একাত্তরের আগে, বর্তমান বাংলাদেশে 'বধ্যভূমি' বলে কোনো ভূমি ছিল না। এই জনপদের ভূমি ছিল সুজলা-সুফলা সবুজ আর উর্বরা। একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর- রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের সম্মিলিত বাহিনীই এই পবিত্র মাটিকে রক্তাক্ত করে। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষদের হত্যা করে যেসব স্থানে তারা ফেলে রেখেছিল, স্বাধীনতার পরে সেসব স্থানই 'বধ্যভূমি' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ এই ইতিহাসের অনেকটাই জানে না, কেউ কেউ জানতে আগ্রহীও নয়। ক্ষেত্রবিশেষে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কারও কারও অনীহা আছে। স্বাধীনতার ৫১ বছরের মাথায় এসে এমন পরিস্থিতি শুধু বেদনারই নয়, হতাশারও বটে।

আজ সময় এসেছে এই বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার থেকে 'ফলপ্রসূ উদ্যোগ' গ্রহণের। পরিবারের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান জগতে আর দ্বিতীয়টি নেই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অনেক পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্লিপ্ততা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসবিমুখ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী 'ফলপ্রসূ' প্রচার-প্রচারণা। খুব সুকৌশলে তারা এই কাজগুলো করে চলেছে।

অথচ আমাদের সুযোগ ছিল পাকিস্তানি এবং তাদের দোসরদের 'গণহত্যার' বিষয়টির পাশাপাশি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস যুক্তিযুক্তভাবে নতুনদের কাছে তুলে ধরার। প্রথমে বধ্যভূমির কথাই ধরি। গত ৪০ বছরে আমি শতাধিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে শুধু মুক্তিযুদ্ধ বিষয়েই প্রায় গোটা চল্লিশেক প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছি। সম্প্রতি 'বধ্যভূমিতে একদিন' নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে দেশের প্রায় ১৪৮টি বধ্যভূমিতে কাজ করেছি। তাতে দেখেছি, পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষদের হত্যা করে হয় কোনো পাতকুয়ায় ফেলে স্লাব দিয়ে ঢেকে দিয়েছে; নতুবা কোনো জলাশয়, জলাধারে নিক্ষেপ করেছে কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। তারা ভেবেছে, এতে করে তাদের নরহত্যার চিহ্ন বুঝি মুছে গেল।

কিন্তু ধর্মের কল আপনি নড়ে। বাহাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত অনেক বধ্যভূমি বাংলাদেশের মাটিতে আবিস্কৃত হয়েছে- যার সংখ্যা এক হাজার থেকে পনেরোশর কম নয়। অন্যান্য বধ্যভূমির কথা আপাতত বাদ দিলেও ১৯৯৮ সালে ঢাকার মিরপুরে নূরী মসজিদ প্রাঙ্গণে 'মুসলিমবাজার বধ্যভূমি' এবং মিরপুর বেনারসিপল্লির পেছনে কালাপানি নামক স্থানে 'জল্লাদখানা বধ্যভূমি'তে যে পরিমাণ মাথার খুলি এবং মানুষের হাড়গোড় উদ্ধার হয়েছে, তার সংখ্যা বিস্ময়কর।

ঢাকার এই 'জল্লাদখানা' বধ্যভূমিটি লোকালয় থেকে দূরে হওয়ার কারণে এখানে মিরপুরের অবাঙালি অধিবাসীদের মধ্যে যারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল তারা এবং দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী সম্মিলিতভাবে বাঙালিদের ধরে নিয়ে গিয়ে সেখানে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। 'জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে' অনেক ক্ষেত্রেই খুব নৃশংসভাবে বাঙালিদের হত্যা করা হয়েছে। কোনো কোনো মানুষের গলা কেটে ফেলা হয়েছে, ছুরি দিয়ে জবাই করা হয়েছে। অনেক সময় ধড় এবং মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।


৯ মাসের নৃশংসতায় 'জল্লাদখানার' জলাধারটি নরমুণ্ড এবং নরকঙ্কালে ভরে উঠেছিল। সেই জল্লাদখানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ওই জলাধারের কাদাপানির মধ্য থেকে প্রায় ৬৭টি নরকঙ্কাল এবং মানুষের কয়েক হাজার অস্থিখণ্ড উদ্ধার করে। উল্লেখ্য, এই জল্লাদখানা বধ্যভূমি থেকে ১৯৭২-এ কয়েক ট্রাক মানুষের দেহাবশেষ তোলা হয়েছিল। সেই দেহাবশেষগুলো সাভারে (জাতীয় স্মৃতিসৌধ) নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাভারে এগুলোর যথাযথ সংরক্ষণের কাজটি আর করা হয়নি। কেন সেই কাজটি সম্পন্ন হয়নি, কারা, কী কারণে এ কাজ সম্পন্ন করেনি- সেই প্রশ্নটি এ যাবত খুব একটা উচ্চারিত হয়নি। পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরে বাংলাদেশ তো উল্টোপথে যাত্রা শুরু করল। ফলে শহীদের স্মারক সংরক্ষণ কিংবা বধ্যভূমি সংরক্ষণের কাজটি আর যথাযথভাবে হয়ে ওঠেনি বিগত সময়ে।

