তখন আমার বয়স মাত্র ১৬ বছর। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুলে পড়ি। সেবার আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম। এপ্রিল মাসের প্রথম কি দ্বিতীয় সপ্তায় আমাদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মার্চ মাসেই জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো; মুক্তিযুদ্ধ যার নাম। তখন আর কীসের পরীক্ষা, কীসের কী! বঙ্গবন্ধুর ডাকে ছুটলাম অস্ত্র হাতে- রামগড়ে। সে কাহিনিতে আসছি একটু পরে। তার আগে সামান্য পূর্বকথন।

১৯৬৮ সালে আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি- তখনই ছাত্র রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি। সদ্য গ্রাম থেকে শহরে আসা এক কিশোর আমি। আগ্রাবাদের কিছু এলাকা ছাড়া চট্টগ্রামের বাকি কোনো এলাকায় যেতে হলে একজন গাইডের প্রয়োজন হতো তখনও! সেই আমি কোনো এক ভরদুপুরে আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠের এক কোনায় বসে ছাত্রলীগের খাতায় নাম লেখালাম, তেমন কিছু না বুঝেই!

তবে একটি বিষয় বুঝে গিয়েছিলাম ভালোভাবে- অবাঙালিদের সাথে আমাদের মিলবে না, একসাথে বসবাস করা যাবে না! এর মাঝেই সিজিএস কলোনির অবাঙালি ছেলেদের সাথে মারামারি করেছি দু'তিন রাউন্ড! একদিন মা-বোনের কথা তুলে অবাঙালি এক ছেলে আমাকে 'অমুকের বাচ্চা' বলে গালাগাল করায় ওর মুখে দশাসই একটা ঘুসি মেরেছিলাম। সে ছেলেও প্রতি-উত্তরে কোমর থেকে 'ফাইভ স্টার ডেগার' বের করে আমার ওপর চালিয়ে দিল এক খোঁচা। কেটে গেল হাত, রক্ত ঝরল। বাঁ হাতের কব্জিতে সেই ছুরির দাগ আজও বয়ে চলেছি! সে যাক গে!

চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের এক ছাত্রনেতা- নাম তোহা গাজী; আমরা ডাকতাম গাজী ভাই বলে। তিনি ছিলেন আমার সেই সময়ের পলিটিক্যাল মেন্টর। নিউজপ্রিন্টে ছাপানো ছয় দফার লিফলেট, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র- এগুলো গাজী ভাইয়ের হাত দিয়েই পেতাম। ছয় দফা বুঝতে পারার বয়স তখনও হয়নি! তবুও বুকলেট এবং লিফলেটগুলো উল্টেপাল্টে দেখে বেশ বোদ্ধার মতো মাথা ঝাঁকাতাম। ওসব করে নিজেকে বেশ বড় এক বিপ্লবী বলে ভাবতে শুরু করেছি। আনকোরা রোমান্টিসিজম আর বলে কাকে!

'৬৯-এর উত্তাল দিনগুলোতে বড়দের সাথে মিছিলে গিয়ে নিজেকে বেশ ম্যাচিউরড আর দেশপ্রেমিক মনে হতো। উনসত্তরের জুন কি জুলাই মাসের কথা। কোতোয়ালির সামনে মিছিল থেকে পুলিশের সাথে মারামারি করতে গিয়ে সেবারে দিন চারেক জেলও খেটেছি! ফলে ছাত্র রাজনীতির ষোলকলার মাঝে দু'চার কলা এর মাঝেই পূরণ করে ফেলেছি ইঁচড়ে পাকামি করে!

একাত্তরে, মার্চের শুরুতেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল হওয়ায় দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর 'কে কাকে রোখে' অবস্থা। সকাল ১০টায় স্কুলে যাবার নাম করে বাসা থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতাম 'স্বাধীনতার স্বপ্ন' চোখে নিয়ে। রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে পরদিন সকালে আবারও মিছিল, আবারও সংগ্রাম। এই ছিল তখন একেক দিনের রুটিনের ধরন।

মার্চের ২০ তারিখের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। যুদ্ধের জন্য তখন সাজসাজ রব চারদিকে। এরমাঝে চট্টগ্রামের ১৭ নম্বর জেটি থেকে পাকিস্তানি অস্ত্রবাহী জাহাজ 'সোয়াত'-এর 'মাল-খালাস' নিয়ে শতাধিক শ্রমিক এবং সাধারণ প্রতিবাদী নাগরিক পাকিস্তানি পুলিশ এবং আর্মিদের গুলিতে মারা যায়। স্পষ্ট মনে আছে, স্কুলের বন্ধুদের সাথে আগ্রাবাদের 'জিন্নাহ রোডে' (বর্তমান বঙ্গবন্ধু সড়ক) আমরা অবরোধ বসিয়েছিলাম সোয়াতের মালপত্র পরিবহনে বাধা দিতে। আহা রে, তখন আমাদের লড়াই সংগ্রামের ছবি তুলে রাখা সম্ভব হলে আজ অনেক বড় নেতা হয়ে যেতে পারতাম (হা হা হা ...)!

অতঃপর ২৫ মার্চ একাত্তর। নিজের ওপরে সকল দায়দায়িত্ব পালন শেষে আমরা বন্ধুরা মিলে আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠের কোনে বসে পরবর্তী দিনের কর্মসূচি ঠিকঠাক করে নিতাম। ২৫ মার্চের বিকেল থেকেই জাম্বুরি মাঠে ঘোরাঘুরি করছিলাম বেশ উত্তেজনা নিয়ে। বন্ধুরা সবাই যে যার মতো করে কাজ করছে। একটু পরে আমাদের নেতা গাজী ভাই আসবে। তাকে কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে তখন।

সূর্য ক্রমশ পাটে বসছে। মিইয়ে আসছে দিনের আলো। সেদিন ক্রীড়ামোদীরা এমনিতেই জাম্বুরি মাঠের অনুশীলনে আসেনি! অন্য দিনের তুলনায় এলাকাটা খুব নীরব মনে হলো। এমন সময় গাজী ভাই এসে আমাদের নির্দেশ দিলেন যার যার বাড়ি ফিরে যেতে। পরদিন সকালে আবার কমার্স কলেজের ক্যান্টিনে এসে দেখা করতে বলে দ্রুত বিদায় নিলেন।

বলে রাখা ভালো- কমার্স কলেজ ছিল চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদের পাশে। আমি থাকতাম হোটেল আগ্রাবাদের পেছনে নবী কলোনিতে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই হাতমুখ ধুতে পড়তে বসার নামে পড়ার টেবিলে বসে আকাশ-পাতাল ভাবছি পরিস্থিতি নিয়ে। রাত ৮টার দিকে বিবিসি রেডিওতে বেজে উঠল পরিচিত সেই পুরোনো বাঁশির সুর (সিগনেচার টিউন)। বাবা 'বিবিসি' শুনছেন রেডিওর ভলিউম একটু বাড়িয়ে। যথারীতি খবর শুরু হলো পূর্ব পাকিস্তানে মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক নিয়ে। খবর পাঠক তার ভারী কণ্ঠে জানালেন-

'আলোচনা ভেস্তে গেছে, ইয়াহিয়া পালিয়ে গেছেন পশ্চিম পাকিস্তানে।'

বুকটা ধপাস করে উঠল এসব শুনে। সারাদিন এমনিতেই কী হয় কী হয় ভাব! এখন খবর শোনার পরে খুব অস্থির লাগছে! পুরো বিল্ডিংয়ে একটিমাত্র টেলিফোন আছে; মুস্তাফিজ সাহেবের বাসায়। ভদ্রলোক কাস্টমসে চাকরি করেন ছোটখাটো কোনো পোস্টে। কিন্তু টেলিফোন ম্যানেজ করে ফেলেছেন কেমন করে জানি! সে সময় খুব হাতেগোনা মানুষের কাছে টেলিফোন ছিল। সাধারণ মানুষের ভাতই জোটে না ঠিকমতো, আবার টেলিফোন! পাকিস্তানের ২২ পরিবারের শোষণের কথা তখন সবার মুখে মুখে।

মুস্তাফিজ সাহেব বেশ উচ্চ স্বরে কথা বলছেন ঢাকায়- কার সাথে জানি। ঢাকার পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করছেন।

রাত ৯টার দিকে খবর এলো, সারাদেশে টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে! কেউ কারও সাথে আর যোগাযোগ করতে পারছে না সেভাবে। এসব শুনে মাথার ভেতরে নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, সেই বয়সে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে খাবার দেওয়া হলো টেবিলে। বড় ভাবি ডাকলেন-

'খেতে এসো'।

কাঁচুমাচু হয়ে টেবিলে একটি চেয়ার নিয়ে বসলাম। সেদিনের খাবারে মাছ তরকারি কী ছিল আজ আর মনে নেই! পেল্গটে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। বাবা আর বড়দা রাজনীতি আর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কঠিন কঠিন কথা বলছেন। ওরা দু'জনেই আবার বেশ আঁতেল। বাবা ১৯২৯ সালে কলকাতা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন, আর বড়দা চট্টগ্রাম কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক।

কোনোমতে মুখে দুটো গুঁজে দিয়েই উঠে পড়লাম। হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আমরা থাকতাম তিনতলায়। ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি মানুষের বাড়িঘরে বাতির সংখ্যা অনেক কমে গেছে! চারদিকে কেমন অস্বাভাবিক এক নীরবতা। দূরে হোটেল আগ্রাবাদের উঁচু ভবনে কয়েকটা বাতি নজরে এলো। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলোকেও খুব অনুজ্জ্বল লাগছে আজ!

আমাদের নবী কলোনির কম্পাউন্ডে হঠাৎ কুঁই কুঁই করে আর্তনাদ করল একটি নেড়ি কুকুর। নিচের তলার কাজের মহিলাটি নেড়ি কুকুরের গায়ে পানি ছুড়ে মেরেছে কলতলা থেকে! বিরক্ত লাগছে কেন জানি সবকিছুতেই। ... আমাদের ভবনটি ইংরেজি এল প্যাটার্নের। উল্টোদিকে তিন তলাতেই থাকেন বাড়িওয়ালা নূর-উন-নবী চৌধুরী। তার নামানুসারেই এই কলোনির নামকরণ হয়েছে- 'নবী কলোনি'। তার ছেলে বাবুল আমার ক্লাসমেট- আগ্রাবাদ স্কুলে। বাবুলদের বাসার বারান্দায় কে যেন নড়াচড়া করছে। বারান্দার বাতিটা নেভানো। আমাদের বারান্দা থেকে নিচুস্বরে ডাক দিলাম 'বাবুল' বলে। কিন্তু না, রং নাম্বারে পড়েছে! ওটা ছিল বাবুলের বাবা নবী চৌধুরী। ভারী গলায় জানতে চাইলেন-

বাবুলকে কেন দরকার?

আমি আমতা আমতা করতে থাকি।

নবী চৌধুরী প্রায় ধমকের সুরে বললেন-

যাও ঘুমিয়ে পড়ো, শহরের অবস্থা ভালো নয়!

কোনো বাক্যব্যয় না করে আমি ভেতরে চলে আসি। মুরুব্বিদের মুখে মুখে কথা বলা তখন 'মহাপাপ'!

রুমে এসে বাতিটা নিভিয়ে দিলাম। চুপচাপ বসে আছি কিছুক্ষণ। হঠাৎ একটা ছোট্ট ঢিল এসে পড়ল জানালায়। ভাগ্যিস, জানালার নিচের অংশটি কাঠের; ওপরের দিকে দুটি ব্লকে কাচের ছাউনি। বুঝলাম বাবুলের কা ! ওটাই (ঢিল ছোড়া) ছিল আমাদের ডাকাডাকির সিগন্যাল। সন্তর্পণে বেরিয়ে এলাম বারান্দায়। ওদের বারান্দা থেকে নিচুস্বরে বলল-

'টরেগাসি বিখা, দেছা লচ।'

আমাদের গোপন কথাগুলো আমরা তখন উল্টো ভাষায় বলাবলি করতাম।

'টরেগাসি বিখা, দেছা লচ'- কথাটি উল্টো করলে দাঁড়ায়-

'সিগারেট খাবি, ছাদে চল্‌।'

আমি তখনও সিগারেট ধরিনি। 'ক্লাবস' নামে কালো রংয়ের একটি ব্র্যান্ড ছিল সিগারেটের। ঠোঁটে লাগালেই মিষ্টি একটা স্বাদ পাওয়া যেত ওই ব্র্যান্ডে! বাবুল সেগুলো টানত স্কুলে যাওয়া আসার সময়। মাঝেমধ্যে বাসার ছাদে পানির ট্যাঙ্কের চিপায় বসে বাবুল সিগারেট টানত। আমার দিকে এগিয়ে দিত প্রায়ই। বলত-

টান দে!

দু'এক টান একেবারে দেইনি- তেমনটি নয়! তবে আজকের কথা ভিন্ন। ইশারায় জানালাম-

না, খাবো না! এর মাঝেই ভেতর থেকে বড়দার গলা-

বাইরে কী করছিস, ভেতরে আয়, পড়তে বস!

