পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, একটা বেজ পাওয়ার প্লান্ট তৈরি হলো। কিন্তু এ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার কৌশলের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। এখন পর্যন্ত আমরা যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করেছি, তা 'পিকিং' পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে এবং তা এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি। সন্দেহ নেই, এই পাওয়ার প্লান্টের সংখ্যা বেশি হয়ে গিয়েছিল। এর সুফল আমরা দীর্ঘ মেয়াদে পাইনি। সে ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। বেজ লোড পাওয়ার প্লান্ট যদি ইকোনমিক হয় তা পিকিং পাওয়ার প্লান্টের ব্যয় প্রশমিত করে। তবে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই হিসাবে কম ব্যয়ে বেজ লোড পাওয়ার প্লান্ট হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করলেও 'কিন্তু' আছে। এর সুফল দৃশ্যমান হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে প্রথমত এই পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর। এর ব্যয় বেশিই হবে।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমরা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাব তা চাহিদার নিরিখে কতটা কাজে আসবে। তৃতীয়, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি করা হবে। বিশ্ববাজারে কয়লা আমদানি ব্যয় যদি না কমে কিংবা বেড়ে যায়, তাহলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বেজ লোড হওয়ার পরও চ্যালেঞ্জ থেকে যাবে। যদি কয়লার আমদানি ব্যয় কমে তাহলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমরা স্বল্পমূল্যে অর্জনের সুবিধা পেতে পারি। চাহিদা আমাদের এখন তেমন একটা নেই। এমতাবস্থায় চেষ্টা করা হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গে এই বিদ্যুৎ দিয়ে সেখানকার সংকট মেটানো ও শতভাগ ব্যবহারের উদ্যোগ ফলপ্রসূ করা। যদি এ প্রচেষ্টা সফল হয় তাহলে বিদ্যুতের ব্যয় কমানোর জন্য এই কেন্দ্র সহায়ক হতে পারে। তবে সবই নির্ভর করছে ব্যবহার, এর বিতরণ প্রক্রিয়াসহ আরও কিছু বিষয়ের ওপর।
প্রশ্ন উঠেছে, যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, সে তুলনায় সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারিত হচ্ছে কিনা। এ কথা বলা দরকার, বিতরণ-সঞ্চালন লাইন নিয়ে যেসব কথা বলা হয়, সেগুলো উদ্দেশ্যমূলক। কারণ এখন পর্যন্ত বিতরণ-সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতার অভাবে বিদ্যুৎ ভোক্তা পর্যায়ে যাচ্ছে না- এমন বক্তব্য যুক্তিযুক্ত নয়। বরং অপরিকল্পিতভাবে লাইন সম্প্রসারণের কারণে ক্ষতির পরিমাণ স্ম্ফীত হয়েছে। এর মধ্যে দফায় দফায় এ ব্যাপারে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সে সবই বাস্তব চাহিদার সঙ্গে খুব বেশি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবতার নিরিখে তৈরি করা হয়নি। পরিকল্পনা সব সময় সুদূরপ্রসারী ও সর্বব্যাপী কল্যাণের বিষয়গুলো আমলে রেখে করা জরুরি। যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক ঘাটতি ছিল, তখন বিতরণ লাইন কোন যুক্তিতে সম্প্রসারিত হয়েছিল তা প্রশ্নের বিষয়। এই যে অপচয় তা তো ক্ষতিই করেছে; লাভ নয়। সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারণে চীনা কোম্পানি কাজ করছে। তা ছাড়া জাপানি কোম্পানি চট্টগ্রামে যে ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ করেছে, এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে। অনিয়ম কিংবা শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নিরপেক্ষভাবে এ বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই হয়নি। তারপর ভেড়ামারা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে ট্রান্সমিশন লাইন আনা হচ্ছে ঢাকায়, এর কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না।
উত্তর-দক্ষিণে বিদ্যুতের চাহিদা আমরা মেটাচ্ছি দুটি কানেকটর দিয়ে। সেখানে যদি বিদ্যুৎ এপার থেকে ওপারে না যায় (পদ্মার এদিক থেকে) তাহলে দেখা যাবে এপারে চাহিদা মেটানোর জন্য যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তাতে গ্যসের চাপ কমে; আর ওপারে তেলভিত্তিক উৎপাদন কেন্দ্রে যে উৎপাদন হয়, সেখানে উৎপাদন কমলে তেল খরচ কমে। তার মানে তেল খরচ আমরা কমাতে পারি। আমরা এপারের বিদ্যুৎ ওপারে নিয়ে যাচ্ছি; পায়রার বিদ্যুৎ ঢাকায় আনছি; কিন্তু চিন্তা করছি না এই আন্তঃসংযোগের দীর্ঘ মেয়াদের সুফল কী? এ রকম পরিকল্পনা দেখে প্রশ্ন জাগে, ট্রান্সমিশন লাইন সম্প্রসারণের কাজ দূরদর্শিতার সঙ্গে হচ্ছে কিনা। অভিযোগ আছে, এমন ব্যবস্থায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে যে উৎপাদন খরচ হয়, আমাদের উৎপাদন খরচ এর চেয়ে অনেক বেশি। সংবাদমাধ্যমে এমন খবর অনেকবার উঠে এসেছে। কিন্তু সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


ব্যয় বৃদ্ধি করে বিনিয়োগকারীদের লাভবান হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালাই সে সুযোগ করে দিয়েছে এবং আরও বিস্ময়কর হলো, যে কাজের আদৌ দরকার নেই, সেই কাজও করা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে যতখানি দরকার তার চেয়ে অনেক বেশি করা হচ্ছে। বিতরণ লাইন সম্প্রসারণে যুক্ত এমন কোম্পানিও পাওয়া গেছে, যেসব কোম্পানির আর্থিক লাভালাভের চিত্র গত কয়েক বছর চার গুণেরও বেশি। এই যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে তাতে এ প্রশ্নও জাগে, এসব পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের অনুমোদনে দায়িত্বশীল সংস্থা বিইআরসির ভূমিকা কী? সম্প্রতি এক গণশুনানিতে তারা বলেছে, কোনো কোনো প্রকল্প তারা অনুমোদন করেছে আবার কোনো কোনোটি করেনি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, যারা এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বা করবে, তারা তাদের মতো যেটুকু বুঝেছে, তা করছে। এর ফলে এ খাতে তারা ব্যবসার মহোৎসব চালাচ্ছে।
আমরা এসব কর্মকাণ্ডকে উন্নয়ন বলি না; বলি লুণ্ঠনের তৎপরতা। সুতরাং এসব বিষয় বৈধ করার জন্য যদি এখন অবিরত বলা হয়, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সক্ষমতার অভাবে উৎপাদন কাজে লাগানো যাচ্ছে না, তাহলে তা সত্য বলে মেনে নেওয়া যায় কি? বিদ্যমান বাস্তবতায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব অনেক বেশি, তা বলতে পারছি না। কারণ উৎপাদন এখন আমাদের চাহিদার চেয়ে বেশি। বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ রপ্তানি করার পর্যায়ে আমরা উপনীত। পিডিবিকে স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে উৎপাদিত এই মানের বিদ্যুতের রপ্তানি সহজ নয় বলেই মনে করি। তা ছাড়া আমাদের বিদ্যুৎ নেবে কে? একমাত্র মিয়ানমার ও ভারত ছাড়া এ ক্ষেত্রে ক্রেতা কে? কিন্তু আমাদের যে ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, তারা এত উচ্চ দাম দিয়ে এই বিদ্যুৎ কিনতে যাবেইবা কেন? তাদের দেশে এর চেয়ে অনেক কম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং তারা সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
তাদের কাছ থেকে আমরাই তো এর চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ আমদানি করছি। সুতরাং তারা আমাদের কাছ থেকে কোন কারণে বেশি দামে বিদ্যুৎ নিতে যাবে? বিদ্যুতের লোকসান ঠেকাতে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে ভোক্তার কাঁধে বোঝা চাপানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে সরকারের ভর্তুকি। সুতরাং এমন বক্তব্যের অবতারণা করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও আমাদের যে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে তা-ই তো আপাতত যথেষ্ট। কাজেই পায়রা বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রিক এত উচ্চাশা প্রকাশের অবকাশ আছে কি? সারাদেশ থেকে যেভাবে কৃষিপণ্য ঢাকায় ভোক্তাদের জন্য নিয়ে আসা হয়, বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও কি এমনটি যৌক্তিক? চাহিদার সঙ্গে যে উৎপাদন অসামঞ্জস্যপূর্ণ তা বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের সূচক বলা যাবে কী করে? সরকারের নীতিমালায় বলা আছে, এলাকাভিত্তিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কাজেই স্থানীয় চাহিদা এবং এর নিরিখে সরবরাহ নিশ্চিত করলে অন্য কথা। এমন ব্যবস্থায় বিদ্যুতের দামের ব্যাপারেও দফারফার সুযোগ থাকত। আরও অনেক কৌশলই নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে ঢালাওভাবে বিতরণ-সঞ্চালন লাইন যে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, এর সুফল কি মিলবে? ঢালাওভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েই বা কী লাভ? এই ডামাডোলের মধ্যে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র সবার ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে অবদান রাখতে পারবে, এমন বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করা কঠিন। অপরিকল্পিত উন্নয়নের অনেক নমুনাই আমরা দেখেছি, যা টেকসই উন্নয়ন নয়।
ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও ক্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি