কয়েক দিন আগে দেশের বিশিষ্ট সংস্কৃতিজন সন্‌জীদা খাতুনের হাতে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ চতুর্থ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী পুরস্কার তুলে দেওয়ার পর নতুন করে পুরস্কার সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সন্‌জীদা খাতুন যে অবস্থানে আছেন, তাকে ভারতের দ্বিতীয় জাতীয় সম্মাননা 'পদ্মবিভূষণ' দেওয়া উচিত ছিল। এখানে উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তাকে 'রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার' ও 'দেশিকোত্তম পুরস্কার' প্রদান করেছে। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে 'রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য' উপাধিতে ভূষিত করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ আমাদের গুণীজনকে পুরস্কৃত করেছে। তারা তা না করলেই বা কী?

সন্‌জীদা খাতুন বাংলাদেশের নাগরিক। কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা। দেশের সংস্কৃতি নির্মাণ ও শুদ্ধ সংস্কৃতি অনুশীলনে ছয় দশক ধরে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। ষাটের দশকে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে এখানে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির আন্দোলনে তিনি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। যে আন্দোলন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শিকড়ে শক্তি জুগিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিল সন্‌জীদা খাতুনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংগীতে রয়েছে অসামান্য অবদান। কিন্তু নব্বই ছুঁই ছুঁই এ মানুষটিকে কি আমাদের সরকার আজও দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারটি দিয়েছে? তাদের যোগ্যতার মাপকাঠিতে সন্‌জীদা খাতুন কি এখনও উত্তীর্ণ হন না? ১৯৯১ সালে তাকে সংগীতে একুশে পদক দেওয়া হয়েছিল। তা এরশাদ সরকার ও বিএনপি সরকারের মধ্যবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে।

সন্‌জীদা খাতুনকে আজ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বীকৃতি স্বাধীনতা পুরস্কার সম্পর্কে আরও কিছু কথা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ৯৩ বছর অতিক্রম করা আহমদ রফিক, মুস্তাফা মনোয়ার- এমনি আরও বহু নাম যুক্ত করে তালিকা লম্বা করা যাবে, যারা কোনো সরকারের কাছেই স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হন না। আমির হামজারা কেন সরকারের কাছে যোগ্য হন? তার মৃত্যুর পরে, বছর দুই আগে তার লেখা বলে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একটি হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হলেও একজন আমলার পিতা। তাই সম্পূর্ণ অজ্ঞাত, অখ্যাত হলেও তিনি যোগ্য বলে বিবেচিত হন; তাও আবার সাহিত্যে।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান শর্ষিনার পীর রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী মাওলানা আবু জাফর মো. সালেহকে 'জনসেবা'র জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছিলেন। পরে ১৯৮৫ সালে এই ব্যক্তিকেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ 'শিক্ষা'য় অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার দিলেন। আমরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার

প্রদানের এ চিত্রে বুঝতে পারি শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র; তাদের রাজনীতি। সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে, আজকের শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র, রাজনীতি কতটা তা থেকে আলাদা হতে পেরেছে?

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা, ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদকে ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের জন্য সরকার মনোনীত করেছিল। কিন্তু তিনি তা নেননি; প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। স্বাধীন দেশে যে পুরস্কার স্বাধীনতাবিরোধীদেরও দেওয়া হয়, তার আর মূল্য থাকে না। অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের এ সম্মানজনক পদক ও পুরস্কার প্রদান করে রাষ্ট্রীয় এ সম্মাননার গুরুত্ব ক্রমাগত কমিয়ে ফেলা হয়েছে। যেখানে দলীয় আনুগত্য সর্বোচ্চ যোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়, সেখানে গুণীজনের স্থান থাকে না। আর এখন সবই আমলানির্ভর। আমলারাই এসবের নিয়ন্ত্রক।

আমাদের যারা আলোকবর্তিকা হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন; পুরস্কার-পদকে তাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু যখন দেখি, সারাজীবন দেশ ও মানুষের সাধনা করা এসব মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের নিদারুণ অবহেলা, তখন নানা প্রশ্ন তৈরি হয়- মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কতটা মুক্তবুদ্ধির কাছে নিতে পেরেছে; মানবিক করেছে; দেশ কতটা আমাদের হয়েছে। এ যুদ্ধ আর কতদিন চলবে!

রফিউর রাব্বি: লেখক ও নাগরিক অধিকারকর্মী