১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রথমবারের মতো কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ নির্বাচিত হন। নির্বাচনের বছর দুয়েক পর তিনি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সে সময় থেকে সৈয়দ আশরাফের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কাছের মানুষ হিসেবে জেলার চারজন তরুণ রাজনীতিক তার নৈকট্য লাভ করেছিলেন।

তারা হলেন- মন্ত্রীর আত্মীয় ও ব্যবসায়ী নেতা বাদল রহমান, মন্ত্রীর চাচাতো ভাই ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু, স্থানীয় পৌর মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও সদর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমদ সাদী এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ। এই চারজন সৈয়দ আশরাফের জীবদ্দশায় কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠেন। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে চারজন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের 'চার খলিফা' হিসেবে অভিহিত হতেন। শুধু তাই নয়, কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অপ্রকাশ্যে বিভিন্ন ধারা ও উপধারা থাকলেও তাদের কারণে সৈয়দ আশরাফের রাজনীতি সব ধরনের অনৈক্যের বাইরে এক মোহনায় পরিচালিত হয়েছে। চার তরুণ নেতার মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও বোঝাপড়ায় ঘাটতি ছিল না। এজন্য জেলায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাব অটুট ও অক্ষুণ্ণ ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুর পর তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে মানসিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। বন্ধুত্বে ফাটল তৈরি হলে তারা একে অন্যকে রাজনৈতিক, এমনকি ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবেও বিবেচনা করতে শুরু করেন। একসঙ্গে চলা এমনকি কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে অধ্যক্ষ শরীফ সাদীর সঙ্গে যোগ দেন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান (পরে চেয়ারম্যান) মামুন আল মাসুদ খান। ফলে কয়েক বছরে কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভেদ প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি প্রত্যেকেই আলাদাভাবে পালন করার কারণে ইউনিয়ন পর্যায়েও অনৈক্যের দৃশ্য ফুটে উঠতে দেখা যায়। মেয়র মাহমুদ পারভেজ দলীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে কাজ করছেন। অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী রাজনীতি অপেক্ষা স্থানীয় নরসুন্দা নদী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের মধ্যেই নিজের কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের চেয়ে মুক্তিযোদ্ধা যুব কমান্ডের আহ্বায়ক হিসেবেই নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক বাদল রহমান সেবামূলক কর্মকাণ্ড ও ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, এই চার নেতাকে একই ধারায় ফিরিয়ে আনতে দলীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা করা না হলে কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আগামী দিনে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও লেখক জাহাঙ্গীর আলম জাহান বলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বিভেদ দূর হওয়া প্রয়োজন। চার নেতার মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনা না গেলে জেলায় আওয়ামী লীগকে অনেক বড় মাশুল দিতে হবে। তাই তাদের মধ্যকার সব ভুল বোঝাবুঝি দূর করে আবারও ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তাদের বিভেদের কারণে জেলা আওয়ামী লীগে হাইব্রিড নেতা ও স্বাধীনতাবিরোধীদের অনুপ্রবেশ বেড়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু বলেন, সৈয়দ আশরাফ যতদিন বেঁচে ছিলেন তখন অনেকেই ব্যক্তিগত লাভের জন্য তার পেছনে ঘুরেছেন। তার মৃত্যুর পর কেউ কেউ নতুন নেতা খুঁজে নিয়েছেন। কিন্তু আমি এখনও আমার জায়গাতেই অটল আছি। রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফ প্রশ্নে আপস করব না।
অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ইমেজ বিক্রি করে আখের গোছানোর কাজ কোনোদিন করিনি। বরং তাকে বিক্রি করে যারা রাজনীতি করেছেন এবং করছেন তাদের বিরুদ্ধেই আমার লড়াই।

পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমার কাছে আদর্শের প্রতীক। আমার আজকের অবস্থানের পেছনেও তার অবদান সবচেয়ে বেশি। আমাকে তিনি ভালোবাসতেন বলে অন্যরা ঈর্ষা করতেন।

বাদল রহমান বলেন, সৈয়দ আশরাফের সততা ও নৈতিকতা আমাকেও প্রভাবিত করেছে। তার কাছ থেকেই মানুষের সেবা ও ইতিবাচক রাজনীতি করার দীক্ষা নিয়েছি।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহান ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ আফজলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।