উফ..., মাস্টার মানেই মাস্টার; দিনরাত পড়াশোনা ছাড়া বোঝে না কিছুই। ভেতরে গিয়ে ফিজিক্স'টা টেনে নিয়ে এলোমেলো উল্টাতে থাকি।

রাত ১১টার মধ্যে বাসার সবাই বাতি নিভিয়ে দিল। আমিও বাতি নিভিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছি। চারদিকে বিচ্ছিরি একটা নীরবতা। নীরবতার মাত্রা এতটাই বেশি যে, কান ঝাঁ ঝাঁ করছে মনে হলো! কেটে গেল আরও কয়েক মিনিট। হঠাৎ কানফাটা শব্দে একটা বিস্ফোরণ হলো। এমন শব্দ আগে শুনিনি কোনোদিন! দৌড়ে বারান্দায় এলাম। আবারও বিকয় সেই শব্দ; সাথে আকাশে আলোর ঝলকানি। একটার পরে আরও একটা, তারপরে আরও আরও ...! মনে হলো আকাশ থেকে উল্ক্কা উড়ে গিয়ে পড়ছে কোথাও! পরে জেনেছি- চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বহির্নোঙর থেকে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ 'বাবর' থেকে শেলিং হচ্ছিল স্থলভাগের দিকে। জাহাজের সেই গোলাগুলো চট্টগ্রাম শহর ছাড়িয়ে গিয়ে পড়ছিল বোয়ালিয়া কিংবা কালুরঘাটের দিকে (পরে জেনেছি)। প্রচণ্ড শিহরিত হলাম! ভয় পেয়ে গেলাম কিছুটা! এমন কাণ্ড জীবনে এর আগে দেখিনি কোনোদিন।

এর মাঝে জেগে গেছে সবাই। জানালার ফাঁক দিয়ে কিংবা বারান্দায় এসে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে অনেক বাসা থেকেই। হতভম্ব সবাই! ততক্ষণে বাবা এসে দাঁড়িয়েছেন আমার পাশে। ওপরের দিকে তাকিয়ে বুঝবার চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি। মিনিট দুই তিনেক পরে আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে ভেতরে চলে এলেন। ততক্ষণে বড়দা এসেছেন মাতব্বরি করতে! বললেন-

বিছানায় নয়, ফ্লোরে শুয়ে পড়! যেভাবে গোলাগুলি হচ্ছে, বলা যায় না কী হয়!

রাত প্রায় দেড়টা কিংবা দুটো। হঠাৎ শুনি মাইকের শব্দ। পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি দিয়েছিলেন সেটা মাইক দিয়ে পড়ে শোনানো হচ্ছিল সারা শহরে। আমাদের বাসা থেকে মেইন রোড (বর্তমান বঙ্গবন্ধু সড়ক) খুব একটা দূরে নয়। তার ওপরে সারা শহর ছিল নিস্তব্ধ। ফলে মাইকের শব্দ অনেকদূর পর্যন্ত কাজ করছিল। রাতের বাক সময়টাতে আর ঘুম এলো না চোখে। নির্ঘুম দুটো চোখ বন্ধ করে তাকিয়ে রইলাম আগামীর দিকে!

এরপরের কাহিনি মোটামুটি সবারই জানা। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নানের 'স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ' থেকে শুরু করে রফিকুল ইসলামের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ জয়- সবই লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। আজকের মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম তখন ইপিআরের অ্যাডজুট্যান্ট। টাইগারপাসে চট্টগ্রামের রেলওয়ে ভবনটি দখলে নিয়ে রফিকুল ইসলাম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন বীরত্বের সাথে।

২৭ তারিখে হালিশহরে পাকিস্তানিরা ঢুকে পড়ে নদীপথে। অবাঙালিদের সহযোগিতায় হালিশহরের নাথপাড়ায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানিরা। এরপরে ক্রমশ তারা এগিয়ে আসে মূল শহরের দিকে। ৩০ মার্চের মধ্যে পুরো চট্টগ্রাম তারা দখলে নিয়ে নেয় অবাঙালি এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সহযোগিতায়।

এপ্রিলের ২ তারিখে খুব ভোরে, সাম্পানে চড়ে আমি কর্ণফুলী পেরিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চলে আসি। এরপরে হাঁটছি আর হাঁটছি আমাদের গ্রামের বাড়ি- 'মাতারবাড়ির' পথে। বাঁশখালি, ছনুয়া, মগনামা আর উজানটিয়া হয়ে ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় আমি আমাদের গ্রাম মাতারবাড়িতে পৌঁছে যাই। এই দীর্ঘ পুরো পথটি পেরিয়েছি হেঁটে। সাথে ছিল শত শত মানুষ। নারী-পুরুষ-আবাল বৃদ্ধজন। দীর্ঘ এই পথে কেউ কাউকে চিনি না জানি না; কিন্তু কত আপন যেন- প্রতিটি মানুষ। এর মাঝে দুই দিন দুই রাত কীভাবে কেটেছে সে বর্ণনা করতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে!

আমাদের দলে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ছিল অনেক বেশি। তারা অনেকেই যাচ্ছিলেন মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরের দিকে। তারা ভেবেছিলেন- যেহেতু মহেশখালী দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ, সেহেতু পাকিস্তানিরা হয়তো সহজে ওখানে যাবে না! তাছাড়া মন্দিরে আশ্রয় নিলে ধর্মের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পাকিস্তানিরা হয়তো তাদের হত্যা করবে না। কিন্তু সব মিথ্যে প্রমাণিত করে পাকিস্তানিরা ৬ এবং ৭ মে (একাত্তরে) মহেশখালী আক্রমণ করে আদিনাথ মন্দির তছনছ করে দেয়। হত্যা করে শতাধিক মানুষ; যাদের অধিকাংশই সনাতন ধর্মের লোকজন।

মাতারবাড়ীতে এসে দেখি আমার ছোটদা মাহবুব কামাল চৌধুরী এর মাঝেই মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শুরু করে দিয়েছেন। ৩০ মার্চ তিনি এই প্রশিক্ষণ শুরু করেন। '৬৫ সালে তিনি পাকিস্তান এয়ারফোর্সে যোগ দিয়েছিলেন। ছুটিতে গ্রামে এসেছিলেন পনেরো -বিশ দিন আগে। এর মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেলে আমার ছোটদা গ্রামের ৪০-৪৫ জন তরুণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এপ্রিলের ৫ তারিখে আমিও এই দলে যোগ দেই প্রশিক্ষণের জন্য। অস্ত্র বলতে কয়েকটি একনলা-দোনলা বন্দুক আর লাঠি-সড়কি। সপ্তাহখানেক প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পরে আমরা দলবদ্ধভাবে গ্রামের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়েছিলাম।

মে মাসের ৭ তারিখে পাকিস্তানিরা আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে। মহেশখালী দ্বীপের 'ঝাপুয়া' নামের এলাকায় পাহাড়ে উঠে পাকিস্তানিরা আমাদের মাতারবাড়ীতে মর্টারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে অনবরত। বেলা তখন সাড়ে ১২টা প্রায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। আমাদের চারজনের একটি দল পাশের একটি মসজিদে লক্ষ্য রাখছিলাম- নামাজ শেষে স্বাধীনতাবিরোধীরা না আবার কিছু একটা করে বসে। কিন্তু জুমার নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো না। শুরু হলো পাকিস্তানিদের মর্টার আক্রমণ। একেকটা মর্টারশেল আমাদের গ্রামের বাড়িঘর উপড়ে নিয়ে পশ্চিমে সাগরে গিয়ে পড়ছিল।

গাদা বন্দুক দিয়ে মর্টারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কোনো প্রশ্নই আসে না! শত শত মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছিল তখন। আমিও তাদের সাথে আমাদের গ্রাম ছেড়ে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই চট্টগ্রামের দিকে রওনা দিই। গ্রামের বাড়িতে তখন মা একা; আগেই বলেছি বাবা ছিলেন তখন চট্টগ্রাম শহরে। মায়ের সাথে ছিল আমার তিনজন অবিবাহিত বোন, দুই ভাই আর কিছু কাজের মানুষ। তাদের কারও সাথেই কোনো যোগাযোগের সুযোগ পাইনি তীব্র মর্টার আক্রমণের মুখে। ঠিক যেই পথে চট্টগ্রাম থেকে মাতারবাড়ীতে গিয়েছিলাম- সেই একই পথে আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসি।

হায় রে একাত্তর! কোথাও শান্তি নেই, নেই এক ফালি আশ্রয়। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ তখন অসহায়- বর্বর পাকিস্তানিদের আক্রমণের মুখে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষ ছুটছে সামান্য আশ্রয় লাভের আশায়। এ যেন 'নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস!' কিন্তু সব সুখ, সব শান্তি তো নষ্ট করে দিয়েছে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী।

এরপরের কাহিনি এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। মে-মাসের মাঝামাঝি আবারও দেখা হয় কমার্স কলেজের সেই গাজী ভাইয়ের সাথে। তার নেতৃত্বে আমি চলে যাই রামগড়ে। সেখানে আবারও প্রশিক্ষণ হয় মুক্তিযুদ্ধের। জড়িয়ে পড়ি নিয়মিত মুক্তিবাহিনীতে।