রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমার জীবনের পরম পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে পড়তে এবং লড়তে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি। স্মৃতিকাতর হয়ে পেছনে ফেরার মতো হাজারো স্মৃতি রয়েছে এখানে। এখানেই সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপরাধে রাষ্ট্র ও মৌলবাদী চক্রের দেওয়া মিথ্যা মামলায় কারাবাস করেছি। আবার আইনি লড়াই করে আর ছাত্রসমাজের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছি।
১৯৮৭ সালে লতিফ হলের আবাসিক ছাত্র আসলাম (বাড়ি ঝিনাইদহ) রাতের বেলায় দুর্বৃত্তের হাতে নিহত হলে রাষ্ট্রীয় মদদে সে সময়ে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, জাতীয় ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নামে হত্যা মামলা হয় এবং ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষিত হয়। আসলাম হত্যাকাণ্ডের পর সাম্প্রদায়িক শক্তি মিথ্যা মামলা দিয়ে ক্যাম্পাসকে প্রায় নেতৃত্বশূন্য করে ফেলে। হত্যা মামলার কারণে নেতারা আত্মগোপন করলে শিবির বহিরাগতদের সহযোগিতায় কার্যত ক্যাম্পাস দখল করে নেয়।
টানা কয়েক মাস বন্ধের পর ক্যাম্পাস খুললে আমরা হাতেগোনা কয়েকজন ছাত্রনেতা; যাদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল না তাদের কয়েকজন প্রথম দিনই কাজলা গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করি।
আমার তখন মনে হয়েছিল, ক্যাম্পাসকে স্বাভাবিক করতে না পারলে মৌলবাদের দাপট কমানো যাবে না। সে সময় প্রাণের ভয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীরাই আমাদের এড়িয়ে চলতে থাকেন। এ অবস্থায় আমরা কিছুদিন অপেক্ষা করে রাকসু নির্বাচন দাবি করি। কেউ কেউ মনে করলেন, এটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর হলো। ছাত্রনেতারা আত্মগোপনে, অন্যদিকে শিবির ও ছাত্রদলের ক্যাম্পাসে যুগপৎ অবস্থান আমাদের আরও বিপদগ্রস্ত করে তুলবে। শিবির ও ছাত্রদল আমাদের প্রস্তাবের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রাকসু নির্বাচন দাবি করে।
একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম, রাকসু নির্বাচনের গুঞ্জনের পর থেকে হলগুলোতে আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা একটু একটু করে ভয়ভীতি কাটিয়ে সক্রিয় হতে শুরু করেন। অন্যদিকে শিবির-ছাত্রদল ফাঁকা মাঠ বিবেচনায় বেশি বেশি নির্বাচনমুখী হয়ে যায়।
এর মধ্যে মুন্না ভাই, রায়হান ভাইসহ কয়েকজন নেতা মিলে স্টেডিয়াম মার্কেটে সিলসিলার সামনে বিকেল বেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটি কর্মিসভা আহ্বান করি। ঘোষণা দিই- আমরা রাকসু নির্বাচন করব, আন্দোলন হিসেবে যার মূল লক্ষ্যই হবে নেতাদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনা। আমি একটা প্রতিশ্রুতিও দিই, যদি আমরা রাকসু নির্বাচনে জয়ী হই, তাহলে স্টেডিয়ামের সামনে অপরাজেয় বাংলার মতো একটা স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণ করব।
রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে আমরা বিপুলভাবে জয়ী হই। নির্বাচনের পর আমাদের প্রথম দাবি হয়ে পড়ে নির্বাচিত নেতৃবৃন্দকে ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনা। ছাত্রনেতাদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে প্রবল ছাত্র আন্দোলন হয়। ড. আলী আনোয়ার, হাবিবুর রহমান, হাসান আজিজুল হক, শমসের আলী, জুলফিকার মতিন, শহিদুল ইসলামসহ শিক্ষকরা সিনেট অধিবেশন বর্জন করে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। এক পর্যায়ে ছাত্ররা জামিনে মুক্ত হয়ে সিনেট অধিবেশনে যোগ দিলে ছাত্রদের প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়।
রুহুল কুদ্দুস বাবুসহ রাকসু নেতৃবৃন্দ ক্যাম্পাসে ফিরে এলে রাকসুর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আমি স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে সেটি নির্মাণের জন্য প্রথম প্রস্তাব উত্থাপন করি। সেটি আলোচনান্তে গৃহীত হয়। আমাদের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছু টাকা দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ তহবিলের সূচনা করে। এর সঙ্গে ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের ভর্তি ফরম ক্রয়ের সময় দেওয়া কিছু চাঁদা, প্রাক্তন ছাত্রদের অনুদানসহ নানাজনের অবদানে 'সাবাস বাংলাদেশ' নির্মিত হয়। জমাকৃত নকশা বাছাই করতে বাছাই কমিটির বৈঠক হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ আবদুর রাজ্জাক, হাশেম খান, রফিকুন নবীসহ শিক্ষক ও রাকসু নেতৃবৃন্দ ছিলেন।
বাছাই কমিটি সর্বসম্মতভাবে নিতুন কুণ্ডুকে এটি নির্মাণের দায়িত্ব দেয়। একই সঙ্গে তারা আমাদের বোঝায়, ভাস্কর্যটি এমন স্থানে হওয়া উচিত যেখান থেকে মানুষ পথ চলতেও তা দেখতে পায়। তারা বেশ কয়েকটি স্পট দেখে সিনেট ভবন মাঠে ভাস্কর্যটি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই মাঠেই শহীদ ড. শামসুজ্জোহা স্যারের ঐতিহাসিক জানাজা হয়েছিল।
সাবাস বাংলাদেশ স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কাদির ভূঁঁইয়া ও নাজিম মাহমুদ স্যারের অবদান অনস্বীকার্য। নিতুনদা যখন এর নির্মাণ শুরু করেন, তাকে বলেছিলাম, আমাদের দেশে মৌলবাদের টার্গেট ইট-পাথরের মিনারগুলো। আপনি এমনভাবে তা বানাবেন, যাতে রাতের আঁধারে আসা দুর্বৃত্তরা ভাঙতে ভাঙতে ভোর হয়ে যায়। একবার ভোর হলে আর ভাঙতে পারবে না। কারণ স্মারক শহীদ মিনারের প্রতি এ দেশের মানুষের অসীম আবেগ আর ভালোবাসা আছে। দাদা বলেছিলেন, দুর্বৃত্তায়নের বিষয়টি মাথায় রেখেই তিনি এটি নির্মাণ করবেন।
আমার কষ্ট, এটি যখন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম উদ্বোধন করেন, তখন আমি আসতে পারিনি। তবে ভালো লাগার বিষয় হলো, সেই ভাস্কর্য প্রাঙ্গণেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন একুশে পদকপ্রাপ্তির পর আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছে। এক জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!
এস. এম. আব্রাহাম লিংকন: একুশে পদকপ্রাপ্ত, আইনজীবী ও সমাজকর্মী; সাবেক রাকসু নেতা