মুক্ত চলচ্চিত্র, মুক্ত প্রকাশ শিরোনামে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় 'সৃষ্টিশীল ধারা'র চলচ্চিত্রের যজ্ঞ, মহোৎসব। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা অঙ্গনে এই উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি। এ উৎসবের এটা ১৬তম আসর। প্রথম আসরটি বসেছিল ১৯৮৮ সালে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন ঘিরে। আজকে যারা চলচ্চিত্রের সৃষ্টিশীল ধারায় বেশ ভালো কাজ করছেন, তারা একেবারেই তরুণ তখন। তারাই মূলত সেই উৎসবের আয়োজক, তারাই ছিলেন উদ্গাতা। তরুণ সেই নির্মাতাদের শক্তি-সাহস জুগিয়েছিলেন তাদের চলচ্চিত্রগুরু আলমগীর কবির। স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিক চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির ছিলেন সেই প্রথম উৎসবের প্রথম সভাপতি। দ্বিবার্ষিক সেই উৎসবের ৩৪ বছরের মাথায় আজকের এই উৎসব ওই উদ্যোগেরই ধারাবাহিকতার ফসল। এবারের উৎসবের সভাপতি একাত্তরে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা চলচ্চিত্রকার নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং উৎসব পরিচালক চলচ্চিত্রকার ইমরান কিরমানী। সঙ্গে আছেন ফোরামের সভাপতি চলচ্চিত্রকার জাহিদুর রহিম অঞ্জন, সাধারণ সম্পাদক চলচ্চিত্রকার রাকিবুল হাসানসহ শর্ট ফিল্ম ফোরামের নতুন এবং পুরোনো কর্মীরা।
বাংলাদেশসহ ১৩০টি দেশের ৪১৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় এবারের উৎসবে। আজ এর শেষ দিন। উৎসবের অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে ছিল- বাংলাদেশ প্যানোরমা, আলমগীর কবির মেমোরিয়াল লেকচার, জাতীয় চলচ্চিত্র সংলাপ, হীরালাল সেন আজীবন সম্মাননা প্রদান, ভারতীয় চলচ্চিত্রকার আর ভি রামানির রেট্রোস্পেক্টিভ ও মাস্টার ক্লাস, সেমিনার এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র অধিবেশন।
১৯৮৮ সালে 'স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব' নামে এ উৎসবটি যখন যাত্রা শুরু করে স্বৈরশাসক এরশাদ তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। পঁচাত্তর-পরবর্তী 'নষ্ট সময়ের' কালো ধারা তখন সবেগে প্রবহমান। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর তার সব স্মারক মুছে দেওয়ার মহাযজ্ঞ চলছে তখন। রেডিও-টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে 'জয় বাংলা' বলাটা ছিল রীতিমতো এক অপরাধের বিষয়! বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ তো তখন মহাপাপ! একাত্তরে দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর কোনো ঘটনা বর্ণনা করার সময় শুধুই 'হানাদার বাহিনী' বলতে হবে, 'পাকিস্তানি হানাদার' কথাটি বলা যাবে না! 'পাকিস্তান' শব্দটি উচ্চারণ করা বারণ! আর পাকিস্তানিদের দোসর রাজাকার-আলবদর, আলশামসদের কথা উচ্চারণ করা মানে তো 'জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি' হাসার মতো বিষয়!
বিপরীত স্রোতের সেই সময়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক ধারায় পচন শুরু হয়েছে। ওই সময় 'আবে হায়াত', 'হুরে আরব', 'নাচে নাগিন' ধরনের চলচ্চিত্রগুলো বাঙালি দর্শকদের বিশেষত তরুণদের বিভ্রান্ত করার দায়িত্ব নিয়ে সফলতার সঙ্গে এগোচ্ছে। এর মাঝে স্বাধীনতাবিরোধীরা শ্যাওলা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে এই জনপদের ইতিহাসের পাতা। মুক্তিযুদ্ধ আর তরুণদের মাঝে তৈরি করেছে বিশাল এক প্রাচীর।


সেই নষ্ট স্রোতের বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে 'শর্ট ফিল্ম ফোরাম'। প্রবর্তন করে 'স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র' নামে সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্রের এক 'বিকল্প ধারা' (আসলে এটাই মূলধারা হওয়া বাঞ্ছনীয়) সেই থেকে শুরু। দেশের মাটি এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বিগত ৩৪ বছরে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে এই ধারার নির্মাতাদের হাতে। প্রতিটি চলচ্চিত্র সফল হয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। কিন্তু চলচ্চিত্রগুলো নির্মিত হয়েছে বাঙালি জাতিসত্তার দিকে লক্ষ্য এবং মাটি ও মানুষের ছন্দ আর তাদের যাপিত জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। এসব চলচ্চিত্র মানুষের সমর্থন আর ভালোবাসা লাভের পাশাপাশি দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জন করেছে মানসম্পন্ন পুরস্কার। ঋদ্ধ করেছে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন।
ভারত উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা মানিকগঞ্জের সন্তান হীরালাল সেনের নামে প্রবর্তিত 'হীরালাল সেন আজীবন সম্মাননা' পদক এবারের উৎসবে দেওয়া হয় দুই গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতাকে। উৎসবের উদ্বোধনী দিনে এই পদক তুলে দেওয়া হয় মানযারে হাসিন মুরাদ এবং তানভীর মোকাম্মেলের হাতে। পদক প্রাপ্তির অনুভূতি জানাতে গিয়ে চলচ্চিত্রকার মানযারে হাসিন মুরাদ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সাফল্যের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে ফোরামের সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
কিন্তু তানভীর মোকাম্মেল ছিলেন লড়াকু মুডে! পুরস্কারের জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি সরকার এবং চলচ্চিত্র কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কয়েকটি বিষয়ের দিকে। তিনি বলেন, তার জীবনে বড় দুটি স্বপ্ন ছিল। এক. দেশে একটি ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা, যা ইতোমধ্যে সরকার সম্পন্ন করেছে। দ্বিতীয়টি হলো, একটি 'ফিল্ম সেন্টার' গড়ে তোলা, যেখানে বছরের প্রতিটি দিন চলচ্চিত্রের 'নিয়মিত চর্চা' হবে।
তানভীর মোকাম্মেলের স্বপ্ন দুটোর সঙ্গে এ দেশের অধিকাংশ সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র কর্মীর স্বপ্নের মিল আছে। আমিও এই স্বপ্নে গভীরভাবে তাড়িত। কিন্তু স্বপ্নের প্রথম সোপান 'ফিল্ম ইনস্টিটিউট' এর মাঝে স্থাপিত হলেও কেন জানি পুরোদমে দৌড়াতে পারছে না। সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার পরও 'কর্মফল' কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করা যাচ্ছে না বলেই মনে করেন অনেকে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্বাপ্নিক মানুষ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা তিনি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে তিনি দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল মাপের কর্ম সম্পন্ন করে বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছেন 'চাইলেই' বাংলাদেশ অনেক কিছুই করতে সক্ষম। দেশের অন্য উন্নয়নের কথা উল্লেখ না করেও শুধু পদ্মা সেতুর সূত্র ধরেই বলা যায়, এই সেতুর তুলনায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অর্থায়ন 'নস্যি' মাত্র। ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে এ ইনস্টিটিউটের প্রথম কোর্সের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোর্সের প্রথম ক্লাস শুরু হয়েছিল জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ভবনে (সাময়িকভাবে)। এখনও সেখানেই ক্লাস হয়। এর মাঝেই ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণের জন্য সরকার জমি বরাদ্দ দিয়েছে, তাও বেশ ক'বছর হয়ে গেল। কিন্তু জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে লাগোয়া সেই জমির দখল আজও বুঝে নিতে পারেনি ফিল্ম ইনস্টিটিউট। জানা যায়, ওই জমিতে বাংলাদেশ বেতারের ক'জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরকারি কোয়ার্টার রয়েছে। এই সময়ের মাঝে না তাদের (বেতার কর্মকর্তাদের) পুনর্বাসন হয়েছে, না বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে। আর শিক্ষা কারিকুলামের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু অসন্তোষ তো থেকেই গেছে। শিক্ষার্থীরা চান 'পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের' এই 'ডিপ্লোমা' সনদ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু 'মাস্টার্স' ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। তাই 'মাস্টার্স'-এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানে সেই 'মাস্টার্স' কোর্স পরিচালনার কার্যক্রমের অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন দুটোই ঝুলে আছে দীর্ঘদিন! এর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
স্বপ্নের তালিকায় বাকি রইল 'ফিল্ম সেন্টার'। এই ফিল্ম সেন্টারের বাস্তবায়ন সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ আর দ্রুত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সরকার এর মাঝেই ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপনের। সেই কমপ্লেক্সে সরকার একটি করে 'সিনেমা হল' রাখতে চায়। আমার পর্যবেক্ষণ, প্রস্তাবিত এই 'সিনেমা হল'গুলোই আমাদের স্বপ্নের 'ফিল্ম সেন্টার'-এর অধিকাংশের শর্ত পূরণ করতে পারে। প্রতিটি জেলায় স্থানীয় চলচ্চিত্রপ্রেমী এবং চলচ্চিত্রকর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টায় এসব সিনেমা হলে কাঙ্ক্ষিত 'চলচ্চিত্র চর্চা' হতে পারে বলে মনে করি। এর সাফল্য নির্ভর করছে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং এর সৎ আর যথাযথ প্রয়োগের মধ্যে।
অনুমান করি, সরকারের প্রস্তাবিত কমপ্লেক্সের সিনেমা হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কাছেই থাকবে। সেটাই তো থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে বর্তমানে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ চলচ্চিত্র বিভাগ নেই, যা আছে তা 'নাট্যকলা বিভাগের' অধীনেই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু যতটা জানি, নাট্যকলা বিভাগ এমনিতেই প্রচুর দায়িত্বের ভারে ক্লান্ত। দেশে তিন শতাধিক নিবন্ধিত নাট্যদল আছে। নাটককে কেন্দ্র করে 'ফেডারেশন' এবং 'জোট' আছে দুটি। নিয়মিত নাট্যচর্চা এবং তাতে সরকারের সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্বের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পরিচালনা করে শিল্পকলার নাটক বিভাগ। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক এবং দাপ্তরিক আরও কিছু প্রাত্যহিক দায়িত্ব তো শিল্পকলার নাটক বিভাগকে পালন করতেই হয়।
এত দায়-দায়িত্বের মাঝে 'চলচ্চিত্রের' প্রতি যথাযথ দৃষ্টি প্রদান এই বিভাগের পক্ষে সদা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেটিই সংগত। তাছাড়া 'চলচ্চিত্রের বিষয়টি' চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞজন দিয়ে পরিচালনা করাটাই উত্তম। আশা করব, সরকার শিল্পকলা একাডেমিতে চলচ্চিত্রের জন্য আলাদা একটি বিভাগ তৈরি করে চলচ্চিত্রের প্রতি সুবিচার করবে। 'মুক্ত চলচ্চিত্র, মুক্ত প্রকাশ'। সব বিপত্তি পেরিয়ে চলচ্চিত্র হোক সব মত আর অনুভূতি প্রকাশের মুক্ত মাধ্যম। চলচ্চিত্র হোক জীবনের প্রকাশিত সত্য।
কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা