প্রধান খাদ্যশস্য চালের উৎপাদন ও ভোগের হিসাব নিয়ে যে বিভ্রান্তি চলছে, তা শুধু দুঃখজনক নয়, হতাশাজনকও বটে। সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় দেশে ধান উৎপাদনের যে হিসাব দেখায়, তাকেই খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল হিসেবে দেখায়। যদিও এক কেজি ধান মানেই এক কেজি চাল নয়; ধান ভাঙানোর পর সেখান থেকে চালের পাশাপাশি তুষ, কুঁড়া বা খুদের মতো এমন কিছু উপজাত হয়, যেগুলো অন্য কাজে লাগলেও অন্তত চাল হিসেবে ব্যবহূত হয় না। আরও হাস্যকর হলো, কৃষি মন্ত্রণালয়েরই দুই সংস্থা চাল উৎপাদন সম্পর্কে দুই ধরনের তথ্য দেয়, যা আবার সরকারের আরেক সংস্থার সঙ্গে মেলে না। যেমন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলেছে, গত অর্থবছরে চাল উৎপাদিত হয়েছে তিন কোটি ৪৬ লাখ টন। আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, সংখ্যাটা হবে যথাক্রমে তিন কোটি ৮৭ লাখ টন এবং তিন কোটি ৭৬ লাখ টন। ভোগের ক্ষেত্রেও হিসাবের এ গরমিল দেখা যায়। যেমন, পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা দুই কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার টন। কিন্তু কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মতে, এ সংখ্যাটা হবে প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ টন। অন্যদিকে চালকল মালিকদের হিসাবে, দেশে বছরে চাল লাগার কথা তিন কোটি ৪ লাখ টন।
চাল উৎপাদন ও ভোগের এ বিচিত্র তথ্য যে কোনো সচেতন মানুষকেই ধন্দে ফেলে দেওয়ার কথা। সম্ভবত তেমন পরিস্থিতিতেই পড়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, যিনি বর্তমান সরকারের অর্থনীতি ও উন্নয়নসংক্রান্ত সব বিষয়ে নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, চাল উৎপাদন ও ভোগ সম্পর্কিত পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মানলে দেশে খাদ্য আমদানির কোনো প্রয়োজন থাকার কথা নয়। তাহলে কেন চাল আমদানি করতে হচ্ছে? প্রশ্নটা আমাদেরও। কারণ রেকর্ড উৎপাদনের পরও গত অর্থবছরে সাড়ে ১৩ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে। এ বছর ২৩ মার্চ পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে সাড়ে ৯ লাখ টনের কিছু বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এত আমদানির পরও রোববার ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজারে মিহি চাল বিক্রি হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা কেজি দরে। আর মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫২ টাকায়। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ তো বটেই, নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্তদেরও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ও ভোগ সম্পর্কিত এসব ভুল তথ্যের জন্য সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো একদিকে সরকার বলছে তাদের কাছে চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে এবং আমদানিও হয়েছে যথেষ্ট। এর প্রভাবে 'অচিরেই' চালের দাম কমে আসবে। কিন্তু এই 'অচিরেই' যে কবে আসবে, তা কেউ বলতে পারছে না। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই একদিকে মানুষের মাঝে সরকারি এসব আশ্বাস সম্পর্কে সন্দেহ ও অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে। আরেকদিকে সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা জাগছে।
এ কথা বলাটা হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, আরও অনেক বিষয়ের মতো সঠিক পরিসংখ্যানের গুরুত্ব নিয়ে খোদ নীতিনির্ধারক মহলে সচেতনতার ঘাটতি আছে এবং গত কয়েক দশকে দেশে চাল উৎপাদন অতীতের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়ার পরও প্রধান খাদ্যপণ্যটি নিয়ে আমরা আজকে যে সংকটে পড়েছি, তার সঙ্গে এর একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। কে অস্বীকার করতে পারবে- যে কোনো বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সংশ্নিষ্ট বিষয়ে সঠিক তথ্য। অতএব খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দেশে কতটুকু খাদ্য উৎপাদন হয় এবং তার ভোগের পরিমাণ কত তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেও শুধু চাল নয়, সব খাদ্যশস্যের বার্ষিক উৎপাদন ও ভোগের বিষয়ে সঠিক তথ্য থাকা দরকার। আশার বিষয় হলো, সরকারের উচ্চ মহলে এ বিষয়ে একটা তাগিদ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকেই কৃষিমন্ত্রী খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ বিষয়ে সব সংস্থার তথ্যকে সমন্বয় করে একটি একক তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার কথা বলেছেন। আমরা চাই কৃষিমন্ত্রীর এ প্রতিশ্রুতি দ্রুত আলোর মুখ দেখবে।

বিষয় : খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন