২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের প্রথম জাতীয় কনভেশন অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে পেশাজীবীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রাঙ্গণজুড়ে পেশাজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ মানুষের ভিড়, সে কারণে উৎসুক পেশাজীবী-জনতা-গণমাধ্যম। একে একে এলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা, ড. কামাল হোসেন, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, গণতন্ত্রী পার্টির আজিজুল ইসলাম খান, সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির জাকির হোসেন এবং জাতীয় পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ প্রমুখ। এক গভীর স্বপ্ন আর আশা নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে তাদের দেশ রক্ষার ২১ দফা উত্থাপন করা হলে যা হাত তুলে সমর্থন করলেন উপস্থিত সব জাতীয় নেতৃবৃন্দ।

আমরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওয়াদা করলাম, শপথ নিলাম। ঐক্যের ওই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে উপস্থিত পেশাজীবী জনতা দীর্ঘক্ষণ করতালিতে ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন প্রকম্পিত করে তোলে। জনতার উল্লাসধ্বনির মধ্যে শেখ হাসিনা বলেন, 'আগামী দু-চার দিনের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পৃথকভাবে এবং একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।' মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এ ঐতিহাসিক ঐক্যের সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। সংবাদমাধ্যমে ওঠে আসে ওই ঐতিহাসিক ঘটনা। বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড়। দেশের মানুষ এতে উদ্বুদ্ধ হয়, উৎসাহিত হয় এবং নতুন করে আশায় বুক বাঁধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের স্বপ্নে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের সময় দেশে চলছিল সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতি, অব্যবস্থা, উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান, নারীর প্রতি বৈষম্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনের দলীয়করণ। এমনি এক সর্বগ্রাসী হতাশাজনক পরিস্থিতিতে দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শক্তিকে বিকল করতে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয় ২১ আগস্টের পৈশাচিক ঘটনা তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে। শহীদ হন আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী। দেশের সেই রক্তাক্ত ক্রান্তিলগ্নে জনগণের সচেতন অংশ হিসেবে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদের সমন্বয়ে গণতন্ত্র ও প্রগতির পক্ষের সব জাতীয় পেশাজীবী সংগঠনগুলো মিলিত হয়ে ২০ ও ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশনে 'পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ' গঠন করে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস সামনে রেখে ১৩ ডিসেম্বর ২০০৪ সালে ঢাকাস্থ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে 'পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ' আত্মপ্রকাশ করে। ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদকে কনভেনর এবং আমাকে সদস্য সচিব করে এবং দেশের জাতীয় পেশাজীবী নেতৃবৃন্দকে অন্তর্ভুক্ত করে ৬৩ সদস্যের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর গোটা দেশের পেশাজীবীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা, ড. কামাল হোসেন, বাম জোট ও জাসদের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্নভাবে আলোচনা করা হয়। আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা। এর ফলশ্রুতিই হচ্ছে ৩০ আপ্রিল, ২০০৫। সব রাজনৈতিক দল পেশাজীবীদের ২১ দফা দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় এবং পরে ১৪ দলের ২৩ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের ৯ দফায় পেশাজীবীদের ২১ দফা বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ (প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক), বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন। পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ আত্মপ্রকাশ হওয়ার পর থেকেই তৎকালীন সরকারের প্রতিটি গণবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন, গোলটেবিল বৈঠক, অবস্থান কর্মসূচি, বিবৃতি প্রদান, সংবাদ সম্মেলনসহ নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে আন্দোলন গড়ে তোলে। ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেশের পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের এক বিশাল সমাবেশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল পরিষদের প্রথম উন্মুক্ত সমাবেশ। ১৪ দলকে সুসংহত রাখতে পরিষদ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিষদ দেশব্যাপী দীর্ঘসময় বিশেষ কর্মসূচি পালন করে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ৬৬, ৬৯, ৭০-এর নির্বাচন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-পরবর্তী পরিস্থিতিতে, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে, ৯৬-এর ভোট ও ভাতের অধিকারের আন্দোলনে, ১/১১-এর পরবর্তী সময়সহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এ দেশের পেশাজীবীদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে নেই, পাশাপাশি থেমে নেই পেশাজীবীদের ভূমিকা। যখনই প্রয়োজন হয় রাজপথে নেমে আসে পেশাজীবী সমাজ তাদের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে- মুক্তিযুদ্ধের চেতনার, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পাহারাদার হিসেবে। দেশে-বিদেশে আবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ষড়যন্ত্র হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের হাজার বছরের সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিনাশ করা যাবে না, হয়তো সাময়িকভাবে অস্থিতিশীল করতে পারে। বাংলার সমাজ কখনও মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দেবে না। যে কোনো অপতৎপরতা মোকাবিলা করার জন্য আবার নতুন করে চাই মুক্তিযুদ্ধের সব পক্ষের ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য। একটি উন্নত, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া আমাদের সবারই দায়িত্ব।

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান: সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; মহাসচিব, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ
kamrulkhn@gmail.com