পরিতাপের বিষয়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী 'নষ্ট সময়ে' যতগুলো সরকার এসেছে, তারা প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে পুঁজি করেই সরকার পরিচালনা করেছে এবং সংগত কারণেই তারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো মুছে ফেলার জন্য, স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস চাপা দেওয়ার জন্য সব রকমের চেষ্টাই করেছে। যে কোনো মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে কিংবা বৈভবে যতই সমৃদ্ধ হোন না কেন, তিনি যদি নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাহলে তার একটি মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা থাকবেই। কোনো উপকরণগত সমৃদ্ধি দিয়ে, কোনো ব্যক্তিগত উৎকর্ষ দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। ইতিহাস জেনে নিজেদের শিকড় নিয়ে গৌরববোধই কেবল এই শূন্যতা পূরণে নিয়ামক হতে পারে।

তবে আমাদের এবং আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদেরও স্মরণ রাখা উচিত (বিনীতভাবে বলছি), আমরা যদি ইতিহাসের উপাদানগুলো সঠিকভাবে রেখে যেতে না পারি, তারা তো (নতুন প্রজন্ম) একদিন আমাদের প্রজন্মকেই দোষারোপ করবে। ইতিহাসের 'রিলে রেসে' আমরা হেরে যাব, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস হারিয়ে যাবে কালের স্রোতে।

আরেকটি বিষয়ের দিকে একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের লেখাটি সমাপ্ত করতে চাই। 'স্বাধীনতার দলিলপত্রের' অষ্টম খণ্ডে দাশিন নামের এক জমাদারের (পরিচ্ছন্নকর্মী) সাক্ষাৎকারে উল্লেখ আছে- বগুড়ায় রেলস্টেশনের পাশে এসডিইওর পরিত্যক্ত বাসস্থানের পাতকুয়ায় তিনি (দশিন জমাদার) নিজের হাতে শ চারেক বাঙালির লাশ চাপা দিয়েছেন পাকিস্তানিদের বন্দুকের নলের মুখে। ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্থানীয় ক'জন মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী তরুণের উদ্যোগে সেই পাতকুয়াটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খবর পেয়ে আমিও দলবল নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম আমার প্রামাণ্যচিত্র 'বধ্যভূমিতে একদিন'-এর অংশ হিসেবে ওই বিষয়টি ধারণ করতে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের স্থানীয় ব্যুরোপ্রধান হাসিবুর রহমান বিলু সেদিন বেশ প্রণিধানযোগ্য একটি কথা বলেছিলেন আমাদের ক্যামেরার সামনে।

বিলু বলেন, "আজ হয়তো আপনি এখানে কূপের মধ্যে লাশের সন্ধান পাচ্ছেন- এরপর কিন্তু 'ওরা' এই ভুলটি আর করবে না। লাশের কোনো অস্তিত্বই রাখবে না ওরা। আগুন দিয়ে আপনার লাশটাও জ্বালিয়ে দেবে, যাতে আর কোনো প্রজন্ম এসে কোনো কিছু যেন খুঁজে বার করতে না পারে। আপনি আজকে কোনো হাড়গোড় খোঁজার একটি সুযোগ পাচ্ছেন, তখন কিন্তু তাও আর পাবেন না। সুযোগ পেলে আপনাকে হত্যা করে ওরা কূপের মধ্যে রেখে যাবে কিংবা কবর দিয়ে যাবে- এই ভুল (?) কিন্তু 'ওরা' আর করবে না। কারণ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো ২০০ বছর পরে ইতিহাস লেখার চেষ্টা করবে নানা উপাদান নিয়ে। তখন তো আবার কূপ খোঁড়া হতে পারে। সুতরাং, কূপ কিছু নয়, মেরে ছাই করে দেবে- যাতে পানির সঙ্গে মিশে যায় কিংবা বাতাসের সঙ্গে উড়ে যায়। এটা কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে।"

বাঙালি বীরের জাত। একাত্তরে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীরা আবার একটি 'একাত্তর' তৈরি করতে পারবে- এমনটি আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু 'সাবধানের মার নেই' কথাটিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট এবং তৎপরবর্তীকালে স্বাধীনতাবিরোধীদের 'কর্মকাণ্ড' কিন্তু সাংবাদিক বিলুর কথার পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। কথায় বলে, 'প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর'। কথাটি স্মরণে থাকলে আগামীতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে মুক্ত থাকা যাবে বলেই বিশ্বাস করি।

নতুন প্রজন্ম আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের আলোয় আরও বেশি আলোকিত হোক। আরও সমৃদ্ধ, আরও শক্তিশালী হোক মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্রে- এটাই প্রত্যাশা।

কাওসার চৌধুরী: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা