। এই গভীর রাজনৈতিক অঙ্গীকারই বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হওয়ার যোগ্যতা অর্জনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তিনি সাহসী ছিলেন। সেই সাহস আবার সমাজের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে দিতেন। আর তারই ফসল বাঙালির সুখে-দুঃখে এক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষাই রূপায়িত হয়েছে বাঙালি জাতি গঠনের রূপরেখায়। শুধু বাঙালি কেন, সারাবিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের ভরসার প্রতীকে পরিণত হতে পেরেছিলেন বিশ্ববন্ধু বঙ্গবন্ধু। নির্ভয়ে প্রাণ দিতে পেরেছিলেন এই জাতীয় বীর। তাই তো তার রক্তে এই মাটি উর্বর হয়েছে। বাংলাদেশকে দিন দিন উন্নয়নের উচ্চ শিখরে নিয়ে যাচ্ছে।

ড. আতিউর রহমান: অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর