ছাত্রাবস্থায় আমার একটা পরিশ্রমের পড়া ছিল ফরাসি ঔপন্যাসিক রমাঁ রোঁলার কালজয়ী উপন্যাস জাঁ ক্রিস্তফ পাঠ করা। তেমন আর কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে একটি চরিত্র সম্পর্কে লেখকের একটি মন্তব্য। চরিত্রটি সম্ভবত ক্রিস্তফই; যে কিছুদিন শপথ নিল- খুব মিতব্যয়ী হয়ে চলবে। ফলে তার কঞ্জুসি সিদ্ধান্ত তার বেহিসেবি স্বভাবের ওপর প্রচুর নিম্নচাপের সৃষ্টি করল। তারপর একদিন সে তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়ে এমনভাবে খরচ করল, সে হয়তো ওই কঞ্জুসি সিদ্ধান্ত না নিলে এর চেয়ে কম খরচ করত।

গত দুই বছর ২০২০ এবং ২০২১, অতিমারির আক্রমণে লোকজন ঠিকমতো ঈদ উৎসব পালন করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে এই বছর তারা ক্রিস্তফের মতোই বেহিসেবি খরচে নামবে এবং নেমেছে যে, তার বিবরণ আমরা প্রতিদিন খবরের কাগজে পড়ছি ও টিভিতে দেখছি। এমনকি আমার শান্তশিষ্ট প্রকৃতির গৃহিণী প্রতিদিন ইফতারের সময় কথাবার্তায় বলছে, ঘরের রং করানো হয়নি অনেক দিন; সোফার তোশকগুলো ফেঁসে গেছে; পর্দার রং জ্বলে গেছে; রান্নাঘরের কেবিনেট পোকায় কাটছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, এর যে কোনো একটাতে হাত দিলে লাখ টাকার ধাক্কা। আমার স্ত্রী হয়তো মানলেন। কিন্তু বাংলাদেশের সব স্ত্রী তা মানবেন- এমন কথা নেই এবং সব স্বামীও যে আমার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন, তাও নয়।

ঈদের ধর্মীয় আবেদন ব্যতিরেকে এর মূল তাৎপর্য অর্থনীতির মূল একটি সূত্রের মধ্যে নিহিত। সেটা হলো, কাট ইয়োর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর ক্লথ। এ কথাটা অবশ্য পুরোনো দিনের। এখন বলা হয়, বাই ইয়োর ক্লথ অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর নিড- নিজের প্রয়োজন মোতাবেক কাপড় ক্রয় করো। কিন্তু এখানেই লেগে গেল ফ্যাকড়া। প্রয়োজনের সংজ্ঞা তো অনির্ধারিত। অর্থাৎ ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে তফাত; মানে আপেক্ষিক। কারও কাছে একটি বিছানার চাদর জোগাড় করা হচ্ছে প্রয়োজন মেটানো। আবার কারও কাছে একটি এসি লাগানোই হচ্ছে এই গরমের দিনে অত্যাবশ্যক। ঈদ তাই আমাদের একটি চিরকালীন দ্বন্দ্বের মুখোমুখি করে ফেলে- কত আছে, কত খরচ করা যাবে?

প্লাস্টিক অর্থনীতি অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের ভূমিকা এই চাওয়া ও পাওয়ার দ্বন্দ্বযুদ্ধে শেকসপিয়রের অন্যতম ভিলেন ইয়াগোর মতো কাজ করে। ইয়াগো একদিকে তার বস ওথেলোকে যেমন বশ করে এই বলে, ধরিত্রীর মধ্যে সে ওথেলোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু; অন্যদিকে ওথেলোর কানে ফুসলায়- ওথেলোর বউ ডেসডিমোনা হয়তো ক্যাসিওর সঙ্গে প্রেমে মত্ত। ক্রেডিট কার্ডও সব সময় বিপদের সময় বা স্বাভাবিক সময়ে পাশে এসে দাঁড়ায় ইয়াগোর মতো বিশ্বস্ততা নিয়ে। কিন্তু মাস শেষে যখন ইনস্টলমেন্ট দেওয়ার তারিখটা পড়ে তখন মনে হয়, ক্রেডিট কার্ড ইয়াগোর প্ররোচনা অনুযায়ী নিজের স্ত্রীর ওপর বিশ্বাস হারানোর মতো কাজ করছে। অর্থাৎ যে ক্রেডিট কার্ডকে পাঞ্চ করার সময় চুমো খেতে ইচ্ছা করছিল, সে ক্রেডিট কার্ডই ইনস্টলমেন্ট দেওয়ার সময় ছিঁড়ে কুটি কুটি করার ইচ্ছাবস্তুতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অর্থকড়ি সংক্রান্ত মুরব্বি সংস্থাও তা-ই বলছে। এর একটি বিরাট সূচক হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির উল্লম্ম্ফন- টাকা ও সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশের দরিদ্র শ্রেণির অবস্থান হিসাবের বাইরে। এদের দারিদ্র্য কখনও ঘোচার নয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের অর্ধশতক পূর্তিতে সম্ভবত সবচেয়ে লাভ অর্জনকারী শ্রেণি। এই শ্রেণিটি যেমন টাকায় পুষ্ট হয়েছে, তেমনি সংস্কৃতিতে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি কারা, তার সংজ্ঞায়ন মোটামুটি এভাবে করা যায়, যাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া আছে; কিছুটা উচ্চ মেধা আছে; আছে কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সেই সঙ্গে প্রচুর হিংসা-দ্বেষ ও প্রতিশোধস্পৃহা। তাদের বেশিরভাগই চাকরিনির্ভর জীবন যাপন করে। একই সঙ্গে যারা যে কোনো বিষয়ে যেমন ক্রীড়া, সাহিত্য, ধর্ম, রাষ্ট্র এসব গুরুতর বিষয়ে মতামত দিতে ওস্তাদ এবং যারা ফেসবুকে চাষ করে নানা রকম মতদ্বৈততা, তারাই মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা আট-নয় কোটি। এদের চাওয়া-পাওয়ারই প্রতিফলন হচ্ছে ঈদবাজার।

অনলাইনে কেনাকাটা তারই একটি প্রতিফলন। মোবাইল ফোন খোলা যায় না। কোনো না কোনো অনলাইন প্রতিষ্ঠানের প্রডাক্টের ফিরিস্তি কোনো সুদর্শনা নারীর মুখে চলতেই থাকে। শপিংমলগুলো ঈদবাজারের প্রেক্ষাপটে এতটাই কাস্টমাইজড হয়ে গেছে যে, এখন আর শাড়ির দোকান থেকে শুধু শাড়ি কিনে বের হতে হয় না। সঙ্গে সঙ্গে ব্লাউজ পিস কাটিয়ে, ব্লাউজের মাপ নিয়ে তৈরি করে দেওয়ার জন্য নারী-দর্জি নিয়োগ দেওয়া আছে ওই শাড়ির দোকানেই। পর্যটনভিত্তিক হোটেলগুলো এর মধ্যে মেসেঞ্জারে বারবার তাগিদ জানাচ্ছে, ঈদ উপলক্ষে কক্সবাজার, জাফলং বা পঞ্চগড় চা বাগানে গেলে কেমন ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। পত্রিকাগুলো ঈদসংখ্যা বের করছে ঢাউস সাইজের এবং সেগুলো বিক্রিও হচ্ছে ভালো। ঈদ উপলক্ষে সাহিত্যচর্চার উর্বর পটভূমি তৈরি হয় এবং তার ব্যবসায়িক মূল্যও কম নয়।

ব্যবসায়িক মূল্য উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গক্রমে ঢাকায় সম্প্রতি সংঘটিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয়। কয়েক দিন আগে ঢাকা কলেজের ছাত্র, যাদের নেতৃত্বে ছিল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা, ওই এলাকার দোকান মালিক সমিতির মধ্যে যে সংর্ঘষ হয়ে গেল এবং যাতে দু'জনের প্রাণহানিও হলো, সে সংঘর্ষের মূলে ছিল ঈদবাজারকেন্দ্রিক চাঁদা তোলা। ব্যবসা তো করতে হবে, তাই দু'দিনের মাথায় দোকানিরা সাদা পতাকা ওড়াল। আর চাঁদাবাজদের তো চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখতে হবে, তাই আবার বেচা-বিক্রি শুরু হলো। চাঁদাবাজও রইল। মাঝখান থেকে দুটি প্রাণ গেল। আর ঈদের কারণে এই সংঘর্ষটা হলো বক্রভাবে; এই কথাটাও বলা যায়। আবার এই ঘটনা একটি মওকাও তৈরি করে দিল সরকারের জন্য- শক্ত হাতে অপরাধীদের ধরে শক্ত শাস্তির আওতায় যেন নিয়ে আসা যায়। এখানে সরকারকে দলমত নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। একটা কথা পরিস্কার- সন্ত্রাসভিত্তিক রাজনীতির প্রবক্তারা চিরদিনই সংকট তৈরি করে। এদের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা নয়; অবৈধ উপায়ে টাকা উপার্জন। তাই বলতে হয়, ঈদ সম্পূর্ণত একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও এর পুরো বিস্তৃতি সামাজিক। আর সামাজিক মানে পুরোটাই অর্থনৈতিক।

সে জন্য ঈদের বড় ঝুঁকি যেটা আমি দেখি সেটা হাজার হাজার মানুষের বাড়ি যেতে লঞ্চঘাটায় ভিড়। জীবন-মৃত্যুর দোলাচলের মধ্যে বাড়তি লোক নিয়ে পদ্মা বা মেঘনায় লঞ্চডুবি হচ্ছে। কিংবা ট্রেনের টিকিটের অপেক্ষায় স্টেশনে রাত কাটিয়ে দিচ্ছে। আমি ঝুঁকিটা দেখছি দ্রব্যমূল্যের আস্ম্ফালনে এবং বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায়। অর্থাৎ ঈদের অর্থনীতি পুরোটাই অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অধীনে চলে যায়। যেন এমন, সরকারেরও নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতা থাকে না। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও দোকানদারদের মধ্যে সংঘর্ষ এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হিমবাহের দৃশ্যমান উপরিভাগ মাত্র। কিন্তু এর অদৃশ্যমান দেহটা যেখানে অসাধু ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশনখোর এবং অপরাজনীতির বাহিনী সব মিলে বাজারের যে অস্থির অবস্থা তৈরি করে; সেখানে সরকারের শক্ত হাতের নিয়ন্ত্রণ কেন থাকবে না?

ধরুন, চাঁদাবাজি যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে তাহলে ব্যবসায়ীরা সে ক্ষতিটা পুষিয়ে নেবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে এবং ফলত এর শিকার হয়ে যাচ্ছে আপামর ক্রেতা। বিশেষত গরিবের পর্যুদস্ত হওয়ার কোনো শেষ থাকে না। টিভির সংবাদ প্রতিবেদনে ক্রেতাদের দুর্দশার ছবি দেখে মেলাতে পারি, কেন মসজিদ থেকে বের হলে এত অধিকসংখ্যক হাতপাতা ভিখারির মুখোমুখি হতে হয়। তাই কঠিন হলেও কথাটা বলতে হয়, ঈদ উদযাপন আর দারিদ্র্য উদযাপন প্রায় সমার্থক হয়ে পড়ছে। অসমর্থ পরিবারগুলোতে ঈদ উপলক্ষে যে অর্থনৈতিক চাওয়া-পাওয়া কিংবা সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে লড়ালড়ি শুরু হয়, তাতে দিন শেষে গৃহস্বামী বালিশে শান্তিতে মাথা রাখতে পারে কিনা সন্দেহ। তবুও সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করার তওফিক যেন সবার থাকে, সে কামনা করি।

ড. মোহীত উল আলম: শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক